মুন্সীগঞ্জের বাঁশ-বেতের তৈরি সামগ্রী যাচ্ছে বিদেশে

ঢাকা, সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১ | ৩ কার্তিক ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

মুন্সীগঞ্জের বাঁশ-বেতের তৈরি সামগ্রী যাচ্ছে বিদেশে

মঈনউদ্দিন সুমন, মুন্সীগঞ্জ
🕐 ১২:০১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২১

মুন্সীগঞ্জের বাঁশ-বেতের তৈরি সামগ্রী যাচ্ছে বিদেশে

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার মধুপুর মনিপাড়া গ্রামের বাঁশ ও বেতের তৈরি সামগ্রী যাচ্ছে বিদেশেও। ওই গ্রামের ১০০টি পরিবার এ কাজে জড়িয়ে আছেন। শত বছর ধরে বংশ পরম্পরায় এ পেশা আঁকড়ে ধরে আছে পরিবারগুলো। সেখানে অন্তত সাড়ে ৪০০ নারী-পুরুষ শ্রমিক রয়েছেন। সরেজমিনে ঘুরে ওই গ্রামের ঘরে ঘরে বাঁশ ও বেত দিয়ে নানা শোপিস তৈরিতে ব্যস্ততার চিত্র দেখা গেছে। বেতের ঝুড়ি, বাস্কেট, পেপার বাস্কেট, ফলের ঝুড়ি, আয়নার গ্লাস ফ্রেম, বেতের লেমজার বাতি, বেতের মোড়া, ফুলের টপসহ বাঁশ ও বেতের সামগ্রী তৈরি করে থাকে।

এখানকার সামগ্রী রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোড ও ইস্কাটনের বাঁশ-বেতের সামগ্রীর দোকানগুলোতে বিক্রি করে থাকেন। সেখান থেকে দোকানিরা বিদেশেও রপ্তানি করে থাকেন। এখানকার বাঁশ ও বেতের পণ্য যাচ্ছে কানাডা, জাপান, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে। প্রতি মাসে এ গ্রাম থেকে বাঁশ ও বেতের তৈরি বিভিন্ন পণ্য কয়েক কোটি টাকা বিক্রি হয়ে থাকলেও ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা টাকার পণ্য যায় বিদেশে। গ্রামের পরিবারগুলোর তৈরি এসব সামগ্রী প্রথমে চলে যায় রাজধানীতে। তারপর রাজধানীর বায়ারদের হাত হয়ে দেশের বাইরে যায়। গ্রামের পরিবার গুলোর সঙ্গে বায়ারদের সরাসরি সম্পর্ক গড়ে উঠলে তারা আরও লাভবান হতে পারতেন বলে তারা জানায়।

মধুপুর কুটির শিল্পের মালিক নিরঞ্জন দাস বলেন, আমরা শুধু বেতের কাজ করি। বেত-বাঁশের বিভিন্ন প্রকার জিনিস তৈরি করি। সম্পূর্ণ হাত দ্বারা এ কাজ করা হয়। কোনো ধরনের মেশিন দিয়ে তৈরি হয় না। আমার এখানে বেতের ঝাড়বাতি, লেমসেট, ট্রে, সোফাসেট, ফুলদানি, মিরর, আয়নাসহ প্রায় ১০০ ডিজাইনের জিনিস তৈরি করে থাকি। আগে বাবা তৈরি করেছে, এখন আমরা ও আমার ছেলে-মেয়েরাও এসব নানন্দিক শোপিস তৈরি করে থাকি। করোনার কারণে এসব তৈরিকৃত মাল অবিক্রিত রয়ে যায় ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকার মাল।

অনেক মাল স্টোকে আটকে আছে। আমাদের বাঁশ-বেতের তৈরি হরেক রকমের জিনিসপত্র বাংলাদেশের বিভিন্ন নামীদামি ব্যান্ড আমাদের কাছ থেকে মালামাল নিয়ে থাকে। এছাড়া দেশের বাহিরে যেমন কানাডা, জাপান, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে আমাদের এসব তৈরিকৃত মালামাল যাচ্ছে। কিন্তু সরাসরি আমাদের কাছ থেকে যাচ্ছে না এসব দেশগুলোতে। আমরা ন্যায্য দাম পাচ্ছি না। আমরা দেখেছি বিভিন্ন নামীদামি ব্র্যান্ড আমাদের কাছ থেকে কম মূল্যে জিনিস ক্রয় করে উচ্চ মূল্যে তা বিক্রয় করছে। বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে আমরা খুবই দুর্বল। কারণ করোনায় মালামাল আটকে গেছে। আমার কারখানায় নারী-পুরুষ মিলে ৬০ জনের বেশি কাজ করে। তাদের এক একজনের মাসিক বেতন সর্বনিম্ন ১২ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা। তাদেরও ঠিকমতো বেতন দিতে পারছি না। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন এক্সপোর্ট ব্যবসায়ীরা আমাদের অগ্রিম মালের অর্ডার দিয়ে থাকে। তারা বিভিন্ন দেশে এসব মালামাল পাঠিয়ে থাকে। অনেক অর্ডার আসে দিতে পারি না। কারণ পুঁজি ছাড়া ব্যবসা হয় না। আমাদের পুঁজি অনেক কম। সরকার আমাদের ঋণের ব্যবস্থা করে দিলে এ ব্যবসায় অনেকের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যেত। ২০-২৫ লাখ টাকার মাল প্রতি বছর বিদেশে যায়। আরও একটি কারখানার মালিক যতীন্দ্র দাস বলেন, আমরা এসব কাজ করে থাকি খুব ছোট থেকে। আগের মতো কাজ আসে না। কাজ আসলেও দিতে পারি না। বেত সংকট। কাঁচামাল কিনতে বাগেরহাট যাব। আমাদের আর্থিক অবস্থাও তেমন না। সরকার যদি সাহায্য সহযোগিতা করত তাহলে কিছুটা হলেও ভালোভাবে থাকতে পারতাম। আমাদের তৈরি মালগুলো যেমন, কনোসফো, কুর্দিজুডক্স, আর্সেনিহ্যান্ডিক্রাফটস, বিডিগ্রেশন, অনির্বাণ, সানটেজ, জাগরনীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আমাদের হাতের এসব শোপিস নিয়ে দেশ ও দেশের বাহিরে পাঠিয়ে থাকে। কিন্তু আমরা যে পরিশ্রম করি সে অনুযায়ী আমরা আসল পয়সা পাই না। আসলটা ওইসব প্রতিষ্ঠান পেয়ে থাকে। আমার প্রতিষ্ঠানে তৈরি মালামাল বেশির ভাগ বিদেশে যায়। অল্প কিছু মাল দেশের বড় বড় হোটেল মেলা ও আড়ং-এ যায়। করোনায় ৫-৭ লাখ টাকার মাল জমা হয়ে গিয়েছিল চিন্তায় ছিলাম। মাস শেষে ২-৩ লাখ টাকা বেতনসহ অন্যান্য খরচ তাও কাঁচামাল বাদে। আমাদের ব্যবসায় হাতে নগদ টাকা দরকার যা সবসময় থাকে না। অনেক অর্ডার পাই কিন্তু দিতে পারি না। অনেক বায়ার তাদের নিজেদের ডিজাইন আমাদের কাছে পাঠায় আমরা সে অনুযায়ী তাদের মাল সাপ্লাই দিয়ে থাকি।

একজন নারী শ্রমিক পুস্প রানী দাস বলেন, আমি ৫০ বছর ধরে এ কাজ করছি। এখন আমার ছেলে মেয়ে ও ছেলেবউ এ কাজ করে থাকে। পরিবারের কাজ শেষে আমরা বিভিন্ন ধরনের বেতের কাজ করি। আমাদের কাজ হচ্ছে বুনানো, চাপানো, পরিচ্ছন্নসহ আমরা হালকা কাজটাই করি। করোনার কারণে খুব সমস্যা হচ্ছে। মালামাল বিক্রি হলেই তো হাতে কাজ থাকে তা না হলে তো কাজ বন্ধ থাকে। কোনো মতোই চলছে আর কি।

মুন্সীগঞ্জ জেলা বিসিক কার্যলয়ের উপ-ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, এই মুহূর্তে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪% সুদে একটি ঋণ ঘোষণা করেছে। বিসিক এটা ৪% সুদে এই ঋণ বিতরণ করে। এসব ব্যবসায়ীরা যদি গ্রুপভিত্তিক আবেদন করে তাহলে ভালো একটি ঋণ পাবে। আমাদের ঋণ ছাড়া ও মেলার ব্যবস্থা করে দেওয়া।

বর্তমানে করোনার কারণে মেলার কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অনলাইনের মাধ্যমে মেলার আয়োজন করে থাকি যেটা বিসিক অনলাইন পণ্য মেলা। যদি কারখানার মালিকরা যে সকল পণ্য তৈরি করে আমাদের অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে তা পাঠায় তাহলে আমরা বিসিক শিল্প নগরীর যে অনলাইন পেইজ রয়েছে সেখানে আমরা তাদের তৈরিকৃত মালামাল পোস্ট করি। এতে ভালো ফলাফলও পাওয়া যায়। সারা বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় বিসিক শিল্প নগরী রয়েছে সকলকে অবহিত করা হয়। এতে ব্যবসায়ীরাও ভালো লাভবান হয়ে থাকে। এছাড়া ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে একটি পরিচয় পর্বটাও করে থাকি এতে দুই পক্ষরাই লাভবান হয়।

 
Electronic Paper