মাদক চোরাচালান আর লাশ ফেলার সড়ক

ঢাকা, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০ | ২৯ আষাঢ় ১৪২৭

মাদক চোরাচালান আর লাশ ফেলার সড়ক

মাহবুব আলম প্রিয়, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ৯:৪৭ অপরাহ্ণ, জুন ২৯, ২০২০

print
মাদক চোরাচালান আর লাশ ফেলার সড়ক

রাজধানীর খিলক্ষেত থানার পাশেই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা। এ উপজেলার ওপর দিয়ে ঢাকা বাইপাস ও ৩০০ ফিট সড়ক। এছাড়াও ঢাকা সিলেট মহাসড়কের অবস্থানও এ উপজেলার ওপর দিয়েই। তবে পূর্বাচল নতুন শহরের অবস্থান এখানে হওয়ায় রাজধানী ও আশপাশের দর্শনার্থীদের ভিড় থাকে সবসময়। করোনাকালেও রয়েছে দর্শনার্থীর চাপ। এ সুযোগে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র এখানে ওত পেতে থাকে। নারী-পুরুষ জুটি দেখলেই অবৈধ সম্পর্কের অযুহাতে সব কেড়ে নেয়। আর নির্জন হওয়ায় প্রতিপক্ষকে খুন করে এ এলাকাতেই ফেলে যায় লাশ। প্রায় সময়েই থানা পুলিশ এখানে লাশ উদ্ধার করে। ‘ডাম্পিং জোন’ হিসেবে পরিচয় এ এলাকার।

পুলিশ ও স্থানীয়রা বলছেন, সড়কে বাতি ও ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা না থাকায় অপরাধীরা সুযোগ নিচ্ছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আরও ভয়ঙ্কর হবে এলাকাটি।

কুড়িল ফ্লাইওভার থেকে পূর্বাচল হয়ে কাঞ্চন সেতুর এ রাস্তাটি ৩০০ ফিট নামে পরিচিত। রাজধানীর ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এরই মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই এলাকা। গত ১৯ জুন পূর্বাঞ্চল থেকে বসুন্ধরা প্রকল্পের মাঝামাঝি সড়কের দক্ষিণ পাশে এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করা হয়। ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হতে আলামত সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। খিলক্ষেত থানার এসআই মোশাররফ হোসেন জানান, ওই তরুণীর পরিচয় পাওয়া যায়নি।

এর আগে ১৭ জুন ৩০০ ফিট এলাকার অস্ট্রেলিয়ান স্কুলের সামনে একটি গাছের নিচ থেকে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করে খিলক্ষেত থানা পুলিশ। তার নাম হারুন অর রশিদ (৩৫)। পার্টস ও চায়ের ব্যবসা ছিল তার। গতকাল সোমবার পর্যন্ত হারুন হত্যা সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ক্লু পুলিশ বের করতে পারেনি। তবে ধারণা করা হচ্ছে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নিতেই তাকে অন্য কোথাও হত্যা করে লাশ ৩০০ ফিট এলাকায় ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা।

এর আগেও বিভিন্ন সময় ৩০০ ফিট এলাকা থেকে লাশ উদ্ধার হয়েছে। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ওই এলাকায় একসঙ্গে তিন যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় আলমপুর ব্রিজের নিচে ওই লাশ পাওয়া যায়। আত্মহত্যার জন্যও এ নির্জন এলাকাকে বেছে নেয় কিছু হতাশরা। গত এপ্রিল মাসের ২০ তারিখে পূর্বাচলের লেংটার মাজার এলাকায় একটি ব্রিজের রেলিং থেকে ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে রূপগঞ্জ থানা পুলিশ।

খিলক্ষেত ও রূপগঞ্জ থানা পুলিশের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ৩০০ ফিট এলাকায় একাধিক সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র রয়েছে। যারা মূলত সিএনজি অটোরিকশা, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে ওত পেতে থাকে। যাত্রী হিসেবে যানবাহনে অন্যদের তুলে সবকিছু কেড়ে নেয় তারা। কেউ জোর করলে তাকে হত্যা করা হয়। সম্প্রতি এই চক্রের ৮ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এই চক্রের মাধ্যমে হত্যার শিকার অন্তত ১২ জনের নাম-পরিচয় পরে বেরিয়ে আসে।

রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, ৩০০ ফিট এলাকা ঘিরে বেশকিছু অপরাধী চক্র রয়েছে। সেখানে প্রায়ই লাশ পাওয়া যায়। এলাকাটি নিরাপদ হিসেবে গড়ে তুলতে অনেক সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। সেটা না হলে অপরাধীদের তৎপরতা বন্ধ করা কঠিন হবে।

গত ২৭ জুন শনিবার নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের গোয়েন্দা সদস্যরা অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণে ইয়াবা ট্যাবলেটসহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। এ সময় পুলিশ প্রায় ১৭ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে, যার বাজারমূল্য আনুমানিক ৫০ লক্ষ ৪০ হাজার টাকারও বেশি। রূপগঞ্জ থানাধীন গাউছিয়া টু ঢাকা সড়কের পাশে কাঞ্চন টোল প্লাজায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ এই অভিযান পরিচালনা করে। রোববার (২৮ জুন) দুপুরে জেলা পুলিশের কার্যালয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলমের প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে র‌্যাব ১ সিপিপি ৩ এর টিম একই স্থানে অভিযান চালিয়ে গাজা, ইয়াবাসহ বিভিন্ন চোরাই মালামাল উদ্ধার করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা হাফিজুর রহমান বলেন, ডুমনী থেকে অটোরিক্সা করে খিলক্ষেত যাওয়ার পথে  ৩০০ ফিট গেলে একটি মাইক্রোবাস এসে ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে যাত্রীকে তুলে নিয়ে যায়। পূর্বাচল উপশহরে নির্জন জায়গায় হাত পা বেঁধে টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় ভুয়া ডিবি পুলিশ। পরে ওই চক্র, পূর্বাচল উপশহরে এক অটোরিক্সা (ইজিবাইক) চালককে মেরে লাশ ফেলে যায়।

এ বিষয়ে র‌্যাব ১ সিপিসি ৩ এর কমান্ডার মেজর আব্দুল্লাহ আল মেহেদী বলেন,  পূর্বাচল র‌্যাব ক্যাম্প থেকে সার্বিক নজরদারি করা হচ্ছে। মহাসড়কে সক্রিয় অপরাধী চক্রকে ধরতে সজাগ রয়েছি আমরা। বেশ কিছু সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মাদক ও চোরাচালান রোধে আমরা তল্লাশি অব্যাহত রেখেছি।

এসব বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম খোলা কাগজকে বলেন, এলাকাটির বিষয়ে আমরা সতর্ক। শিল্প পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, ট্রাফিকসহ রূপগঞ্জ থানা পুলিশকে বিশেষ টহলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাতি ও সিসি ক্যামেরা স্থাপন বিষয়ে ভাবা হচ্ছে। শিগগিরই এখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।