কাজু বাদাম চাষে নবদিগন্ত

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২১ | ১৩ মাঘ ১৪২৭

কাজু বাদাম চাষে নবদিগন্ত

তানজেরুল ইসলাম ও কৌশিক দাশ, বান্দরবান ১০:০২ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৩, ২০২১

print
কাজু বাদাম চাষে নবদিগন্ত

বান্দরবানের স্থানীয় অধিবাসীদের দেওয়া নাম ‘টাম’। সবার কাছে পরিচিত কাজু বাদাম। প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা সংকটে এক সময় এ দেশে চাহিদাসম্পন্ন এ বাদাম চাষে আশাহত হতে হয়েছিল চাষিদের। সে সময় দেশের উৎপাদিত কাজু বাদামের প্রক্রিয়াজাত হতো বিদেশে। এখন সে সংকট অনেকটাই কেটেছে বান্দরবানে। এখন এখানে গড়ে উঠেছে ‘কিষান ঘর এগ্রো’। এই এগ্রো ফার্মে এখন দেশের মাটিতেই দেশের কাজু বাদামের হচ্ছে প্রক্রিয়াজাত। বিদেশেও শুরু হয়েছে প্রক্রিয়াজাতকৃত কাজু বাদামের রপ্তানি। ফলে হাসি ফুটেছে কাজু বাদাম চাষিদের ঠোঁটে। এদিকে কাজু বাদামের প্রতিয়াজতকরণ কারখানা ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র।

জানা যায়, ১৪৯৮ সালে ভাস্কো দা গামার হাত ধরে উপমহাদেশে প্রবেশ করে কাজু বাদাম। ধীরে ধীরে দেশের তিন পার্বত্য জেলায় কাজু বাদাম চাষ বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বান্দরবানে কাজু বাদাম চাষিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, এক সময় বান্দরবান পাহাড়ে কাজু বাদাম খেতে আবাদকৃত বাদাম গাছেই নষ্ট হয়ে যেত। সে সময় দেশের উৎপাদিত কাজু বাদাম বিদেশে পাঠিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে আবার দেশের বাজারে এনে বিক্রি করতে হতো। বাদাম প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পাইকার সংকটে লোকসানের মুখে পড়ত চাষিরা। কাজু বাদাম উৎপাদনের সঙ্গে জড়িতরা জানান, বান্দরবানসহ রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে উৎপাদিত কাজু বাদাম মাঠ থেকে সংগ্রহ এবং প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে দেশ বিদেশে রপ্তানির জন্য বান্দরবান পশ্চিম বালাঘাটায় গড়ে উঠেছে কিষান ঘর এগ্রো। প্রায় ২০ শতক জমিতে গড়ে ওঠা কারখানাটি তিন পার্বত্য জেলায় সবচাইতে বড় বাদাম প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা এটি। এখন আর বিদেশ থেকে কাজু বাদাম প্রক্রিয়াজাত করে আনতে হয় না বলে দেশের বাজারে এর দামও আগের তুলনায় কম, বলছেন তারা।

কিষান ঘর এগ্রো কারখানায় কর্মরত সুপারভাইজার মো. ইসরারুল হক চৌধুরী জানান, কারখানায় প্রথম পর্যায়ে বান্দরবানের রুমা, থানচি এবং রোয়াংছড়ি থেকে কাজু বাদাম সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে চাষিদের কাছ থেকে বাদাম সংগ্রহ, ভালো মানের বাদাম বাছাইয়ের মাধ্যমে পরিষ্কার ও রোদে শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে প্যাকেটজাত করা হচ্ছে।

কিষান ঘর এগ্রো কারখানায় কর্মরত সহকারী সুপারভাইজার মো. রকি উদ্দিন জানান, তিনিসহ অর্ধশতাধিক শ্রমিক এই কারখানায় কর্মরত। সরাসরি চাষিদের হাত থেকে বাদাম সংগ্রহ করায় চাষিরা লাভবান হচ্ছে। কারখানায় কর্মরত নিয়মিত কর্মচারী এবং দৈনিক শ্রমিকদের মজুরি সন্তোষজনক।

শ্রমিক ইয়াসনুর বেগম জানান, প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কারখানায় কাজ করেন। এক কোজি গোটা কাজু বাদাম বাচাই করলে মজুরি হিসেবে ১০০ টাকা এবং অর্ধ ভাঙা এক কেজি কাজু বাদাম বাচাই করলে ৬০ টাকা পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন। এতে তার সংসার ভালোই চলছে।

বান্দরবান সদর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, বান্দরবানে ১৭৯৭ হেক্টর জমিতে কাজুবাদাম চাষ হচ্ছে। জেলায় ২ হাজার ৭৭৯ জন কাজুবাদাম চাষি রয়েছেন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে জেলায় কাজু বাদামের মোট উৎপাদন ১৩২৩ মেট্রিক টন। কিষান ঘর এগ্রো কারখানা পরিচালক তোহা চৌধুরী জানান, ১৫টি অত্যাধুনিক মেশিনের মাধ্যমে সেরা মানের বাদাম প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। প্যাকেটজাত বাদাম বান্দরবান, চট্টগ্রাম, ঢাকা, রাজশাহী, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় রপ্তানি হচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরে রপ্তানির পাশাপাশি সম্প্রতি কারখানাটি লন্ডনে কাজু বাদাম রপ্তানির অর্ডার পেয়েছে। ইতিমধ্যে প্রথম ধাপে এই প্রথম দেশের বাইরে কাজু বাদাম রপ্তানি করা হয়েছে।

কিষান ঘর এগ্রো কারখানার চেয়ারম্যান মো. তরিকুল ইসলাম জানান, বান্দরবানের কাজু বাদাম চাষিদের বাদাম স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করে জেলা সদরে প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করার লক্ষে আমরা ৪ জন উদ্যোক্তা কারখানাটি গড়ে তুলি। এই কারখানা যাত্রার মধ্য দিয়ে বান্দরবানে কাজু বাদাম চাষিরা লাভবান হয়েছে। বিদায়ী বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে কারখানায় কাজু বাদাম প্রক্রিয়াজাত শুরু হয়। দেশে কৃষি বিকাশ এবং কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

বান্দরবান সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক বলেন, দুই দশক আগে থেকে বান্দরবানে কাজু বাদাম চাষ হয়ে আসছে। যদিও কাজু বাদামের বাজার সৃষ্টি এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ সংকটে বাদাম চাষিদের ভাগ্যোন্নয়ন হয়নি। তবে বিগত কয়েক বছর ধরে বান্দরবান সদর উপজেলা কৃষি অফিসের সহায়তায় চাষিরা কাজু বাদাম বাগান বৃদ্ধি করেছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় চাষিরা উৎপাদন বৃদ্ধিতে মনোনিবেশ করেছে। দেশে সবচাইতে বেশি এবং গুণগত মানসম্মত কাজু বাদাম উৎপাদন হচ্ছে বান্দরবানে।