শিল্পায়নের প্রভাবে বিলুপ্ত প্রায় রূপগঞ্জের কৃষি জমি

ঢাকা, সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১ | ৬ বৈশাখ ১৪২৮

১৫ বছরে অর্ধেকে নেমেছে কৃষকের সংখ্যা

শিল্পায়নের প্রভাবে বিলুপ্ত প্রায় রূপগঞ্জের কৃষি জমি

মাহবুব আলম প্রিয়, রূপগঞ্জ ৩:৪৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২১

print
শিল্পায়নের প্রভাবে বিলুপ্ত প্রায় রূপগঞ্জের কৃষি জমি

শিল্পনগরী খ্যাত নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ছোট বড় কল কারখানা আর পূর্বাচল নতুন শহর কেন্দ্রীক আবাসন প্রকল্পকে ঘিরে কৃষি জমি বিলুপ্ত প্রায়। এতে গত ২ যুগ ধরে জমি সংকটের কারনে কমে যাচ্ছে কৃষকের সংখ্যা। অথচ, রূপগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রতি বছর প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা, পূনর্বাসন, বীজ, সার, কীটনাশক এমনকি ঋণ সুবিধা গ্রহণ করছেন বছরে হাজারের অধিক কৃষক। যাদের প্রায় ৪০ শতাংশই এখন কৃষি কাজে যুক্ত নয়। আবার কৃষক কাগজে কলমে থাকলেও বাস্তবে কৃষিকাজে যুক্ত না থাকার রয়েছে নজির। আর নামেমাত্র কৃষি সেবায় অনুৎসাহিত হচ্ছে এখানকার প্রকৃত কৃষক।

রূপগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রাচীন কাল থেকেই বালু ও আর শীতলক্ষ্যা নদী তীরের ফসলি জমিতে পাট, আখ, আলু, পিয়াজ ইত্যাদি চাষাবাদ হতো। আর স্বাধীনতা পরবর্তি উত্তর রূপগঞ্জ এবং শীতলক্ষ্যার পূর্বপাড়ে নারায়ণগঞ্জ নরসিংদী সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এ অঞ্চলে ব্যাপক হারে ইরি, বোরো, আমন ধান আর ফল ফলাদি আবাদ শুরু হয়। ফলে এ অঞ্চলের ৮০ ভাগ লোকের পেশা ছিলো কৃষি কাজ।

এ অঞ্চলের উৎপাদিত কৃষিপন্য রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চাহিদা মেটাতো। আর বাকি ২০ ভাগ এ উপজেলার ৬টি পাটকল,পার্শ্ববর্তি জেলা গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার সোমবাজারের চিনিকলে শ্রমিক হিসেবে ছাড়াও তাঁতের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতো।

কিন্তু ৯০ এর দশকে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প বাস্তবায়ণ শুরু হলে কমতে থাকে কৃষি জমির পরিমাণ। সে সময় এ উপজেলায় ৪৬ হাজারের অধিক তালিকাভুক্ত কৃষক থাকার তথ্য রয়েছে এ কার্যালয়ে। কালের বিবর্তে পূর্বাচলের আশপাশের মৌজায় বাড়তে থাকে আবাসন কোম্পানীর দৌড়াত্ম্য। ফলে কৃষকের জমিতে বালি ফেলে ভরাট করায় ইরি ও বোরে জমি এমনকি ফল ফলাদির গাছও কমে যায়। এতে কৃষি জমি হারিয়ে বিপাকে পড়া কৃষকদের মাঝে দরিদ্ররা দিন মজুর আর ধনীরা নানা ব্যবসা বাণিজ্যে যুক্ত হয়ে যায়। বর্তমানে কৃষক সংখ্যা মাত্র ২০ হাজারের মতো। যাদের মাঝে প্রায় অর্ধেক লোকই যুক্ত নয় কৃষিকাজে।

তবে উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন থেকে দাউদপুরের আংশিক,ভুলতা, ভোলাবো, মুড়াপাড়া, গোলাকান্দাইল এবং তারাবো ও কাঞ্চন নামে ২টি পৌরসভার সেচ প্রকল্পেরর আঁওতায় থাকায় সেখানে কৃষকদের অবস্থান রয়েছে। কিন্তু ওই অঞ্চলের মাঝে তারাবো ও কাঞ্চন পৌরসভা এবং গোলাকান্দাইল ইউনিয়নে শিল্প কারখানা গড়ে ওঠায় সেখানে কৃষক সংখ্যা নামে মাত্র। তাছাড়া কৃষি পন্য উৎপাদন খরচ বাজার মুল্যের সঙ্গে সমন্বয় না থাকায় ঝড়ে পড়ছে কৃষক।

একইভাবে শীতলক্ষ্যার পশ্চিমপাড়ে তথা রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়ন ও কায়েতপাড়া ইউনিয়নে আবাসন কোম্পানীগুলো বালি ফেলার কারনে কৃষি জমি ৮০ ভাগ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ফলে এ অঞ্চলে কৃষকের সংখ্যাও কমেছে আনুপাতিক হারে।

অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের অনিয়মের ফলে তাদের জড়িপ কর্মে মনগড়া কৃষকের নাম সরকারী কৃষি জড়িপের তালিকায় বসানো হয়। তারা মাঠে পরিদর্শনের অযুহাত দিয়ে নিয়মিত অফিস করেন না। বাস্তবে তারা মাঠেও থাকেন না বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। ২০২০-২১ অর্থ বছরে সরকারী সুবিধা ভোগীর তালিকায় এমন অনিয়ম পাওয়া গেছে। তালিকায় দেখা যায়, উপজেলার মুশুরী গ্রামের সুলতান,মজিবুর রহমান,ম্সাদা শুক্কুর আলী, আবার মুড়াপাড়ার বলাইনগরের আব্দুর রউফ, বানিয়াদির সজিব, ব্রাহ্মণগাঁওয়ের আব্দুল জলিল, গঙ্গানগরের সামসুদ্দিন ভুইয়াসহ ৪ শতাধিক কৃষকের জমির পরিমাণ ৩৩ শতক কিংবা ১ বিঘা দেখানো হয়েছে।

যার বেশির ভাগই ভুয়া তথ্য হিসেবে দাবী করেন স্থানীয় কৃষকরা। তাদের দাবী সবার একই পরিমাণ জমি থাকতে পারে না। সরেজমিন না দেখেই মনগড়া তালিকা করেন তারা।

কৃষকদের আরো অভিযোগ, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে সুবিধা না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন তারা। আর কৃষি ব্লক সুপারভাইজরদের মাধ্যমে কৃষি কর্মকর্তাকে খুশি করতে না পারলে সুবিধাভোগীর তালিকায় নাম ওঠে না। আর প্রকৃত কৃষকরা এ বিভাগ থেকে সুবিধা পাচ্ছে না।

কায়েতপাড়া কায়েমসাইর এলাকার কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন,আমার ৩ বিঘা বেগুন ক্ষেতে পোকায় আক্রমণ করলে কৃষি অফিসে যোগাযোগ করি। পরে ক্ষেত পরিদর্শনের আশ্বাস দিলেও তাদের কেহই আমার ক্ষেতে আসেনি। এতে আমি সরকারী সুবিধা পাইনি।

একইভাবে ভোলাবোর বাসুন্দা গ্রামের কৃষক মজিবুর রহমান বলেন, কৃষি অফিসের কাজ কি তাই জানিনা। গত বছর আখ চাষ করে ফলন ভালো হয়নি। গ্রামের লোকজন তাদের সহায়তা নিতে বলেছিলো। মুড়াপাড়ায় কৃষি অফিসে গিয়ে জানানোর পরেও কোন সহায়তা পাইনি। এভাবে শত শত কৃষক নানা কারনে সরকারী সুবিধা বঞ্চিত হয়ে কৃষি কাজে অনুৎসাহিত হচ্ছে।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষি কর্মকর্তার দাবী, এসব কৃষকের নাম প্রস্তাব করা হয় ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে ওয়ার্ড সদস্যদের মাধ্যমে। কিছু ওয়ার্ড সদস্য ওই তালিকায় নাম দিতে স্বজন প্রীতি, দলীয়করণ ও স্বেচ্চাচারীতায় আশ্রয় নেয়। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হাত নেই।

অভিযোগ রয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের মনোনীত লোকজনকে ওই সুবিধাভোগী কৃষকের তালিকায় রাখতে কৃষি কর্মকর্তাদের বিশেষভাবে খুশি করতে হয়।

সূত্র জানায়, ২০১৯-২০ অর্থ বছরের এক জড়িপে রূপগঞ্জ উপজেলার বর্তমান কৃষক সংখ্যা ২২ হাজার ১ শত ৫০ জন। যাদের মাঝে অতি দরিদ্র কৃষকের তালিকায় থাকা ২০২০-২১ অর্থ বছরে ৪৫০ জন পেয়েছেন প্রণোদনা আল ৫শতাধিক কৃষককে পূনবার্সিত করা হয়েছে। বিধিমতে, কৃষকের জমিতে বন্যা বা প্রাকৃতিক কারণে ক্ষয় ক্ষতি হলে এমন সহায়তার নিয়ম থাকলেও দরিদ্র কৃষকের তালিকায় থাকা সচ্চল লোকজনের নাম রয়েছে।

সূত্র আরো জানায়, রূপগঞ্জের নদী পাড়ে এখনো বোরো, আমন, ইরি, আলু, লাউ,সিম, পটল ইত্যাদি সব্জি চাষাবাদ হলেও সরিষা, চিনাবাদাম, পিঁয়াজ, গম, সূর্যমূখী, খেসারী, মশুর ডাল চাষ হয় না খুব একটা। তবু এসব কৃষি পন্য উৎপাদনের জন্য বিএডিসি থেকে বিজ, সার ও কিটনাশক সুবিধা দেয়া হয়েছে। বাস্তবে এ ধরনের ফসলের ক্ষেত খুঁজে পাওয়া যায়নি কোথাও।

উপজেলা উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষনকারী কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসাইন জানান,উপজেলার মোট কৃষকের সংখ্যা গত ১৫ বছরে অর্ধেকে নেমে এসেছে। এ সংখ্যা আরো কমে আসবে। তবু কৃষি কর্মকর্তার নির্দেশে এ উপজেলাকে ২৩টি ব্লকে ভাগ করে সমহারে সরকারী কৃষি সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করে আসছে। ১৫ বছর আগে কৃষকের সংখ্যা ছিলো ৪৪ হাজারের অধিক। এ উপজেলার ১১ হাজার ৪শত ৫০ হেক্টর জমি আবাদি রয়েছে বলে জানি। এর মাঝে ধানী জমি ৭ হাজার ১৫ হেক্টর।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ জেলা জুরে শিল্পায়নের প্রভাবে কমতে শুরু করেছে কৃষকের সংখ্যা। ২০২০-২১ এর প্রণোদনা সুবিধা গ্রহণের তালিকায় দেখা যায়, জেলা সদর উপজেলায় ৫৪০জন, বন্দরে ৩৩০জন, সোনারগাঁওয়ে ৯৮০ জন, রূপগঞ্জে ৫০০ জন এবং সর্বোচ্চ আড়াইহাজারে ১৬৫০ জন মাত্র।

এসব বিষয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফাতেহা নুর বলেন, শিল্পায়নের প্রভাবে কৃষি জমি কমে যাওয়ায় কৃষক সংখ্যা কমে আসছে। তবে এ অঞ্চলের কৃষকদের সরকারী সহায়তা দিতে আমরা প্রস্তুত। প্রতিবছর কৃষকদের কৃষি কাজে উৎসাহিত করতে প্রশিক্ষণ,প্রণোদনা, পূনর্বাসনসহ নানাভাবে সহযোগীতা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। কৃষকদের দক্ষতা বাড়াতে ৩০জন ভাগ করে জাইকার অর্থায়নে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, প্রকৃত কৃষকের তালিকায় নাম লিপিবদ্দকরণ দায় আমার নয়। এটা ওয়ার্ড মেম্বার ও চেয়ারম্যানদের প্রদেয় তালিকা যাচাই করে ব্লক সুপারভাইজররা তৈরী করেন। এতে কোন অনিয়ম হয়ে থাকলে তা সংশোধন করা হবে।