খুরুশকুল আশ্রয়ণে অচলাবস্থা

ঢাকা, বুধবার, ২ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

খুরুশকুল আশ্রয়ণে অচলাবস্থা

মো. নেজাম উদ্দিন, কক্সবাজার ১১:১৪ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০২০

print
খুরুশকুল আশ্রয়ণে অচলাবস্থা

 

তিন দশক আগের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে ঘরদোর হারানো অসহায়দের জন্য তৈরি হয় খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্প। কক্সবাজার শহর থেকে সাত কিলোমিটার উত্তরে বাঁকখালী তীর ঘেঁষে নির্মিত ১৯টি দৃষ্টিনন্দন ভবনে স্থান পেয়েছে ৬০০ পরিবার। আরও একটি ভবনের কাজ শেষের পতে। অনেক স্বপ্ন নিয়ে এসব পাকা দালানে বসবাস শুরু করেন তারা। সুরম্য অট্টালিকায় বসবাসের জায়গা মিললেও নিরাপদ খাওয়ার পানির তীব্র সংকটে অতিষ্ঠ তারা। কর্তৃপক্ষকে বারবার জানিয়েও সুরাহা হয়নি। এদিকে আশ্রয়নে বসবাসকারী অন্তত ৪০০ পরিবার এখনো কর্মহীন। যারা কাজ করছেন, তারা এলাকার চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী, দুর্বৃত্তদের কাছে জিম্মি হয়ে আছেন। নিয়মিত শিকার হচ্ছেন নির্যাতনের। পথ আটকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে দিনের সঞ্চয়। হুমকি-ধামকি তো আছেই। ফলে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তারা। সরেজমিনে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গিয়েছে। তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগের কথা তুলে ধরে সব সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

ঝিনুক ভবনের বাসিন্দা মুহাম্মদ হোসেন (৩৭) জানান, শুরু থেকে তারা পানি নিয়ে খুব সমস্যায় আছেন। কর্তৃপক্ষকে বারবার বলেও কাজ হয়নি। অনেক দূরের মনুপাড়া পাড়া থেকে টমটম গাড়িতে করে খাবার পানি আনতে হয়। তার মতো অভিযোগ সবারই। তারা জানান, লবণাক্ত পানি দিয়ে রান্না-গোসলও সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে মনুপাড়া থেকে পানি আনার সময় বখাটেরা বাধা দিচ্ছে, চাঁদা দাবি করছে। নীলাম্বরী ভবনের হেলাল উদ্দিন বলেন, একদিকে দুর্বৃত্তদের ভয়, অন্যদিকে খাবার পানির সংকটে আশ্রয়ণ প্রকল্পের সবার জীবন অতিষ্ঠ। প্রথম দিকে কিছু পানি সরবরাহ করা হলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। এখন প্রতি বোতল পানি ৫০ টাকা করে কিনে খেতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, কাজ শেষে ঘরে ফেরার পথও নিরাপদ নেই। রাতের আঁধারে ছিনতাই করা হচ্ছে। মারধর আর হত্যার হুমকি এখন নিত্য-নৈমিত্ত্যিক ব্যাপার। শনখালী ভবনের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম (৩৪) পেশায় দিনমজুর। তিনি বলেন, কাজ শেষে গত ১৭ অক্টোবর রাত ৮টার দিকে বাসায় ফেরার পথে মজুরির টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। পরে ধানখেতে নিয়ে গিয়ে নির্দয়ভাবে মারধর করে। গলায় ফাঁস লাগিয়ে ফেলাতে গিয়েছিল তারা। ঝিনুক ভবনের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম জানান, গত রোববার দিনেদুপুরে তার মুদি দোকানের জন্য মালামাল নিয়ে ফেরার পথে আক্রমণের শিকার হন।

পঞ্চাশোর্ধ বয়সী শফিউল আলম বলেন, আগে ঝুপড়িতে থাকলেও ঘুমাতে পেরেছেন। এখন সম্পূর্ণ বিপরীত। কামিনী ভবনের বাসিন্দা জহির মাঝিও (৫৭) বলেন একই কথা। তাদের মতো আরও অনেকে বলেন, এখানে কাজ নেই। ভিক্ষাও মেলে না মানুষের কাছে। দিনে একবেলা খাবারের জোগান নেই। না খেয়েই কাটাতে হয় মাঝে মাঝে। তারা জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধিকাংশ শুঁটকিশ্রমিক, জেলে, ভ্রাম্যমাণ শুঁটকি বিক্রেতা, রিকশা ও ভ্যানচালক, যাদের দিনে এনে দিনে খেতে হয়। তাদের অনেকের এখন কাজ নেই।

এ প্রসঙ্গে কক্সবাজার সংরক্ষিত পৌর কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র শাহেনা আকতার পাখি জানান, খুরুশকুল বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতার ফসল। কিন্তু ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা ফ্ল্যাট পেলেও এখানে তারা বেকার। কর্মসংস্থানমূলক প্রকল্প গড়ে না তুললে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জীবন ধারণ ও বেঁচে থাকা দায় হবে। অন্যদিকে প্রকল্পের ৬০০ মানুষের জীবনের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ ফাঁড়ি প্রয়োজন। পানির সমস্যা সমাধানেও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগের কথা জানান তিনি।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, আশ্রয়ণ প্রকল্পে নিরাপদ পানি সরবরাহের জন্য জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের ৯৭২ লক্ষ টাকার বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে পাম্প হাউস ও পানি সরবরাহ লাইন স্থাপন। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী ঋত্ত্বিক চৌধুরী জানান, খাবার ও গোসলের পানির জন্য পৃথক দুইটি প্রস্তাবনা রয়েছে। অনেক বড় প্রকল্প দরকার। আপাতত সেলো মেশিন বসিয়ে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, প্রকল্প থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে পিএমখালী থেকে পানি আনার বিষয়ে পরিকল্পনা রয়েছে। তা বাস্তবায়ন কলে পানি সমস্যা দূর হবে মনে করেন প্রকৌশলী ঋত্ত্বিক চৌধুরী।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সমস্যার কথা প্রশাসন ইতোমধ্যে অবগত হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ির জন্য ঢাকায় প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। তার আগে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প বসানোর চিন্তা চলছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের আইন শৃঙ্খলাসহ সার্বিক বিষয়ে সদর ইউএনও দেখভাল করছেন। এছাড়া আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রকল্প এলাকায় গড়ে তোলা হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবার জন্য হাসপাতাল, ক্লিনিক, বিনোদনের পার্ক ইত্যাদি। উপকারভোগীদের অধিকাংশের পেশার দিকে নজর রেখে শুঁটকি উৎপাদনের জন্য প্রকল্প এলাকায় আধুনিক শুঁটকিপল্লী তৈরির কথাও জানান তিনি।

উল্লেখ্য ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে জেলার কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চকরিয়া, পেকুয়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ঘরবাড়ি হারিয়ে বিমানবন্দরের পাশে সমুদ্র উপকূলে আশ্রয় নিয়েছিলেন গৃহহীন এসব মানুষ। পরে অধিগ্রহণ করা সরকারি খাসজমিতে বসবাসকারী ৪ হাজার ৪০৯ পরিবারের অন্তত ২০ হাজার জলবায়ু উদ্বাস্তুকে পুনর্বাসনের জন্য খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। এ পর্যন্ত পাঁচতলাবিশিষ্ট ১৯টি ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। আরও একটি ভবনের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে।