৪৯ বছরেও হয়নি স্মৃতিসৌধ

ঢাকা, রবিবার, ৭ জুন ২০২০ | ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সেন্দিয়া গণহত্যা দিবস

৪৯ বছরেও হয়নি স্মৃতিসৌধ

নিত্যানন্দ হালদার, মাদারীপুর ৩:৪৬ অপরাহ্ণ, মে ২২, ২০২০

print
৪৯ বছরেও হয়নি স্মৃতিসৌধ

মাদারীপুরে একাত্তর সালের এইদিনে রাজৈরের খালিয়া ইউনিয়নের সেন্দিয়া, পলিতা, ছাতিয়ানবাড়ী ও খালিয়া গ্রামের দেড় শতাধিক মুক্তিকামী মানুষ প্রাণ রক্ষা করতে গিয়ে আখ ক্ষেত ও ঝোপ-জঙ্গলের মধ্যে পাক বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলসামসদের হাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন। স্বাধীনতার ৪৯বছরেও এই গণহত্যা দিবস পালন বা স্মৃতি রক্ষার্থে কোন উদ্যোগ আজো গ্রহণ করা হয়নি। ফলে শহীদ পরিবারের সদস্য, স্বজন ও স্থানীয়রা তীব্র ক্ষোভ, অসন্তোষ ও স্বজনহারা ব্যথা বুকে নিয়ে এখনও ধুঁকে ধুঁকে মরছে।

জানা গেছে, পাকসেনারা মাদারীপুরের টেকেরহাট বন্দরে সেনা ক্যাম্প স্থাপন করে শুরু করে পৈশাচিকতা। ১৯৭১ সালের মে মাস। বাংলা ৫ জ্যৈষ্ঠ বিকেল ৪টা থেকে ৫টা পাকবাহিনী লঞ্চযোগে গোপালগঞ্জ জেলার ভেন্নাবাড়ী ঘাটে নেমে চরচামটা নামক এলাকা থেকে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ ও অগ্নি সংযোগ শুরু করে।

সেখান থেকে পাকবাহিনী তাদের দোসরদের সহযোগিতায় নৌপথে গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর হয়ে রাজৈরের কদমবাড়ী এলাকায় গান বোট থেকে নেমে সড়ক পথে বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে আসছে খবর পেয়ে খালিয়া ইউনিয়নের সেন্দিয়া, পলিতা, খালিয়া ও ছাতিয়ান বাড়ি এলাকার হাজার হাজার নিরীহ জনগণ আখ ক্ষেতসহ বিভিন্ন ঝোপ জঙ্গলে আশ্রয় নেয়।

যারা বাড়ি ঘর ছেড়ে পালাতে পারেনি তাদের ধরে নিয়ে যায় পশ্চিম সেনদিয়া ফকিরবাড়ির ভিটায়, সেনদিয়া বাওয়ালী ভিটায়, বারিকদার বাড়ির উত্তর বাঁশ বাগানে, শচীন বারিকদারের বাড়ির দক্ষিণ খালপাড় এবং ছাতিয়ানবাড়ির পুকুর পাড়ে। কারো চোখ বেঁধে, কারো হাত-পা বেঁধে, বাবা-মায়ের সামনে সন্তানকে, আবার সন্তানের সামনে বাবা-মাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। আবার কাউকে বুটজুতা দিয়ে লাথি মেরে ক্ষত-বিক্ষত করে আগুনে পুড়ে বা গুলি করে হত্যা করে।

প্রত্যক্ষদর্শী সেন্দিয়া গ্রামের শচীন্দ্র নাথ বারিকদারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৭১ সালের ৫ জ্যৈষ্ঠ অন্যান্য দিনের মত পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের হত্যা, লুন্ঠন ও অগ্নিসংযোগের কথা মনে করে আতঙ্কের মধ্যে দিয়ে সেন্দিয়ার বাড়িতে যখন অবস্থান করছিল। এমনি সময় সংবাদ আসছে পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা কদমবাড়ী থেকে অগ্নিসংযোগ করতে আসছে এ সংবাদ শুনে এলাকার জনগণ যে যেইভাবে পারছে পালানোর চেষ্টা করছে। এ সময় তাদের বাড়ির লোকজনও বাড়ির নিকটস্থ আখক্ষেতের মধ্যে পূর্বের করা গর্তের মধ্যে পালিয়েছিল। কিন্তু পালিয়েও প্রান রক্ষা হয়নি।

একই গ্রামের মাস্টার ক্ষিতিশ চন্দ্র বারিকদারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সে দিনের ঘটনায় পাক বাহিনী ও তাদের দোসররা ১৭টি গ্রামের ৫ শতাধিক ঘরবাড়ি গান পাউডার দিয়ে পুড়িয়ে তামা করে দেয় এবং অসংখ্য মানুষ হত্যা করে। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও এ এলাকার ঝোপ-জঙ্গল ও খালের পাড় খ্ুঁড়লেই পাক বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার আলবদর আলসামসদের হাতে নিহতের মাথার খুলি এবং হাড়-গোড় পাওয়া যাচ্ছে। যেখানে এতগুলো নিরীহ মানুষ পাকবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার আলবদর আলসামসদের হাতে প্রাণ হারাল সেখানে কোন সরকারই স্মৃতি রক্ষার্থে স্মৃতিস্তম্ভ বা স্মৃতিসৌধ নির্মাণ না করায় এলাকার মানুষের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে বলে তিনি জানান।

ছাতিয়ান বাড়ির কমলকান্তি বাড়ৈর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৫ জ্যৈষ্ঠ পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে তার মা ও দুই ভাই প্রান হারান। সে দিনের ঘটনা বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বার বার আতকে উঠেন।