করোনা সংকটেও কক্সবাজারে মাদক কারবারে রোহিঙ্গারা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২০ | ২২ শ্রাবণ ১৪২৭

করোনা সংকটেও কক্সবাজারে মাদক কারবারে রোহিঙ্গারা

মো. নেজাম উদ্দিন, কক্সবাজার ১০:০৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০২০

print
করোনা সংকটেও কক্সবাজারে মাদক কারবারে রোহিঙ্গারা

গত চার মাস ধরে কক্সবাজারসহ পুরো বাংলাদেশ করোনা আতঙ্কে। সাধারণ মানুষকে করোনার হাত থেকে রক্ষা করতে জেলার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যস্ত সময় পার করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে কিছু মাদক কারবারি সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাদের মাদক ব্যবসায়ের প্রসার ঘটাতে সারা দেশে বিভিন্ন মাধ্যমে মরণ নেশা ইয়াবা পাচারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

এরই মাঝে কিছু মাদক কারবারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে অনেক সময় বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয়। এদের মধ্যে অধিকাংশ মাদক কারবারি রোহিঙ্গা বলে জানা যায়।

কক্সবাজারের ‘মাদক বহনকারী’ থেকে ইয়াবা ব্যবসায়ী হয়ে উঠেছে বাংলাদেশে বসবাসকারী শরণার্থী রোহিঙ্গারা। কক্সবাজার জেলায় রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় ইয়াবাসহ শরণার্থীদের আটকের সংখ্যাও দিন দিন বেড়ে চলেছে। দেশের  আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুক যুদ্ধে অনেকেই প্রাণ হারাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমার থেকে ইয়াবা এনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছে রোহিঙ্গা নারী , কিশোর ও পুরুষরা। গত বছর মে মাসে সরকার ‘চলো যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’ স্লোগান মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে সীমান্তে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নড়েচড়ে বসে।

তখন থেকেই ইয়াবা কারবারিদের প্রথম ধাক্কা লাগে। ইয়াবার আস্তানায় এবং ইয়াবা কারবারিদের ঘরে ঘরে পুলিশের একের পর এক হানায় নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে কারবারিরা। এছাড়া সীমান্তে র‌্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে। এদিকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের তৈরি করা ইয়াবা কারবারিদের তালিকায় বেশ কয়েকজন নেতৃস্থানীয় রোহিঙ্গা শরণার্থীর নাম আছে বলে বিশেষ সূত্রে জানা যায়। এদিকে রোহিঙ্গা নেতাদের দাবি, ইয়াবা গডফাদারদের অধিকাংশ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ঘনিষ্ঠ।

র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ান র‌্যাব ১৫ সূত্র জানিয়েছে, এই বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে ১০,৮৩,৭১৯ পিস। গ্রেফতার হয়েছে ১৮৭জন আর র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয়েছে ১০জন।

মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তারা বলছেন, মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ বাড়ার পর মেথাফেটামাইন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি ‘উত্তেজক বড়ি’ য়াবার পাচার বেড়ে গেছে। যে কারণে ২০১৬ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত অনেক বেশি ইয়াবার চালান ও পাচারকারী ধরা পড়ছে। বিগত চার বছরে প্রায় ৫ হাজারের বেশি আসামি ধরা পরেছে।

রোববার (৬ জুলাই) দিবাগত রাতে কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলার ওয়াব্রাং গ্রামের নাফ নদের তীর সাঁতরিয়ে ইয়াবা নিয়ে অনুপ্রবেশকালে বিজিবির সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুই রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। এ সময় উদ্ধার করা হয়েছে ৫০ হাজার ইয়াবা, একটি চায়না পিস্তল ও দুই রাউন্ড কার্তুজ।

টেকনাফ-২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল ফায়সাল হাসান খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। নিহতরা হলেন, উখিয়া কুতুপালং ৫ নম্বর ক্যাম্পের জি ২/ই ব্লকের মোহাম্মদ শফির ছেলে মো. আলম (২৬) ও বালুখালী ২ নম্বর ক্যাম্পের কে-৩ ব্লকের মো. এরশাদ আলীর ছেলে মো. ইয়াছিন (২৪)।

কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন (৩৪ বিজিবি) সূত্রে জানা গেছে, জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত চোরাচালান ও মাদকবিরোধী অভিযানে ৩৪,২৩,৮৯,১০ টাকা মূল্যের ১১,৪১,২৯৭ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে ও ৮৯ জন আসামি আটক করা হয়। এছাড়াও বিজিবির সঙ্গে বন্দুক যুদ্ধে ৯ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে।

তাদের সর্বশেষ অপারেশন গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ভোর ৪টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের তুলাতলী জলিলের ঘোনা ব্রিজের পাশে বিজিবির সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তিন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। তারা ইয়াবা কারবারি ছিল বলে দাবি করেছে বিজিবি। এ সময় তিন লাখ পিস ইয়াবা, দুটি দেশীয় পাইপগান ও পাঁচ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে।

টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ জানিয়েছেন, টেকনাফে পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে দুই মাদক কারবারি নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) ভোরে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পশ্চিম মহেশখালীয়া পাড়ার কম্বনিয়া এলাকায় এ গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র, গুলি ও ইয়াবা জব্দ করা হয়।

চলতি বছরের জুন মাস থেকে গতকাল পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ৬০ জন নিহত হয়েছে বলে জানা যায়। তার মধ্যে ২৬ জন সক্রিয় ডাকাত ছিল বলে জানা যায়। বাকিরা রোহিঙ্গা মাদক কারবারি। 

কক্সবাজার র‌্যাব-১৫ এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার আজিম আহমেদ বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ দমনে র‌্যাবের প্রতিনিয়ত অভিযান চলছে। পাশাপাশি মাদক পাচারে জড়িত বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে। র‌্যাবের সঙ্গে গুলি বিনিময়ের ঘটনাও ঘটেছে। টহল জোরদার করেছে র‌্যাব।’

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, ‘রোহিঙ্গারা আশ্রয় নেওয়ার পর অবস্থান যতটা নীরব ছিল, এখন তেমনটি নেই। আগে তাদের চাহিদা ছিল খাদ্য এবং চিকিৎসার ওপর। এখন রেশনের খাবার খেয়ে আলস্যতার কারণে তাদের মাথায় দুষ্টবুদ্ধি কাজ করে প্রতিনিয়ত। তাছাড়া ক্যাম্পগুলোতে অর্ধেকেরও বেশি যুবক। ফলে অপরাধ প্রবণতা বাড়ার কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে সংখ্যাগত দিক দিয়ে একটু খারাপের দিকেই যাচ্ছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। নিয়মিত টহল ও অভিযান জোরদার করেছে পুলিশ। কঠোর অবস্থান ও নজরদারিতে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।’