আহসানুলের ঘুষকাণ্ডে ফরেস্টার ইউসুফ খুন

ঢাকা, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১১ আশ্বিন ১৪২৭

আহসানুলের ঘুষকাণ্ডে ফরেস্টার ইউসুফ খুন

তানজেরুল ইসলাম ও মো. নেজাম উদ্দিন ১০:২৬ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৩, ২০২০

print
আহসানুলের ঘুষকাণ্ডে ফরেস্টার ইউসুফ খুন

চট্টগ্রামের মহেশখালী রেঞ্জে শিক্ষানবিশ ফরেস্টার মো. ইউসুফ উদ্দিন হত্যাকা-ের ঘটনায় তুলকালাম চলছে বন অধিদফতরে। এ হত্যাকা-ের প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন বন বিভাগে কর্মরত হাজারো কর্মকর্তা-কর্মচারী। দাবি করা ঘুষের মাত্র এক হাজার টাকা কম দেওয়ায় বন বিভাগের লোকজনদের সঙ্গে এলাকাবাসীর সংঘর্ষ হয় গত ৩০ জুলাই। ওই সংঘর্ষে গুরুতর আহত ফরেস্টার ইউসুফ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় গত ৬ আগস্ট মারা যান। তবে দেশব্যাপী যখন ফরেস্টার ইউসুফ হত্যাকা-ের ঘটনায় বন বিভাগের ব্যর্থতা চিহ্নিতের দাবি খোদ বন বিভাগে কর্মরতদের, তখন আলোচিত এ হত্যাকা-ের নেপথ্য ধামাচাপা দিতে মত্ত একটি চক্র।

বছরের পর বছর চট্টগ্রামের মহেশখালী রেঞ্জে বনে গড়ে ওঠা হাজার হাজার পানের বরজ থেকে বন বিভাগের বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্য থেকে গেছে অধরা। তবে ‘দৈনিক খোলা কাগজের’ অনুসন্ধানে ঘটনাস্থল থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে ফরেস্টার ইউসুফ হত্যাকা-ের নেপথ্যের পাশাপাশি বন বিভাগের হরেক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং অপ্রতিরোধ্য ঘুষ কেলেঙ্কারির খবর উঠে এসেছে।

অনুসন্ধান বলছে, চট্টগ্রাম মহেশখালী রেঞ্জের কেরনতলী বিটের করইবুনিয়া এলাকার বনের জমিতে একটি পানের বরজ তৈরি করেন স্থানীয় কলিম উল্লাহ নামে এক ব্যক্তি। খবর পেয়ে প্রথম পর্যায়ে রেঞ্জটির কেরনতলী বিট কর্মকর্তা আহসানুল কবির পানের বরজ তৈরিতে বাধা দেন। তবে পরবর্তীতে পানের বরজ টিকিয়ে রাখতে বিট কর্মকর্তার সঙ্গে ১০ হাজার টাকা ঘুষ দফারফা হয় কলিম উল্লাহ পরিবারের।

পরে ঘুষের টাকা দিতে স্থানীয় একটি সমিতি থেকে ১০ হাজার টাকা ঋণ নেন কলিম উল্লাহর স্ত্রী পাখি। সংঘর্ষের কিছুদিন আগে বিট কর্মকর্তাকে দফারফা হওয়া ঘুষের ১০ হাজার টাকার মধ্যে ৯ হাজার টাকা দেন কলিম উল্লাহ। তবে গত ৩০ জুলাই দুপুরে বিট কর্মকর্তা আহসানুল কবির ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ঘুষের বাকি এক হাজার টাকা দাবি করেন। পরে তিনি টাকা না পেয়ে কলিম উল্লাহর পরিবারের সঙ্গে বাকবিত-ায় জড়িয়ে পড়েন।

একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত বিট কর্মকর্তা হাতে দা নিয়ে পানের বরজের খুঁটি কাটতে গেলে কলিম উল্লাহর কিশোরী মেয়ে রোখসানা বাধা দেয়। পরে রোখসানাকে বিট কর্মকর্তা মারতে উদ্দত হলে বাধা দেন ফরেস্টার ইউসুফ। এ ঘটনার কিছুক্ষণ পর বেশ কয়েজন এলাকাবাসী বন বিভাগের লোকজনের ওপর হামলা চালায়। হামলায় গুরুতর আহত হন ফরেস্টার ইউসুফ উদ্দিন।

কলিম উল্লাহর স্ত্রী পাখি জানান, ‘তার মেয়ে রোখসানাকে রক্ষা করতে গিয়ে ফরেস্টার ইউসুফ বিট কর্মকর্তা আহসানুল কবিরের লাঠির আঘাতে আহত হন। পরে তাদের ফাঁসাতে বন বিভাগের লোকজন সরকারি অস্ত্র ঘটনাস্থলের পার্শ্ববর্তী একটি ঝোপে রেখে চলে যায়।’

মাঝেরপাড়া করুইবুনিয়া এলাকার সম্প্রতি সহকারী জজ পদে আসীন হওয়া রিয়াজ উদ্দিনের বড় ভাই মাহবুব আলম জানান, উচ্ছেদ অভিযানের পর তিনি ইউসুফের শরীরে তেমন আঘাতের চিহ্ন দেখেননি। তবে তার বাড়িতে ইউসুফ কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে মাথায় পানি ঢেলেছিলেন। করুইবুনিয়া মাঝেরঘাটের ব্যবসায়ী সেলিম জানান, সেদিন ফরেস্টার ইউসুফসহ কেরনতলী বিট কর্মকর্তা তার দোকানের সামনের সড়ক হয়ে দুপুর ২টা থেকে ২টা ৩০ মিনিটের সময় চলে যায়।

যাওয়ার সময় তার দোকান থেকে ফরেস্টার ইউসুফ পানি পান করেছিলেন। করনতলী বিট এলাকার মাঝের পাড়া করইবুনিয়া এলাকার শরিফের ছেলে বাদশা জানান, তিনি বিট কর্মকর্তা আহসানুল কবিরকে পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে পানের বরজ তৈরি করেছেন। একই এলাকার নুরুল আবছারের ছেলে নুরুল হাসেম জানান, তিনি পাঁচটি পানের বরজ থেকে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন কেরনতলী বিট কর্মকর্তা আহসানুল কবিরকে।

মহেশখালী রেঞ্জের সাবেক কেরনতলী বিট কর্মকর্তা বর্তমানে শাপলাপুর বিট কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আহসানুল কবির জানান, আমরা যখন কলিম উল্লাহর পানের বরজ উচ্ছেদ করতে যাই, তখন কলিম উল্লাহ ও তার পরিবারের সদস্যরা ফরেস্টার ইউসুফসহ আমাদের ওপর হামলা চালায়। এ ছাড়া পানের বরজ থেকে ঘুষ গ্রহণের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।