পিয়াজ কারসাজির ১৬ হোতা শনাক্ত

ঢাকা, রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯ | ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

পিয়াজ কারসাজির ১৬ হোতা শনাক্ত

চট্টগ্রাম ব্যুরো ৯:১৬ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ০৬, ২০১৯

print
পিয়াজ কারসাজির ১৬ হোতা শনাক্ত

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ পাইকারি বাজারে টানা দুই দিনের অভিযানে বেরিয়ে এলো পিয়াজের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির রহস্য। খাতুনগঞ্জে টানা অভিযানের পর এ খাতের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই চক্রের ১৬ জনকে চিহ্নিত করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। তারা চট্টগ্রামে পাইকারি বাজারে তিনগুণ দামে পিয়াজ বিক্রি না করলে ওই দোকানিদের আর পিয়াজ জোগান না দেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছিল।

চক্রের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের টেকনাফ বন্দরকেন্দ্রিক পিয়াজ আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের কমিশন এজেন্ট এবং আড়তদাররা মিয়ানমার থেকে ৪২ টাকা দরে আনা পিয়াজ পাইকারি বাজারে ৯০ থেকে ১১০ টাকা দরে বিক্রি করতে বাধ্য করে আসছিল।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের নেতৃত্বে থাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী পরিচালক (ভূমি) মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, কয়েক দফায় অভিযান পরিচালনার সময় খাতুনগঞ্জের আড়তদাররা জানান টেকনাফভিত্তিক আমদানিকারক ও কমিশন এজেন্টদের কাছে তারা জিম্মি। বাড়তি দামে পিয়াজ বিক্রি না করলে পরবর্তী তাদের আর পিয়াজ দেওয়া হবে না- এই ভয় দেখিয়ে বাজারে দাম অস্বাভাবিক বাড়ানো হয়। খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য ও বিভিন্ন দোকানে থাকা চালানের কাগজ যাচাই করে ১৬ জনের সন্ধান মেলে বলে জানান তিনি। খাতুনগঞ্জে আড়াইশ’ পিয়াজের আড়ত রয়েছে।

তারা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আমদানিকারকদের কাছ থেকে পিয়াজ কমিশন ভিত্তিতে কিনে এনে খাতুনগঞ্জে বিক্রি করে। বাজারে পিয়াজের দাম বাড়ার জন্য আমদানিকারকদের ইন্ধন নিয়ে এর আগে অভিযোগ তুলেছিলেন চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম। গত ১ অক্টোবর খাতুনগঞ্জে অভিযান চলাকালে এবং ১৭ অক্টোবর জেলা প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠকেও খাতুনগঞ্জের আড়তদাররা জানিয়েছিলেন টেকনাফকেন্দ্রিক আমদানিকারক ও কমিশন এজেন্টরা তাদের জিম্মি করে বেঁধে দেওয়া দামে পিয়াজ বিক্রিতে বাধ্য করছে।

পিয়াজের দাম বাজারে লাগামহীন হওয়ার পেছনের এই সিন্ডিকেটে টেকনাফের আমদানিকারক সজিব, মম, জহির ও সাদ্দাম, বিক্রেতা ফোরকান, গফুর, মিন্টু, খালেক ও টিপু, ব্রোকার শফি, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কাদের এবং টেকনাফ কে কে পাড়ার জেসি হাউস ভবনের মেসার্স আলীফ এন্টারপ্রাইজ রয়েছে বলে জানিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

এছাড়াও চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছে খাতুনগঞ্জের মেসার্স আজমীর ভাণ্ডার ও আল্লাহর দান স্টোর, রেয়াজউদ্দিন বাজারের এ হোসেন ব্রাদার্স ও জে এস ট্রেডার্স এবং নুপুর মার্কেটের মেসার্স সৌরভ এন্টারপ্রাইজ। এই সিন্ডিকেটে নাম আসা কক্সবাজারের ১১ আমদানিকারক, বিক্রেতা ও ব্রোকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তাদের নামের একটি তালিকা ইতোমধ্যে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে।

এদিন বাজার পরিদর্শনে এসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়য়ের উপ-সচিব সেলিম হোসেন বলেন, কক্সবাজার ও টেকনাফের তালিকাটি কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে। তারা তালিকা যাচাই করে এর প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেবেন।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তাদের বলেছি, বাড়তি দামে বিক্রি করলেও এই টাকা তারা পাচ্ছেন না, সেটা নিয়ে যাচ্ছে কমিশন এজেন্ট ও অসাধু সিন্ডিকেট। পরিবহন খরচসহ কত দামে পিয়াজ বিক্রি করা যাবে তা নিয়ে একটি প্রস্তাব রাখা হয়েছে জানিয়ে সেলিম হোসেন বলেন, তারা আলোচনা করে রাতের মধ্যে জানাবেন। তা না হলে কাল সকাল থেকে আবার অভিযান শুরু হবে।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলাম বলেন, অভিযান শেষে মিয়ানমার থেকে আনা পিয়াজের আমদানি মূল্য কেজি প্রতি ৪২ টাকার সঙ্গে পরিবহন খরচ, শ্রমিক খরচ, মুনাফা ও বিবিধ খরচ সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে খুচরা ও পাইকারি মূল্য নির্ধারণ করে দেন উপ-সচিব মহোদয়। সে অনুসারে পাইকারি পর্যায়ে মিয়ানমারের পিয়াজ প্রতি কেজি ৫৫-৬০ টাকা দরে এবং খুচরা পর্যায়ে ৬৫-৭০ টাকা দরে বিক্রি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

পিয়াজের দাম ২-৩ দিনেই কমার আশ্বাস : খুচরা পর্যায়ে আগামী দুই-তিনদিনের মধ্যে পিয়াজের দাম ১০০ টাকার নিচে নেমে আসবে বলে জানিয়েছেন দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের আড়তদাররা। পাশাপাশি কাগজ ছাড়া আমদানিকারকদের কাছ থেকে আর পিয়াজ না কেনার অঙ্গীকারও করেছেন তারা। এছাড়া পিয়াজের বাজার তদারকি করতে একটি মনিটরিং টিম গঠনেরও সিদ্ধান্ত হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আড়তদারদের সঙ্গে বৈঠক শেষে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব সেলিম হোসেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলাম এ বৈঠকে অংশ নেন।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী সমিতির নেতা মো. ইদ্রিচ বলেন, ‘২-৩ দিন পরই ক্রেতারা খুচরা পর্যায়ে ১০০ টাকার ভেতরে পিয়াজ কিনতে পারবে। আড়তদাররা যাতে ৮০-৮৫ টাকায় বিক্রি করতে পারে এবং কাগজের মাধ্যমে পিয়াজ কিনতে পারে সেজন্য আমরা আমদানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে উদ্যোগ নেব।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব সেলিম হোসেন বলেন, ভোক্তা পর্যায়ে যেন দাম ১০০ টাকার নিচে থাকে সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক সপ্তাহের মধ্যে এস আলম ও মেঘনা গ্রুপ পিয়াজ নিয়ে আসবে। সংকট আর থাকবে না। এসব পিয়াজ আসলে ৬০-৭০ টাকায় হয়তো নেমে আসবে।

তিনি বলেন, দেশে পিয়াজের কোনো মজুদ সংকট নেই। পণ্যটির দাম আর বাড়বে না। কক্সবাজার, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, সাতক্ষীরা, ঢাকাসহ যেসব স্থানে পিয়াজ আমদানি হয় সেখানকার জেলা প্রশাসন কাজ করছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ মনিটরিং টিমও কাজ করছে।

সভায় ব্যবসায়ীরা জানান, আমদানিকারকের সঙ্গে আড়তদারদের পরিচয় নেই। মূলত ফড়িয়া বা এজেন্টের মাধ্যমেই তারা পিয়াজ কেনেন। আমদানিকারক ও এজেন্টদের বেঁধে দেওয়া বেশি দরে পিয়াজ কিনতে ও বিক্রি করতে তারা বাধ্য হচ্ছেন।

সভায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলাম বলেন, মিয়ানমার থেকে ৩০ হাজার টন পিয়াজ আমদানি হয়েছে বলে ধারণা করছি। ৪২ টাকায় কিনে যদি ৯৫ টাকায় বিক্রি করে তাহলে কেজিতে ৫৩ টাকা বেশি। শুধু আমদানিকারকরাই এভাবে ১৫৯ কোটি নিয়ে যাচ্ছে। এরপর খুচরায় আসতে আসতে এ অংক প্রায় ২১০ কোটি টাকা।