নির্জন সৈকতে প্রকৃতির ডানা

ঢাকা, বুধবার, ৩ জুন ২০২০ | ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

নির্জন সৈকতে প্রকৃতির ডানা

নেজাম উদ্দিন, কক্সবাজার ৪:০৬ অপরাহ্ণ, মার্চ ৩০, ২০২০

print
নির্জন সৈকতে প্রকৃতির ডানা

করোনা ভয়াবহতার সাথে যুদ্ধ করছে বিশ্বের মানুষ। করোনা আক্রান্তের ভয়ে সবাই যে যার মতো ঘওে অবস্থান করছে। চেষ্টা করছে এই ভয়াবহ কররোনা ভাইরাস থেকে কিভাবে রক্ষা পাওয়া যায়। বিশে^ আজ অবধি প্রায় ৪ হাজার অধিক মানুষ মারা গিয়েছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে অতি মাত্রায় এই পর্যন্ত বাংলাদেশে ৪৮ জন আক্রান্ত হওয়ার খবর আছে। করোনা সতর্কতায় কক্সবাজারের পর্যটন কেন্দ্রগুলো বন্ধ ১৮ মার্চ থেকে। সৈকত হয়ে পড়েছে জনমানব শূণ্য। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রকৃতি হাসছে আপন মনে।

সবুজে ভরে গেছে সমুদ্র সৈকতের পাড়। সৈকতের এ নজিরবিহীন নির্জনতার পক্ষকাল পার হওয়ার আগেই ডানা মেলতে শুরু করেছে প্রকৃতির রাজ্য। এখন নির্জন সৈকতে গেলেই ধরা পড়ে প্রকৃতির রাজ্যের বাসিন্দাদের অবাধ রাজত্ব। এ স্বতন্ত্র রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি সদস্য সাগর লতা এখন বিনা বাধায় ডালপালা মেলছে আর সেই ডালপালায় আটকে পড়া বালুরাশি ক্রমশ: জমতে জমতে তৈরি হচ্ছে বালিয়াড়ি। সমুদ্রে পর্যটক নামতে না পারায় ডলফিন মোড় এখন ডলফিনদের আয়ত্বে চলে গেছে। অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন রংয়ের ডলফিন।

কক্সবাজার সমুদ্র বিস্তৃত হওয়ার পরেও ডলফিন মোড় নাম থাকার পরেও গত কয়েক দশক ডলফিননের দেখা মেলেনি। সপ্তাহ ধরে চলা নিষেধাজ্ঞার ফলে সৈকতে ফিরে এসেছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। আর এই সুযোগে ডলফিনের দল সৈকতে এসেছে খেলা করতে।

গত শনিবার সকালে কলাতলী পয়েন্টে গিয়ে দেয়া যায়, সেখানকার নীল জলে বিরল প্রজাতির ১০ থেকে ১২টি ডলফিন লাফিয়ে লাফিয়ে খেলা করছে। সমুদ্রপাড় থেকে খেলা করার দৃশ্য পরিষ্কার দেখা যায়।

কয়েক দিন আগে কয়েকজন সার্ফার সমুদ্র সৈকতে গিয়ে ডলফিনের খেলা প্রথম প্রত্যক্ষ করেন। মাহাবুবুর রহমান নামের এক সার্ফার ডলফিনের ওই খেলার দৃশ্য ভিডিও করেন। এই দলে বাচ্চাসহ ১০ থেকে ১২টি ডলফিন ছিল।

স্থানীয় সার্ফার মাহবুবুর রহমান জানান, এর আগে কখনও তিনি কক্সবাজার সৈকতে ডলফিনের খেলা দেখেননি। স্থানীয় কয়েকজন জানান, গত ৩ দশকে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে কখনও ডলফিনকে খেলা করতে দেখা যায়নি।

এদিকে সমুদ্র সৈকতে মাটির ক্ষয়রোধ এবং শুকনো উড়ন্ত বালুরাশিকে আটকে বড় বড় বালির পাহাড় বা বালিয়াড়ি তৈরির মূল কারিগর হিসাবে পরিচিত সাগরলতা। সাগরে ঝড়-তুফান বা ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস উপকূলে ঠেকিয়ে রাখে বলে বালিয়াড়িকে সৈকতের রক্ষাকবচ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু পর্যটন শিল্পের কারণে দখল ও দূষণের শিকার হয়ে গত প্রায় ৩ দশকে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্র সৈকতের বড় বড় বালিয়াড়িগুলো প্রায়ই হারিয়ে গেছে। ধীরে ধীরে সমুদ্র তীর ভাঙনের শিকার হয়ে হাজার হাজার একর ভূমি সাগরগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আর সেই বিধ্বস্ত প্রকৃতি আপনা আপনি পূনর্গঠিত হচ্ছে করোনা নিষেধাজ্ঞার নির্জনতার সুযোগে।

গত কয়েকদিন সরেজমিন কক্সবাজারের নির্জন সৈকতের বিভিন্ন স্পটে গিয়ে চোখে পড়ে আপন গতিতে প্রকৃতির পরিবেশগত পুনরুদ্ধারের বিষয়টি।

উন্নত বিশ্বের গবেষণা ফলাফলে সাগরলতার মত দ্রাক্ষালতা সৈকত অঞ্চলে পরিবেশগত পূনরুদ্ধার ও মাটির ক্ষয় রোধের জন্য একটি ভাল প্রজাতি বলে প্রমাণিত হয়েছে। সাগরলতা ন্যূনতম পুষ্টিসমৃদ্ধ বেলে মাটিতে বেড়ে ওঠতে পারে। তার পানির প্রয়োজনীয়তাও কম হয়। উচ্চ লবণাক্ত মাটিও তার জন্য সহনশীল। এর শিকড় মাটির ৩ ফুটের বেশি গভীরে যেতে পারে। এটি দ্রুতবর্ধনশীল একটি উদ্ভিদ। বাইরের কোন হস্তক্ষেপ না হলে লতাটি চারিদিকে বাড়তে থাকে এবং সর্বোচ্চ সামুদ্রিক জোয়ারের উপরের স্তরের বালিয়াড়িতে জাল বিস্তার করে মাটিকে আটকে রাখে। এরপর বায়ূ প্রবাহের সাথে আসা বালি ধীরে ধীরে সেখানে জমা হয়ে মাটির উচ্চতা বৃদ্ধি করে। এতে সাগরলতার ও সৈকতের মাটির স্থিতিশীলতা তৈরি হয়। সাগরলতার ইংরেজি নাম রেলরোড ভাইন, যার বাংলা শব্দার্থ করলে দাঁড়ায় রেলপথ লতা। আসলেই রেলপথের মতোই যেন এর দৈর্ঘ। একটি সাগরলতা ১শ ফুটেরও বেশি লম্বা হতে পারে।

সাগরলতা নিয়ে কক্সবাজারের দরিয়ানগরে সীমিত আকারে পরীক্ষামূলক গবেষণা করেন বাংলাদেশ সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল হক। তিনি বলেন, সৈকতের পরিবেশ পূনরুদ্ধারে আমরা সাগরলতার বনায়ন ও তা সংরক্ষণের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। যা প্রকৃতি এখন আপন মনে গড়ে নিচ্ছে।

তিনি এর সত্যতা যাচাই করার জন্য সংশ্লিষ্টদেরকে শহরের কলাতলী ও দরিয়ানগর সৈকত পরিদর্শনের আহবান জানিয়ে বলেন, করোনা নিষেধাজ্ঞার সুযোগকে পরিবেশগত পূনর্গঠনে কাজে লাগাতে হবে। সাগরলতা ও বালিয়াড়ি সংরক্ষণ করতে হবে।

কক্সবাজারের বিশিষ্ট পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. আনসারুল করিম বলেন, কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্রের তীর ধরে ২০ থেকে ৩০ ফুট উঁচু পাহাড়ের মতোই বড় বড় বালির ঢিবি ছিল। এসব বালিয়াড়ির প্রধান উদ্ভিদ ছিল সাগরলতা। সাগরলতার গোলাপী-অতিবেগুণী রঙের ফুলে সৈকতে এক অন্য রকমের সৌন্দর্য তৈরি হত। কিন্তু সাগর লতা ও বালিয়াড়ি হারিয়ে যাওয়ায় গত প্রায় ৩ দশকে কক্সবাজার সৈকতের ৫শ মিটারের বেশি ভূমি সাগরে বিলীন হয়ে গেছে।

বালিয়াড়িকে কক্সবাজার অঞ্চলে ডেইল নামে অভিহিত করা হয়। কক্সবাজার উপকূলের কুতুবদিয়া থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত এই ধরনের বহু বালিয়াড়ি দেখা যেত। সমুদ্র তীরের বাসিন্দারা এই ধরনের বালিয়াড়ি ঘিরেই লোকালয় তৈরি করে। আর এ লোকালয়গুলো ‘ডেইলপাড়া’ নামে পরিচিতি পায়। যেমন কুতুবদিয়ার আলী আকবর ডেইল, কক্সবাজার শহরের ফদনার ডেইল, উখিয়া জালিয়াপালং এর ডেইল পাড়া, টেকনাফের মুন্ডার ডেইল ও সেন্টমার্টিনের ডেইলপাড়া অন্যতম।

কক্সবাজার জেলায় এই ধরনের আরো বহু ডেইলকেন্দ্রিক লোকালয় রয়েছে। একসময় কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক থেকে কলাতলী পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ ও অন্তত ৫শ ফুট চওড়া একটি ডেইল ছিল। এই ডেইলের কোন কোন স্থানে উচ্চতা ৩০ ফুটেরও বেশি ছিল। যেখানে থরে থরে ফোটা সাগরলতার ফুল দেখা যেত। আর তা দেখে চোখ জুড়াত পর্যটকদের। কিন্তু এসব বালিয়াড়িকে ঘিরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে সরকারী বেসরকারী নানা স্থাপনা। ফলে এখন আর শহরের কোথাও তেমন একটা সাগরলতা দেখা যায় না। তবে শহরের বাইরে যেখানে কিছু বালিয়াড়ি এখনও অবশিষ্ট রয়েছে, সেখানে সদম্ভে টিকে থেকে সৌন্দর্য্য ছড়াচ্ছে সাগরলতা।

সাগরলতা সৈকতের অন্যান্য প্রাণী; যেমন বিভিন্ন প্রজাতির কাঁকড়া ও পাখির টিকে থাকার জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। সাগরলতার সবুজ পাতা মাটিকে সূর্যের কিরণ থেকে এমনভাবে রক্ষা করে, যাতে সূর্যের তাপ মাটি থেকে অতিরিক্ত পানি বাস্পীভূত করতে না পারে। এতে মাটির নীচের স্তরের উপকারী ব্যাকটেরিয়াসহ অন্যান্য প্রাণীকূলের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। তাই বালিয়াড়ি ও সাগরলতা না থাকলে আরো বহু প্রাণী পরিবেশ থেকে হারিয়ে যাবে বলে মনে করেন ঢাকার ইন্ডিপেন্ডেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ও বিশিষ্ট পরিবেশ বিজ্ঞানী রাগিবউদ্দিন আহমদ।

এ প্রসঙ্গে দেশের বিশিষ্ট ভূতত্ত্ববিদ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের প্রফেসর ড. আশরাফ আলী ছিদ্দিকী বলেন, ভূ-পৃষ্ঠের পাহাড় বা নদীতীরবর্তী বেড রক (খারাপ পাথর) থেকে কোয়ার্টজ কণাগুলি ক্ষয়ে গিয়ে এবং সাগরে অবস্থিত বিভিন্ন ঝিনুক-শামুক জাতীয় প্রাণীর শরীরের ভেঙ্গে যাওয়া কনা থেকে বালু তৈরি হয়।

পাহাড়ী ঢলের সাথে আসা ভূ-পৃষ্ঠের বালি সমুদ্র মোহনায় জমা হয়ে এবং সামুদ্রিক জোয়ারের সাথে প্রাণীকনা সৈকতে জমা হয়ে তীর গঠন করে। আর সেই তীরের স্থিতিশীলতার জন্য যে উদ্ভিদটি সবচেয়ে বেশি কার্যকরী বলে প্রমাণিত হয়েছে, সেটি হল সাগরলতা।