নেপথ্যে রাজনৈতিক ছত্রছায়া

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯ | ৭ কার্তিক ১৪২৬

নেপথ্যে রাজনৈতিক ছত্রছায়া

আহসান হাবিব, চট্টগ্রাম ১০:১০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৯

print
নেপথ্যে রাজনৈতিক ছত্রছায়া

চট্টগ্রাম মহানগরীতে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং। আধিপত্য বিস্তার ও তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দখলবাজি, চাঁদাবাজি, খুনসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে এসব কিশোর অপরাধী। ইয়াবা ও ফেনসিডিল সেবনের পাশাপাশি নানা মাদকদ্রব্য বেচা-কেনায়ও জড়িয়ে পড়ছে তারা। কিশোর অপরাধীদের হাতে গত আট মাসে খুন হয়েছে ছয়জন।

এছাড়া গত দেড় বছরে কিশোর অপরাধের কারণে নগরের বিভিন্ন থানায় ২৫টির বেশি মামলা হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী গ্রেফতার অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন সিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

অন্যদিকে চট্টগ্রামে কিশোর অপরাধের নানামুখী অপরাধমূলক কার্যক্রম ভাবিয়ে তুলেছে চট্টগ্রামের সচেতন মহলকে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পারিবারিক, সামাজিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুশাসন বাড়াতে হবে। মোবাইল ও ইন্টারনেট এখন সহজলভ্য হওয়ায় অপব্যবহার বেশি হচ্ছে এসব উঠতি বয়সীর মধ্যে। এ কারণে কিশোর অপরাধ বাড়ছে। তাই কিশোরদের মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রতি অভিভাবকদের নজর রাখা উচিত। এছাড়া রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের ছত্রছায়ায় এসব তরুণ-কিশোরকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের আইনের আওতায় আনতে পারলে কিশোর অপরাধ অনেকাংশে কমে আসবে বলে মনে করেন তারা।

সমাজবিজ্ঞানী ও চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. অনুপম সেন খোলা কাগজকে বলেন, ছেলেরা স্কুল-কলেজে ঠিকমতো যাচ্ছে কিনা, স্কুল ছুটির পর তারা কোথায় যাচ্ছে, তা অভিভাবকদের নজরে রাখতে হবে। তা না হলে কিশোর ছেলেটা অসৎ লোকদের সংস্পর্শে খারাপ হয়ে যাবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি, চট্টগ্রামের সভাপতি অ্যাডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী বলেন, একশ্রেণির দুষ্ট ‘বড়ভাই’য়ের উৎসাহে স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোররা অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। প্রায়ই দেখা যায়, অপরাধের কারণে কিশোরের শাস্তি হলেও পর্দার আড়ালে থাকা সেই দুষ্ট বড়ভাইরা সহজে আইনের আওতায় আসে না। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও সতর্ক থাকতে হবে। কিশোর অপরাধীদের পাশাপাশি পর্দার আড়ালে থাকা বড়ভাইদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), চট্টগ্রাম জেলা সভাপতি ও ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মুহম্মদ সিকান্দার খান বলেন, এখন অপরাধ করার জন্য যা প্রয়োজন, তা সহজেই কিশোররা পেয়ে যাচ্ছে। একশ্রেণির লোক কিশোরদের অপরাধে সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম সরবরাহ করছে। তা দিয়ে কিশোররা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বয়সে যারা কিশোর তাদের সব সময় ভিন্ন কিছুর দিকে মনোযোগ থাকে বেশি। এ জন্য অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে।

অভিযোগ আছে, নগরীর সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্কুল ও পাড়ায়-মহল্লায় কিশোর ও বখাটে গ্যাং বানিয়ে বিভিন্ন অপকর্ম করছে। শুধু নিজেদের মধ্যে হানাহানি নয়, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করেও সদলবলে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হাজির হয় কিশোর সন্ত্রাসীরা। এদের দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে খুনের ঘটনাও। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে কিংবা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনুচর হিসেবে কাজ করছে অনেক কিশোর। নগরীর অলি-গলিতে চাঁদাবাজি, দখলবাজি থেকে শুরু করে ছিনতাই-রাহাজানির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছে এরা। অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরের মধ্যে দরিদ্র পরিবারের সন্তান যেমন আছে, তেমনি মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানও আছে। রাজনৈতিক সমর্থন, বিপুল অর্থপ্রাপ্তি, এলাকায় প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে এসব কিশোর গ্যাং গ্রুপের উত্থান।

আশঙ্কার বিষয় হলো, রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের ছত্রছায়ায় এসব তরুণ-কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি নগরীর জামালখানে কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র আদনান ইসপারকে প্রকাশ্যে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। এ খুনের জন্য সাব্বির নামে এক কিশোরকে দায়ী করা হয়। এ ঘটনায় ফটিকছড়ি থেকে নগর আওয়ামী লীগের এক নেতার বাড়ি থেকে সাব্বিরসহ পাঁচ কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়।

সিএমপির কর্মকর্তারা বলছেন, গত দেড় বছরে কিশোর অপরাধের ঘটনায় নগরীর ১৬টি থানায় অন্তত ২৫টি মামলা হয়েছে। মারামারি, খুনসহ বিভিন্ন অভিযোগে এসব মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৫০ জনের বেশি কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ-সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম ও অপারেশন) আমেনা বেগম বলেন, কিশোর অপরাধ দমনে অপরাধীদের নামের তালিকা প্রণয়ন করেছে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ। তালিকা অনুযায়ী অপরাধীদের ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে। ইতোমধ্যে তালিকাভুক্ত কয়েকজন কিশোর অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সিএমপির প্রতিটি থানায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এখন থেকে সন্ধ্যার পর কিশোর বা শিক্ষার্থীরা বাইরে আড্ডা দিলে তাদের গ্রেফতার করা হবে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত এক দশকে চট্টগ্রাম শহরের জামালখানসহ বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অসংখ্য কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান ও এদের বেপরোয়া কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে কাজেম আলী স্কুল মার্কেটের মামার দোকানে জিলহস গ্রুপ, জামাল খান আংকেলের দোকান ও দেবপাহাড়ে রনি, সাফায়েত ও ফাহিম গ্রুপ, জামালখানে সাব্বিরের আরও একটি গ্রুপ, মেজ্জান হাইলে আইয়্যুন রেস্তোরাঁর কাছে খালার দোকানভিত্তিক আলাদা কিশোর গ্যাং বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাদের বিচরণ আন্দরকিল্লা মোড় থেকে রহমতগঞ্জ হয়ে গণি বেকারি সীমানাও ছাড়িয়ে গেছে। অধিকাংশ কিশোর অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রক এলাকায় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় পুলিশ এসব চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এসব কিশোর এবং সদ্য কৈশোর পার করা তরুণরা রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মসূচিতেও সক্রিয়।

পুলিশের তথ্য মতে, নগরীতে অন্তত ১৫টি কিশোর গ্যাং আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। যারা নগরীর স্টেশন রোড, বিআরটিসি মোড়, কদমতলী, চকবাজার, মেডিকেল হোস্টেল, শিল্পকলা একাডেমি, সিআরবি, খুলশী, ফয়’স লেক, ডেবারপাড়, চান্দগাঁও শমসেরপাড়া, ফরিদেরপাড়া, আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনি, সিডিএ, ছোটপুল, হালিশহর, বন্দর কলোনি ও পতেঙ্গার বেশ কয়েকটি এলাকায় আদিপত্য বেশি। মাদক বেচাকেনাসহ মোটরসাইকেল ও সাইকেল ছিনতাই, গান-বাজনা, খেলার মাঠ, ড্যান্স ও ডিজে পার্টি, ক্লাবের আড্ডাসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ন্ত্রণে তারা মরিয়া। শুধু তাই নয়, এসব কিশোর গ্যাং মেয়েদের ভ্যানিটি ব্যাগ ও মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের বেশিরভাগ ঘটনায় জড়িত।

নিজ এলাকা ছাড়িয়ে অনেক সময় তারা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে নানা অপরাধমূলক কর্মকা- চালায়। এ রকম নগরীর ১৬ থানা এলাকায় প্রায় অর্ধশত কিশোর গ্যাংচক্রের তথ্য রয়েছে পুলিশের হাতে। এ অবস্থায় চট্টগ্রাম নগরীতে কিশোর অপরাধীদের সন্ধানে নেমেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব)।

র‌্যাব-৭ এর সহকারী পরিচালক এএসপি মাশকুর রহমান খোলা কাগজকে বলেন, সদর দফতরের নির্দেশে আমরা কিশোর অপরাধী চক্রের তালিকা করতে শুরু করেছি। মূলত নগরীর যেসব স্পটে কিশোর-তরুণদের আনাগোনা বেশি থাকে এবং অপরাধ সংঘটিত হয়, সেসব স্পটকে নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চিহ্নিত করছি। নগরীর ১৬ থানা এবং জেলার ১৬ থানা এলাকা থেকেই গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

সর্বশেষ গত ১৮ জুলাই রাতে দক্ষিণ কাট্টলী এলাকায় কিশোর অপরাধীদের নিজেদের মধ্যে কোন্দলের জেরে খুন হয় এক কিশোর। গত দুই মাসে এ ধরনের আরও বেশ কয়েকটি ঘটনার পর নগরীতে ‘কিশোর গ্যাং’ আবারও আলোচনায় আসে। এর আগে গত ৬ এপ্রিল এক স্কুলছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার জেরে কিশোরদের দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।

এ দ্বন্দ্বের জেরে নগরীর গোলপাহাড় এলাকার যুবলীগ কর্মী এমএইচ লোকমান রনি নিহত হন স্থানীয় সন্ত্রাসী সাইফুল ইসলামের গুলিতে। এর দুদিন পর পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় সাইফুল। গত ১০ মে নগরীর পাঁচলাইশ থানার মুরাদপুর পিলখানা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের হাতে ছুরিকাঘাতে খুন হন মোস্তাক আহমেদ (৩৫)। ছেলের সঙ্গে বখাটে কিশোরদের ঝগড়া মেটাতে গেলে ছুরিকাঘাত করে তাকে হত্যা করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা।

এছাড়া গত ১৪ মে নগরী ডবলমুরিং থানার হাজিপাড়ায় রিকশাচালক রাজু আহমেদকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেয় ১০-১২ জন কিশোর। তাদের ‘বড়ভাই’ ছগির হোসেন জেল থেকে নির্দেশ দেন মফিজ নামের একজনকে খুন করার জন্য। কিন্তু টার্গেট মিস করে কিশোররা রাজুকে খুন করে ফেলে। পুলিশ পরে ওই গ্রুপের আট সদস্যকে গ্রেফতার করে, এদের সবার বয়স ১৮ বছরের মধ্যে। ১৪ এপ্রিল ইয়াবা সেবনের টাকা না পেয়ে বাবা রঞ্জন বড়ুয়াকে ছুরিকাঘাতে খুন করে তার ছেলে রবিন বড়ুয়া। কোতোয়ালি থানাধীন কাজির দেউড়ীর ব্যাটারি গলিতে এ ঘটনা ঘটে। বাবার ঘাতক এই কিশোরের বয়সও ১৮ বছরের নিচে।

২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর সদরঘাট থানার দক্ষিণ নালাপাড়ার বাসার সামনে খুন হন নগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাস। এ ঘটনায় জড়িত ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে তিনজন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। জড়িতদের অধিকাংশই কিশোর।

চট্টগ্রামে দিন দিন কিশোর অপরাধী গ্রুপ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠায় উদ্বিগ্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়া স্কুল-কলেজপড়ুয়া এসব কিশোরের বেশিরভাগই অপেক্ষাকৃত বিত্তশালী ঘরের বখে যাওয়া সন্তান।