আশুলিয়ায় শিক্ষক হত্যা: বৃহৎ আন্দোলনের ডাক

ঢাকা, শনিবার, ১৩ আগস্ট ২০২২ | ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

আশুলিয়ায় শিক্ষক হত্যা: বৃহৎ আন্দোলনের ডাক

শাহিনুর রহমান শাহিন, সাভার
🕐 ২:৫৩ অপরাহ্ণ, জুন ২৯, ২০২২

আশুলিয়ায় শিক্ষক হত্যা: বৃহৎ আন্দোলনের ডাক

ঢাকার আশুলিয়ায় হাজী ইউনুছ আলী কলেজের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর উৎপল কুমার সরকারের হত্যাকারীকে দ্রুত গ্রেফতারপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানিয়ে ৩য় দিনের মত বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছে শিক্ষার্থীরা। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার সাভার ও আশুলিয়ার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষনা দেয় শিক্ষার্থীরা। সেই সাথে আগামী ২৪ঘন্টার মধ্যে মূল আসামী জিতুকে গ্রেফতার করা না হলে আরো বৃহৎ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে বলেও হুশিয়ারি দেয় শিক্ষার্থীরা।

বুধবার সকাল ৯টার দিকে আশুলিয়ার চিত্রশাইল হাজী ইউনুছ আলী কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এ কর্মসূচি পালন করে। এছাড়া আগামীকাল বৃহস্পতিবার সাভার উপজেলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মবিরতি সহ উপজেলা চত্বরে সমাবেশ করবে বলেও মানব বন্ধন থেকে জানানো হয়। এর আগে মঙ্গলবার বেলা ১১ টার দিকে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করে এবং সেখানে ৬ দফা দাবি তুলে ধরে শিক্ষার্থীরা।

নিহত শিক্ষক উৎপল সরকার সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থানাধীন এঙ্গেলদানি গ্রামের মৃত অজিত সরকারের ছেলে। তিনি প্রায় ১০ বছর ধরে আশুলিয়ার চিত্রশাইল এলাকার হাজী ইউনুছ আলী কলেজের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে শিক্ষা দান করে আসছিলেন এবং একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা বলেন, আগামীকাল বৃহস্পতিবার সবচেয়ে বৃহৎ কর্মসূচী ঘোষনা করা হয়েছে। আগামীকাল সাভার উপজেলার সমস্ত স্কুল কলেজ আনুষ্ঠানিক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কাল বেলা ১১ টার দিকে সাভার উপজেলা চত্তরে উপজেলার সকল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশে করা হবে।

শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, ঘটনার পরপরই জিতুকে আটক করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু তার প্রভাবশালী পরিবারের লোকজন এসে তাকে নিয়ে যায়। আবার সন্ধ্যায় দিকে বন্ধুদের নিয়ে এলাকায় প্রকাশ্যে আড্ডা দিয়েছে।

স্যারের অবস্থার অবনতি হলে পর দিন জিতুর পরিবারসহ সকলেই পালিয়ে যায়। ঘটনার দিন প্রমিলা ক্রিকেট ম্যাচের ৪ ওভারের মাথায় শিক্ষক উৎপলকে স্টাম্প দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে জিতু। আমরা জিতুর ফাঁসি চাই। এঘটনায় মামলা হলেও জিতুর বয়স দেখানো হয়েছে ১৬ বছর। কিন্তু জিতুর প্রকৃত বয়স মূলত ১৯ বছর। সে কয়েক বছর শিক্ষা বিরতি দিয়ে এই স্কুলে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছে। এরআগে সে সাভারের একটি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করতো। আমাদের দাবি জিতুর জন্ম সনদ খুঁজে তার বয়স তদন্ত করার জন্য।

শিক্ষকদের মানববন্ধন :
হাজী ইউনুছ আলী কলেজের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর উৎপল কুমার সরকারের উপর হামলা ও নির্মম মৃত্যুর তীব্র নিন্দা এবং হত্যাকারীকে দ্রুত গ্রেফতারপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানিয়ে বুধবার দুপুরে জামগড়া ফ্যান্টাসি কিংডমের সামনে মানব বন্ধন কর্মসূচী পালন করেছে আশুলিয়া অঞ্চলের সকল শিক্ষক-শিক্ষিকারা।

মানববন্ধনে এসময় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বক্তব্যে বলেন, বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকরা বিভিন্নভাবে লাঞ্চনার শিকার হচ্ছে। এমন এক পর্যায়ে চলে এসেছে যে আহত হতে হতে এখন নিহতো হতে হচ্ছে। একজন শিক্ষককে এভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে যে আজ পুরো জাতির শিক্ষককে যেন হত্যা করা হয়েছে। তাই অবিলম্ভে যত দ্রুত সম্ভব হত্যাকারীকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানান তারা।

মানববন্ধনে আশুলিয়ার জামগড়া, নরসিংহপুর, চিত্রশাইল, গাজীরচট সহ বিভিন্ন এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান অভিযুক্তের বাবা আটক :
হাজী ইউনুছ আলী কলেজের প্রফেসর উৎপল কুমার সরকারকে ক্রিকেট খেলার স্টাম্প দিয়ে পিটিয়ে হত্যার মূল অভিযুক্তের বাবা উজ্জল হাজীকে কুষ্টিয়ার কুমারখালি থানা এলাকা থেকে আটক করে আশুলিয়া থানা পুলিশ।

বিষয়টি নিশ্চিত করে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসএম কামরুজ্জামান জানান, রাতেই অভিযান চালিয়ে কুষ্টিয়ার কুমারখালি থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। পরে সকালে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে তাকে ঢাকার মূখ্য বিচারিক আদালতে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া মামলার প্রধান আসামী আশরাফুল ইসলাম জিতুকেও আটক করতে পুলিশের একাধিক টিম বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে: এসপি ঢাকা
কলেজ শিক্ষক উৎপল কুমার সরকার হত্যাকান্ডের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার মোঃ মারুফ হোসেন সরদার (বিপিএম, পিপিএম)।

বুধবার দুপুরে আশুলিয়ার চিত্রশাইল এলাকায় হাজী ইউনুছ আলী কলেজ পরিদর্শনে এসে সংবাদকর্মীদের তিনি একথা জানান।
এসপি জানান, তিনি এখানে এসেছেন শিক্ষকদের সাথে কথা বলতে। যাতে স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ না হয়, স্কুলের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে। সেই সাথে এ ঘটনার সাথে কি কারণ ছিল, কি বিষয় ছিল, তা সরজমিনে দেখার জন্য, শিক্ষকদের সাথে কথা বলার জন্য এবং আমরা আমাদের তদন্তে সে বিষয়গুলো উঠে আসবে।

মামলায় অভিযুক্তের বয়স কম দেখানো হয়েছে সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার জানান, মামলায় কি দেখানো হল এটা গুরুত্বপূর্ণ না, প্রয়োজনে ডাক্তারি পরীক্ষা করে নিয়ে আসব। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা চেষ্টা করি ডাক্তারি পরীক্ষা করে নিয়ে আসা।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে এসপি জানান, মামলার তদন্তে ধীর গতির কোন কিছু নাই। জানানোই হয়েছে ঘটনার দিন রাতে। যখন জানানো হয়েছে তার পরবর্তীতেই আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। ধীর গতির কিছু নাই, পুলিশের কার্যক্রম প্রথম থেকেই স্বাভাবিক গতিতেই চলছে। এরই মধ্যে আমাদের বেশ কয়েকটি টিম মানিকগঞ্জ, কুষ্টিয়া সহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে। এঘটনায় এরই মধ্যে মামলার যে মূল আসামী তার বাবাকে কুষ্টিয়া থেকে আটক করা হয়েছে। তাকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া খুব শীগ্রই মূল আসামীকে গ্রেফতার করা হবে। এছাড়া ঘটনার সাথে জড়িত সকলকেই আইনের আওতায় আনা হবে বলেও জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, গত শনিবার (২৫ জুন) দুপুরে আশুলিয়ার চিত্রশাইল এলাকায় হাজী ইউনুছ আলী কলেজ মাঠে শিক্ষক উৎপলকে ক্রিকেট খেলার স্টাম্প দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দশম শ্রেণির ছাত্র আশরাফুল ইসলাম জিতু।

পরে গুরুতর আহত অবস্থায় শিক্ষককে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় নারী ও শিশু হাসপাতালে এবং পরে তার অবস্থার অবনতি হলে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সেখানেই ২৭ জুন সোমবার ভোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। এ ঘটনায় রোববার আশুলিয়া থানায় নিহতের বড় ভাই বাদী হয়ে মামলা করেন। এর পর থেকেই বিক্ষোভে ফুঁসে উঠে শিক্ষার্থীরা।

 

 
Electronic Paper