সপ্তাহেরও বেশি অবরুদ্ধ শিবচর

ঢাকা, শনিবার, ৩০ মে ২০২০ | ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সপ্তাহেরও বেশি অবরুদ্ধ শিবচর

নিত্যানন্দ হালদার, মাদারীপুর ৯:৪০ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৮, ২০২০

print
সপ্তাহেরও বেশি অবরুদ্ধ শিবচর

গত ৭ মার্চ ২০২০। তখনো বাংলাদেশে করোনা আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মেলেনি। ওই দিন বাংলাদেশে আসেন শিবচর পৌর এলাকার এক ইতালি প্রবাসী। বাংলাদেশে করোনা আক্রান্তের কোনো সংবাদ পাওয়া না গেলেও ইতালিতে ওই সময় মহামারী চলছে। বাংলাদেশে পৌঁছার পর থেকেই তিনি সর্দি, জ্বর, কাশি ও গলা ব্যথা অনুভব করেন। চিকিৎসা নিতে প্রথমেই শরণাপন্ন হোন স্থানীয় সরকারি হাসপাতালের এক চিকিৎসকের। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ওই চিকিৎসক তাকে ঢাকায় চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন। ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসকরা তার ইতিহাস ও উপসর্গ বিশ্লেষণ করে কোভিড-১৯ আক্রান্ত বলে সন্দেহ করেন।

পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আইইডিসিআর-এ পরীক্ষা করলে তিনি কোভিড-১৯ পজিটিভ হন। এরপর আইইডিসিআর এর প্রতিনিধি দল মাঠে নেমে ওই করোনা রোগীর সংস্পর্শে আসা মানুষের তালিকা প্রস্তুত করে ব্যবস্থা নেয়। আইইডিসিআরের পরীক্ষায় একে একে কোভিড-১৯ পজিটিভ হয় তার স্ত্রী, ছয় বছর ও দুই বছর বয়সী দুই শিশু সন্তান, বাবা, শ্বশুর-শাশুড়ি, শ্যালকের স্ত্রী, চিকিৎসক ও এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

আইইডিসিআরের পরামর্শ অনুযায়ী আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা মানুষকে হোম কোয়ারেন্টিনে নেয়া হয়। হোম কোয়ারান্টাইনে নেয়া হয় তার ছয় বছরের মেয়ের স্কুলের ১৯ সহ-পাঠিকেও। 

গত ১২মার্চ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শিবচর উপজেলা প্রশাসন কিছু জরুরী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ১৩ মার্চ মাদারীপুর জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে শিবচরে আবার জরুরী সভা অনুষ্টিত হয়। সভায় মাদারীপুর পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন, আইইডিসিআররের প্রতিনিধি দল উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নূর-ই-আলম মিনার নেতৃত্বে জেলা পুলিশও সভা করে। সেখান থেকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত পৌর এলাকার ২ এবং ৩ নম্বর ওয়ার্ড, দক্ষিণ বহেরাতলা ইউনিয়নের একটি গ্রাম ও পাঁচ্চর ইউনিয়নের হাজীপুর গ্রামের কিছু স্থান। চারটি এলাকাকে ঝুকিপূর্ন হিসেবে চিহ্ণিত করা হয়। পরের দিন থেকে পুলিশ মোতায়েন করে চিহ্ণিত এলাকা জনবিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। জনসমাগম এড়িয়ে চলতে কঠোর নির্দেশ দেয় জেলা প্রশাসন।

সেখানের আগের দিনের সিন্ধান্ত আরো কঠিন ভাবে প্রয়োগ করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যাপারে একমত হন। এটাই দেশের মধ্যে প্রথম লকডাউন করা এলাকা। বিদেশ থেকে আসা রোগীর সংস্পর্শে আসেন তার শশুর বাড়ি ও নিজের পরিবার। এছাড়া প্রয়োজন অনুসারে কাউকে আইসোলেশনে এবং আক্রান্তদের সরকার নির্ধারিত চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এরমধ্যে গত বুধবার ২৫ মার্চ ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার বাবা মারা যান।

গত ৭ মার্চ শিবচরে এসে এ পর্যন্ত এই উপজেলায় একজন প্রবাসীর পরিবারের ৮ জনসহ নয়জন করোনা সংক্রমিত হয়েছে। এরমধ্যে আক্রান্ত প্রবাসীর বাবা মারা গেছেন। কিন্তু ওই প্রবাসীর অবাধ চলাফেরার কারণে আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও স্থানীয় কউিনিটির মধ্যে কতটুকু সংক্রমিত হয়েছে তা নিয়ে রয়েছে ব্যাপক সন্দেহ। প্রবাসী করোনা ভাইরাস বহন করে ভ্যানে চড়ে শিবচর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা-যাওয়া করেন। ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ্য না হলে সেখান থেকে বাসে চড়েই ঢাকায় যান। ঢাকায় গিয়ে এক আত্মীয়ের বাসায় স্ত্রী ও মেয়েসহ অবস্থান করেন এবং ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নেন। সেখানেও চিকিৎসকসহ কতজন সংক্রমিত হয়েছে আসলে তা সঠিক করে বলা মুশকিল। তারপরও আশার বানী হলো- আইইডিসিআর গত দুইদিনে শিবচরে ১৬ জনের নমুনা সংগ্রহ করলেও সবাই করোনা নেগেটিভ বলে জানাতে পেরেছে। এই এলাকা এখন উন্নতির দিকে বলে তিনি মনে করেন।

করোনা সংক্রমনের আতংকে সুনশান নিরবতা ও নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে গোটা শিবচর। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে শিবচরের চিহ্ণিত এলাকার ওই ৭০ হাজার মানুষই হোম কোয়ারান্টাইনে। শুধু তারাই নয়। এলাকার ৭ লাখ মানুষই স্বেচ্ছায় ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন। বাজার হাট-ঘাট সবই বন্ধ। স্থানীয় প্রতিটি ইউনিয়ন গ্রাম-পাড়া মহল্লার দোকান পাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। ভ্যান ও অটো চালকরা ঘরে বসেছেন। নি¤œ আয়ের মানুষ চরম বিপাকে। সকালের দিকে কাঁচা বাজার খোলা। কিন্তু সংক্রমন এড়াতে ঘর থেকে বের হচ্ছেন না মানুষ।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শাশাংক চন্দ্র ঘোষ জানান, এই উপজেলায় একজন প্রবাসীর পরিবারের ৮ জনসহ নয়জন করোনা রোগী সংক্রমিত হয়েছে। আইইডিসিআর গত দুইদিনে ১৬ জনের নমুনা সংগ্রহ করলেও করোনা নেগেটিভ পাওয়া গেছে।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আসাদুজ্জামান বলেন, প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ মিডিয়াকর্মীসহ সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় করোনা ঝুঁকি এড়াতে এক যোগে কাজ করছি। মানুষ বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হচ্ছে না। তারা এখন অনেক সচেতন।

শিবচর পৌর মেয়র আওলাদ হোসেন খান বলেন, ইতালি প্রবাসী শিবচরে এসে আত্মীয় বাড়ি বেড়াতে যান। সেখানে তার সংস্পর্শে স্ত্রী, ছয় বছর ও দুই বছর বয়সী দুই শিশু সন্তান, বাবা, শ্বশুর-শাশুড়ি, শ্যালকের স্ত্রী, চিকিৎসক ও এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু তার দ্বারা আক্রান্ত হন। ওই সকল আক্রান্তদের মধ্যে গত বুধবার ২৫ মার্চ ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার বাবা মারা যান। জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরীর নির্দেশে উপজেলার সর্বত্র হোম কোয়ারেন্টনে থাকা প্রবাসী ও স্বল্প আয়ের মানুষদে বাড়ি বাড়ি প্রয়োজণীয় খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছি।

মাদারীপুর সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ শফিকুল ইসলাম বলেন, জনৈক ইতালি প্রবাসী করোনা রোগের উপসর্গ নিয়ে প্রথমে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তার দেখান। পরে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নেন। সেখান থেকে আইইডিসিআরের পরীক্ষা নিরীক্ষায় তিনিই প্রথম করোনা ভোইরাসে আক্রান্ত রোগী বলে শনাক্ত হন।

মাদারীপুর জেলা প্রশাসক মোঃ ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, প্রবাসী অধ্যুষিত মাদারীপুর জেলা। এরপর আবার শিবচরের অনেক মানুষই ইটালিসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে বাস করেন। করোনা ভাইরাস আক্রান্ত ব্যাক্তি গত ৭ মার্চ প্রথম এদেশে প্রবেশ করেন। তিনিই সম্ভবত এই দেশের প্রথম শনাক্তকৃত করোনা রোগী।

জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী এমপি করোনা সংক্রমনের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করতে এলাকার মানুষকে ধৈর্য্য ধরে ঘরে থাকার আহবান জানান। তিনি বলেন, হোম কোয়ারেন্টাইনে এলাকার মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার পৌঁছে দেয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছি। উপজেলার ১৯ ইউনিয়ন ও শিবচর পৌর এলাকার সর্বত্র হোম পকায়ারাইন্টেনে থাকা প্রবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষদের কাছে খাবার পৌঁছে দেবো। ঘরে খাবার না থাকলে মানুষ ঘর থেকে বের হবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই, যাতে খাবারের জন্য ঘর থেকে বের হতে না হয়। সেজন্য ঘরবন্দি মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় খাবারের ব্যবস্থা করেছি। মানুষ কষ্ট করে ঘরে থাকলেও অনন্ত তাদের না খেয়ে থাকতে হবে না।