কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় বিলীনের পথে মাতারবাড়ীর জেলে পল্লী

ঢাকা, সোমবার, ৩ অক্টোবর ২০২২ | ১৮ আশ্বিন ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় বিলীনের পথে মাতারবাড়ীর জেলে পল্লী

কাইছারুল ইসলাম, মহেশখালী (কক্সবাজার)
🕐 ৮:০৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৩, ২০২২

কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় বিলীনের পথে মাতারবাড়ীর জেলে পল্লী

বাপরে আমার ঘরসহ ঘরের সকল মালামাল পানির নিচে তলিয়ে গেছে, কোন কিছুই রাখতে পারি নাই। কোন রকমে জীবন নিয়ে বেঁচে আছি, পড়নের এই কাপড়গুলা ছাড়া আমার আর কোন কিছুই নাই। এখন বউ-বাচ্চা নিয়া কোথায় যাবো, কোথায় থাকবো, একমাত্র আল্লাই ভালো জানেন।” কান্না জড়িত কন্ঠে সমুদ্রের পাড়ে বসে এই কথাগুলো বলছিলেন মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী জেলপ পল্লীর জোয়ারের পানিতে সবকিছু হারানো ৭০ বছরের বৃদ্ধ নুরুল আমিন মাঝি।

নুরুল আমিনের মতো শত শত বৃদ্ধের একই কথা।তারা এখন বসবাস করছে খোলা আকাশের নিচে,অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয়ের বাড়িতে,অনেকে আবার ভাড়া বাড়িতে। জোয়ারের পানিতে সহায় সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব এখন অর্ধশতাধিক পরিবার,তাদের পাশে নেই কেউ।

মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। এই দ্বীপের জালিয়া পাড়া এলাকায় খেটে খাওয়া জেলেদের বসবাস। সমুদ্রের সাথে যুদ্ধ করে প্রতিটি রাত কাটে তাদের। জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেড়ে গেলেই রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। শুরু হয় অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ। এ যুদ্ধ যেন তাদের নিত্য দিনের সঙ্গী। জোয়ারের পানি থেকে রক্ষায় সরকার স্থায়ী কোন পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে তাদের যুদ্ধের শেষ হচ্ছেনা বলে জানান স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের দাবি পানি উন্নয়ন বোর্ড কতৃক অস্থায়ী জিও ব্যাগ বসানো হলেও তাতে কোন কাজ দিচ্ছে না।যেখানে জিও ব্যাগ বসানো হয়, সেখান থেকে বালি উত্তোলন করার কারণে জিও ব্যাগ গুলো সহজেই বিলীন হয়ে যায়। নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় না রেখে বালি উত্তোলন করার কারণে আজ এই গ্রাম বিলীনের পথে। একসময় অনেক বড় চর থাকলেও বালি উত্তোলনের কারণে তা এখন বিলুপ্ত হয়েছে বলে দাবি করেন তারা।

শনিবার (১৩ আগস্ট) সরেজমিনে দেখা যায়,অনেক পরিবার সাগরের করাল গ্রাসে ভাঙনের কবলে পড়ে সবকিছু হারিয়ে সর্বশান্ত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। অনেকে বাঁশ-গাছ নিয়ে ব্যস্ত শেষ আশ্রয়স্থলটুকু রক্ষায়,অনেকে মলিন মুখে চেয়ে আছে সমুদ্রের পানে, অনেকে তাদের জিনিসপত্র অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে ব্যস্ত সময় পার করছে। জালিয়া পাড়া গ্রামের সিরাজ, মোস্তাক, কাদের, জালাল, রিদুয়ান, আক্তার, আলতাফ উদ্দিন, খোকনের পরিবারগুলো বাড়িঘর হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে অনেকে।

জোয়ারের পানি থেকে রক্ষার কোন উপায় না থাকায় চরম আতংক বিরাজ করছে ওই এলাকার বাসিন্দাদের মাঝে। বাড়িঘর ছেড়ে অনেকে অন্যত্র চলে যাচ্ছে পরিবার পরিজন নিয়ে। জরুরী ভিত্তিতে ভাঙনরোধকল্পে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে গ্রামটি সাগরে বিলীন হয়ে মাতারবাড়ী ইউনিয়নের মানচিত্র পাল্টে যাওয়ার আশঙ্কা করছে এলাকাবাসি।

ওই এলাকার সোনা মিয়া জানান, বসতভিটাটুকুই তার শেষ সম্বল। সেটিও সাগরে বিলীনের পথে। এমন অবস্থায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন তিনি ও তার পরিবার। বসতঘরটি অন্য জায়গায় সরিয়ে নেয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা নেই তার। ঘরটি নদীতে বিলীন হয়ে গেলে সপরিবার খোলা আকাশের নিচে তাকে থাকতে হবে।

ওই গ্রামের বিধবা রোববান বেগম জানান, তার ঘরের মাঝ বরাবর দেখা দিয়েছে ফাটল। যেকোনো সময় ঘরটি বিলীন হয়ে যেতে পারে। পরিবারের লোকজন মিলেই বসতঘরটি ভেঙে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

তিনি আরো বলেন, এমন কষ্টের সময়েও কোন খবর রাখেনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি।ভোটের আগে কতজনে কথা দেয়,ভোট চলে গেলে আর চোখেও পড়েনা বলে দাবি করেন তিনি।

মাতারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম আবু হায়দার খোলা কাগজকে জানান, জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলে পাড়ায় ইতোমধ্যে ৪০/৫০ পরিবার তলিয়ে গেছে । আমি বিষয়টি এমপি মহোদয় এবং ইউ এন ও মহোদয়কে অবগত করেছি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার গুলোকে পূনর্বাসনের জন্য দাবি জানিয়েছি।

চর থেকে বালি উত্তোলন করে জিও ব্যাগ দেওয়ার কারণে যেহেতু জিওব্যাগ গুলো টেকসই হচ্ছে না, আমি বাহির থেকে বালি এনে জিওব্যাগ লাগানোর দাবি জানিয়েছি। ইতোমধ্যে উর্ধতন কতৃপক্ষ বিষয়টি আমলে নিয়েছেন। তাঁরা অতিশীঘ্রই জিওব্যাগ লাগানো হবে বলে জানিয়েছেন এবং পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে ব্লক বসানো হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন।

তিনি আরো বলেন, বেড়িবাঁধের বাহিরে যাদের বাড়ি রয়েছে সরকার ইতোমধ্যে তাদের পূনর্বাসনের জন্য জায়গা বরাদ্দ করেছে এবং তাদেরকে সেখানে স্থানান্তর করা হবে।

এ বিষয়ে জানতে মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইয়াছিন শিমুলের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তিনি ফোন রিছিব না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

 
Electronic Paper