রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়ঙ্কর আল ইয়াকিন বাহিনী

ঢাকা, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২০ | ২৭ চৈত্র ১৪২৬

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়ঙ্কর আল ইয়াকিন বাহিনী

মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন, কক্সবাজার ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২০

print
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়ঙ্কর আল ইয়াকিন বাহিনী

বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা এসেছে ২০১৭ সালে সাত লাখের মতো। এর আগে আরও পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা এদেশে অবস্থান করছিল। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর ঢল শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই বিভিন্ন সংগঠন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। আরএসও, আরাকান আর্মি, আরসা ও আলইয়াকিন নামের অনেক সশস্ত্র গ্রুপের নাম করে আসতে শুরু করে তারা। তখন অভিযোগ ওঠে, শরণার্থীদের সঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নিচ্ছে ওই গ্রুপের সদস্যরা।

তবে এ দলগুলোর বাংলাদেশে তেমন অস্তিত্ব না থাকলেও এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে রাজত্ব কায়েম করছে আলইয়াকিন নামে একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ। এ দলের কারণে প্রায়ই ঘটছে হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের জঘন্য অপরাধ। কিছুদিন আগে যুবলীগ নেতা ওমর ফারুক হত্যার পিছনেও আলইয়াকিন বাহিনী জড়িত বলে অভিযোগ উঠে।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরে অস্ত্রের মহড়া চলছে। অস্ত্রের মহড়ায় যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা হচ্ছেন ক্যাম্পের চেয়ারম্যান। রোহিঙ্গারা ভোটের মাধ্যমে এ চেয়ারম্যানদের নির্বাচিত করেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আবার কিসের নির্বাচন, কিসের চেয়ারম্যান সেটা আমার বুঝে আসে না। সাধারণ রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণ করে চেয়ারম্যানরা, চেয়ারম্যানদের নিয়ন্ত্রণ করে ক্যাম্প ইনচার্জরা আর ক্যাম্প ইনচার্জদের নিয়ন্ত্রণ করে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন। অর্থাৎ মনে হচ্ছে যে, আরআরআরসির কোনো জবাবদিহিতা নেই। এনজিওদের সঙ্গে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের মধুচন্দ্রিমা চলে।

উখিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে আমার বাড়ি। আমার একটাই দাবি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাতে মনে হচ্ছে ভাসানচরে যে পুর্নবাসনের জন্য আবাসনগুলো গড়ে তোলা হয়েছে সেগুলোতে আমাদের নিয়ে যাওয়া হোক। রোহিঙ্গাদের উখিয়া দিয়ে দেওয়া হোক। দিনদিন তারা যেভাবে সংগঠিত হচ্ছে, ক্যাম্প ম্যানেজমেন্ট, এনজিও এবং রোহিঙ্গা এটা থেকে কিভাবে উত্তরণ হবে আমি জানি না। আমরাও এদেশের মানুষ। আমাদের এ আপদ থেকে রক্ষা করুন।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, টেকনাফ-উখিয়ার ৩২টি ক্যাম্পেই রাজত্ব করছে আলইয়াকিন বাহিনীর সদস্যরা। দিনের বেলা সাধারণ রোহিঙ্গার বেশ ধরে থাকলেও সন্ধ্যার পরে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে তারা। প্রতিটি ক্যাম্পে ২০-২৫ জনের ১৬-৩০ বছর বয়সী যুবকদের একটি করে গ্রুপ টহল দিতে থাকে সারাক্ষণ। নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলে খুন করতেও পিছপা হয় না তারা। একইসঙ্গে যেসব রোহিঙ্গার আর্থিক অবস্থা একটু ভালো তাদের অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। চাহিদা মতো টাকা না পেলে অপহরণকারীকে খুন করে গুম করে ফেলা হয়। এখানেই শেষ নয়, মিয়ানমার থেকে নিয়মিত বড় বড় ইয়াবার চালানও আনছে আলইয়াকিনের সদস্যরা। লুট করছে স্থানীয়দের গরু-ছাগল থেকে শুরু করে মূল্যবান সম্পদ।

গত দুই বছরে রোহিঙ্গা শিবিরে নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধে নিহত হয়েছেন ৪৩ জন রোহিঙ্গা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’নিহত হয়েছে ৩২ রোহিঙ্গা। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের প্রবেশের পর ডাকাতি, অপহরণ, ধর্ষণ, চুরি, মাদক ও মানবপাচারসহ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৪৭১টি। স্থানীয়দের দাবি, টেকনাফ-উখিয়ার প্রভাবশালী মহল ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে আলইয়াকিন বাহিনীর। বিভিন্ন উছিলায় পরের জমি দখল করতেও ব্যবহার করা হচ্ছে তাদের। তবে এ ব্যাপারে কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি।

পুলিশ জানায়, গত দুই বছরে টেকনাফ ও উখিয়াতে ৪২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এগুলোর বেশিরভাগের সঙ্গেই আলইয়াকিন বাহিনী জড়িত বলে জানা গেছে। ৪, ৯, ১০, ২৬ ও ২৭ নম্বর ক্যাম্পের বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০১৭ সালে তারা যখন বাংলাদেশে আসে তখন আলইয়াকিন বাহিনীর অস্তিত্ব থাকলেও অতটা তৎপর ছিল না তারা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখন তারা সুসংগঠিত। প্রতিটি ক্যাম্পের পাশে নির্জন এলাকা কিংবা পাহাড়ের চূড়ায় আস্তানা তৈরি হয়েছে তাদের। মূলত ১৬-৩০ বছর বয়সী যুবকদের প্রশিক্ষণের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে। এক মাসের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ শেষে তাকে আবার ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে প্রতি ক্যাম্পেই কমপক্ষে ২৫ জন আলইয়াকিন সদস্যের অবস্থান রয়েছে। দিনের বেলায় নীরব থাকলেও রাতের বেলায় শুরু হয় এদের কার্যক্রম।

গত প্রায় দুই বছরে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে ঘিরে শুধু অভ্যন্তরীণ কোন্দলেই নিহত হয়েছেন অর্ধশত রোহিঙ্গা, আহত হয়েছেন অনেক। গত ৪ ফেব্রুয়ারি নয়াপাড়া ক্যাম্পের কাপড় ব্যবসায়ী নুর নবীর কাছে চাঁদা দাবি করে রোহিঙ্গা ডাকাত জকির ও আমান উল্লাহসহ একদল সশস্ত্র বাহিনী। এ সময় তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। এতে ১৩ জন রোহিঙ্গা গুলিবিদ্ধ হন। আহতদের স্থানীয় নয়াপাড়া গণস্বাস্থ্য ক্লিনিকে ভর্তি করার পর সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ৯ জনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। গেল বছরের ২৪ আগস্ট টেকনাফের জাদিমুরা এলাকায় হ্নীলা ইউনিয়ন যুবলীগের নয় নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি ও জাদিমুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ওমর ফারুককে (২৪) গুলি করে হত্যা করে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা।

এদিকে গত রোববার কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির বিশেষ সভায় ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গাদের নিয়ে আমি অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখি না। এরই মধ্যে যেভাবে ক্রাইমে জড়িয়ে যাচ্ছে। এটি কন্ট্রোল করা না গেলে অবস্থা ভয়াবহ হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এ সংকট মোকাবেলা করতে হবে।

ডিজিএফআইয়ের কর্নেল জিএস আবুজার আল জাহিদ বলেন, বর্তমানে ১২৭৩ জন রোহিঙ্গা কারাগারে আছে। এ কারণে কক্সবাজার কারাগার ধারণ ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। এর ফলে এখান থেকে বান্দরবানেও নিয়ে যেতে হয়। কিন্তু তারপরও ধারণ ক্ষমতার অনেকগুণ বেশি। কারাগারে তাদের জন্য পৃথক স্থান করা দরকার। তাদের যে মামলাগুলো আছে সেগুলো পরিচালনার জন্য পৃথক ট্রাইব্যুন্যাল করার উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে।

তবে পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বেকার থাকার কারণে রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ অপরাধে জড়াচ্ছে। জঙ্গিবাদসহ সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৬৪ জন সন্ত্রাসী, মাদক কারবারি মারা গেছেন।

র‌্যাব ১৫-এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার  আজিম আহমেদ বলেন, এসবের কেন্দ্রে রয়েছে ইয়াবার ব্যবসা ও তার টাকা ভাগাভাগি। এখানে কিছু কিছু ডাকাত গ্রুপ আছে যারা ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। রোহিঙ্গারা ইয়াবার টাকা ভাগাভাগি নিয়েই মারামারি করে এবং আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে।