স্কুল ব্যাংকিংয়ের পাঁচ যুগ

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮ | ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

স্কুল ব্যাংকিংয়ের পাঁচ যুগ

জাফর আহমদ ১০:৩১ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৩, ২০১৮

print
স্কুল ব্যাংকিংয়ের পাঁচ যুগ

স্বাধীন বাংলাদেশে স্কুল ব্যাংকিং নবম বছর অতিক্রম করছে। কিন্তু বাংলায় স্কুল ব্যাংকিংয়ের শুরু ৫৮ বছর আগে। স্বাধীনতা পূর্ব পাকিস্তানি মালিকানাধীন ইউনাইটেড ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিং চালু করেছিল। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী ইউনাইটেড ব্যাংকের সঙ্গে সঙ্গে অবসান ঘটে স্কুল ব্যাংকিংয়ের। এরপর ২০১০ নতুন করে শুরু হয় স্কুল ব্যাংকিং। নতুন করে চালু করা স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনা হয় স্কুলপড়ুয়া ১১ থেকে ১৭ বয়সী ছেলেমেয়েদের। ৯ বছরে দেশে স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতায় এসেছে সাড়ে ১৪ লাখ ছাত্রছাত্রী।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, দেশের ৫৮টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ৫৬টি ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিং করছে। সম্প্রতি প্রকাশিত ত্রুটিপূর্ণ ও স্থগিত প্রকাশনা ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস’ বইয়ে উল্লেখ করা হয়, এ ভূখণ্ডে ১৯৬০ সালে প্রথম স্কুল ব্যাংকিং চালু করা হয়। তখন ব্যাংকের সংখ্যা ছিল ১টি। মুক্তিযুদ্ধপূর্ব তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ‘ইউনাইটেড ব্যাংক’ শিশুদের ছোট্টবেলা থেকে সঞ্চয়ের মনোভাব গড়ে তোলার জন্য স্কুল ব্যাংকিং শুরু করে। সে সময় স্কুল ব্যাংকিংয়ের অন্যতম উদ্দেশ্যই ছিল বাংলা থেকে আমানত সংগ্রহ করে পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্যোক্তা অনুকূলে বিনিয়োগ করা। এজন্য তারা বাংলাদেশে আমানত সংগ্রহ করার কাজে বাঙালিদের ব্যবহার করত। তাদের ব্যাংকের কাজও শেখানো হতো এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। এরই অংশ হিসেবে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য চালু করে বিশেষ স্কিম। ১৯৫৯ সালের প্রতিষ্ঠা পাওয়া এই ব্যাংকটি প্রথম শাখাটি ছিল পাকিস্তানের তৎকালীন রাজধানী করাচিতে। এরপর লাহোর ও লায়ালপুর একটি করে এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে আরও তিনটিসহ মোট ছয়টি শাখা চালু করে। এ ভূখণ্ডে ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতির জনক হিসেবে এই ব্যাংকটিকেই মনে করা হয়। বাণিজ্যিক এ ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা আগা হাসান আবেদি ‘হাবিব ব্যাংক’ থেকে বের হয়ে এই ইউনাইটেড ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি আমানত সংগ্রহের জন্য সরকারি ও কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন। এ কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারি আমলা, আধা-সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি ব্যবস্থাপক, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিধিবহির্ভূত দামি উপহার ও নগদ টাকা ঘুষ দিতেন; দেশ-বিদেশে প্রমোদ ভ্রমণে নিয়ে যাওয়া ও কর্মকর্তাদের সন্তানদের চাকরিতে নিয়োগ দেওয়ার মতো অবৈধ পন্থা অবলম্বন করত বাণিজ্যিক ব্যাংকটি। আমানত সংগ্রহে এ ধরনের অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করার মাধ্যমে তারা ব্যাংকিং খাতে স্কুল ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি দুর্নীতির গোড়াপত্তন করে গেছেন। স্বাধীনতাপূর্ব এই ইউনাইটেড ব্যাংকের উত্তরসূরি ব্যাংক হচ্ছে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্র মালিকানাধীন জনতা ব্যাংক লিমিটেড। জনতা ব্যাংকের পূর্বসূরি আরও একটি ব্যাংক হচ্ছে ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেড।
বাংলাদেশে স্বাধীনতার ৩৮ বছরে ২০১০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান স্কুল ব্যাংকিং চালু করেন। ১৯৬০ সালে চালু হওয়া স্কুল ব্যাংকিং সীমাবদ্ধ ছিল একটি মাত্র ব্যাংকের মধ্যে। চলতি ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে স্কুল ব্যাংকিংয়ে হিসাব (অ্যাকাউন্ট) সংখ্যা সাড়ে গেছে ১৪ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। স্কুল ব্যাংকিংয়ে এসব হিসাবের মধ্যে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে খোলা হয়েছে ৯ লাখ ৯৩৬টি। যা মোট স্কুল ব্যাংকিং হিসাবের ৬১ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এসব হিসাবের বিপরীতে প্রায় এক হাজার ২৩০ কোটি টাকা আমানত রাখা আছে। যা এ খাতের মোট আমানতের ৮৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। যেখানে স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতায় খোলা সবগুলো হিসাবে জমা আছে এক হাজার ৪৪১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে ২৯ দশমিক ২৮ শতাংশ স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলা হলেও ওই হিসাবগুলোতে আমানতের স্থিতি ১১ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে কার্যরত ৫৮টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে মোট ৫৬টি ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিং করছে। হিসাব খোলার দিক দিয়ে স্কুল ব্যাংকিংয়ে শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটিতে স্কুল ব্যাংকিং হিসাব রয়েছে দুই লাখ ৩৯ হাজার ৮৪১টি; যা মোট স্কুল ব্যাংকিং হিসাবের ১৬ দশমিক ৪১ শতাংশ। স্কুল ব্যাংকিংয়ে জমা হওয়ার দিকে বিবেচনা করলে শীর্ষে রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। বাণিজ্যিক এই ব্যাংকটিতে ছাত্রছাত্রীদের খোলা হিসাবের জমা আছে ৪১২ কোটি টাকা। যা এ খাতের মোট আমানতের ২৮ দশমিক ৬০ শতাংশ।