চট্টগ্রামে ঘোষণা-বহির্ভূত পণ্য খালাসে জালিয়াতি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯ | ৮ কার্তিক ১৪২৬

চট্টগ্রামে ঘোষণা-বহির্ভূত পণ্য খালাসে জালিয়াতি

চট্টগ্রাম ব্যুরো ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৯

print
চট্টগ্রামে ঘোষণা-বহির্ভূত পণ্য খালাসে জালিয়াতি

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কড়াকড়ির কারণে আটকেপড়া ঘোষণা-বহির্ভূত পণ্য চালান খালাস নিতে জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছে আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি কাস্টমসের রাসায়নিক পরীক্ষার সনদে কেমিস্টের স্বাক্ষর সিল জালিয়াতি করে পরীক্ষার ভুয়া প্রতিবেদন জমা দিয়ে পণ্য খালাসের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তবে এসব জালিয়াতির সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা।

গত কয়েক মাসের পণ্য চালানের আটকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত গার্মেন্টগুলো ঘোষণা-বহির্ভূত পণ্য নিয়ে আসছে। বিভিন্ন মাধ্যমে চেষ্টা-তদবির করে এসব পণ্য বন্দর থেকে খালাস নিতে না পেরে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট রাসায়নিক পরীক্ষার সনদ পরিবর্তন করে সংশ্লিষ্ট শাখায় সরবরাহ করে চালানগুলো খালাসের পরিবেশ তৈরি করে। এরকম ছয়টি পণ্যের রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদনে এমন জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। ওই চালানগুলোতে কম শুল্ক দিয়ে পণ্য চালানের খালাস নিতে চেয়েছিল অভিযুক্তরা। পরীক্ষার প্রতিবেদন কাস্টমস কর্মকর্তাদের সন্দেহ হওয়ায় ওই প্রতিবেদন রাসায়নিক পরীক্ষাগারে সংরক্ষিত প্রতিবেদনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার পর জালিয়াতির প্রমাণ মেলে।

কাস্টমস হাউসের একটি সূত্র জানায়, কাস্টম রাসায়নিক পরীক্ষাগারের ছয়টি প্রতিবেদন জালিয়াতির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট গ্রুপে জমা দেন অভিযুক্তরা। এর মধ্যে চলতি বছরের জুন মাসে একটি এবং জুলাই মাসে পাঁচটি প্রতিবেদন জালিয়াতি করে আমদানিকারক এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা। পাঁচটি বিল অফ এন্ট্রিতে এসব জালিয়াতির আশ্রয় নেন তারা। বন্দরে আটক এসব কনসাইনমেন্টে (চালান) বন্ড সুবিধায় আনা তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য আমদানিকৃত বিভিন্ন রকমের কাপড় ছিল। এরকম কয়েকটি চালান খালাস নেওয়ার চেষ্টার সময় প্রতারণার বিষয়টি নজরে আসে কাস্টমস কর্মকর্তাদের। এ অবস্থায় গত এক বছরে কাস্টমস হাউসের রাসায়নিক পরীক্ষাগার থেকে কী পরিমাণ সনদ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো পণ্যের সংশ্লিষ্ট গ্রুপের সঙ্গে পুনরায় মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

সূত্রটি আরও জানায়, নিয়ম অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পৌঁছার পর আমদানিকারকের পক্ষে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। কাস্টমস কর্তৃপক্ষের পণ্য চালান নিয়ে সন্দেহ হলে এআইআর (অডিট ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসার্চ ইউনিট) সেসব চালান লক করে। এরপর কাস্টমস পণ্যের নমুনা করে পরে সেটা পরীক্ষার জন্য রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠায়। সে অনুযায়ী আটককৃত সেসব পণ্যের নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। পরে পরীক্ষাগারের কেমিস্ট আবদুল হান্নান স্বাক্ষরিত প্রতিবেদন প্রদান করা হয়। কিন্তু চলতি বছরের ২৩ জুন একটি রাসায়নিক পরীক্ষার সনদ জালিয়াতির ঘটনাটি ধরা পড়ে।

পরীক্ষায় দেখা যায়, পরীক্ষাগারের কেমিস্ট যে প্রতিবেদন দেন, সেটি সংশ্লিষ্ট আমদানি শাখায় না দিয়ে স্বাক্ষর সিল জাল করে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট তাদের পক্ষে ভুয়া প্রতিবেদন দাখিল করেছে। কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওই প্রতিবেদন নিয়ে সন্দেহ হওয়ায় পুনরায় রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হলে ধরা পড়ে জালিয়াতির বিষয়টি। এরপর জুলাই মাসের ১, ২ ও ৮ তারিখে আরও পাঁচটি রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পরিবর্তনের ঘটনা ধরা পড়ে। সেখানে দেখা যায় কেমিস্টের স্বাক্ষর সিল জালিয়াতি করে ভুয়া প্রতিবেদন জমা দেয় সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট।

জালিয়াতিতে জড়িত যেসব আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট : রাসায়নিক পরীক্ষাগারের সনদ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত আমদানিকারক এএমএইচ অ্যাপারেলস লিমিটেড ও নাছরিন জামান কিন্টওয়্যারস লিমিটেড। তাদের পক্ষে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট হিসেবে কাজ করে এসএ চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি, এইচএ ইন্টারন্যাশনাল ও তানিয়া কার্গো সার্ভিস। কাস্টমস রাসায়নিক পরীক্ষাগারের পরীক্ষক আবদুল হান্নান বলেন, আমার স্বাক্ষর এবং সিল জালিয়াতি করে অভিযুক্তরা পণ্য খালাসের চেষ্টা করেছেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নজরে আসে। প্রতিবেদন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের দেওয়া হলেও এর কপি পরীক্ষাগারের কম্পিউটারে রাখা থাকে। এ ধরনের প্রতারণা প্রতিরোধে অনলাইনের সংশ্লিষ্ট শাখায় প্রতিবেদন দেওয়া হচ্ছে। ফলে পরবর্তীতে এ ধরনের জালিয়াতির সুযোগ থাকছে না।

এদিকে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম বলেন, ‘জালিয়াতির মাধ্যমে রাসায়নিক পরীক্ষার সনদ পরিবর্তন করার ঘটনায় আর কোনো প্রতিষ্ঠান জড়িত আছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখতে গত এক বছরে যে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট শাখার মাধ্যমে নিরীক্ষা করা হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনায় যেসব প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকবে তাদের বিরুদ্ধে কাস্টম আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।