প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ২৯ কার্তিক ১৪২৫

প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব

নিজস্ব প্রতিবেদক ৭:০৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০১৮

print
প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব

চারদিকে ঢাকের বাজনার সঙ্গে নাচছিলেন হাজারো মানুষ। কেউ কেউ দেবীর উদ্দেশে দিচ্ছিলেন উলুধ্বনি। আবার কেউ কেউ মায়ের বিসর্জনে অশ্রুসিক্ত। এমন উৎসবমুখর পরিবেশে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। এই বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হলো হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় আয়োজন শারদীয় দুর্গোৎসব।

শুক্রবার বিকেল চারটা থেকে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ওয়াইজঘাটের বিনা স্মৃতি স্নানঘাটে ঢাকা মহানগর পূজা কমিটির নেতৃত্বে প্রতিমা বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। বিজয়া দশমীর সকালে মণ্ডপে মণ্ডপে সিঁদুর খেলার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার দর্পণ বিসর্জন দেওয়া হয়। হিন্দু নারীরা দেবীর প্রতিমায় সিঁদুর পরিয়ে দিয়ে নিজেরাও একে অন্যকে সিঁদুর পরান। এরপরই বেজে ওঠে বিষাদের সুর।

বিসর্জনের উদ্দেশ্যে ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানে করে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দিও মেলাঙ্গন থেকে কেন্দ্রীয় বিজয়া শোভাযাত্রা বের হয়ে প্রতিমা পলাশীর মোড়ে আসে। কেন্দ্রীয় বিজয়া শোভাযাত্রায় যোগ দিতে ঢাকার বিভিন্ন মন্দির ও পূজামণ্ডপ থেকে শোভাযাত্রাগুলো পলাশী মোড়ে এসে জড়ো হয়। এরপর গান-ঢাকের তালে তালে নাচতে থাকেন সবাই। বেলা তিনটায় শোভাযাত্রা সদরঘাটের উদ্দেশে রওনা হয়। সেখান থেকে প্রতিমা নিয়ে ট্রাকে করে ঢাকের তালের পাশাপাশি ‘দুর্গা মা-ই কি, জয়’ স্লোগান দিতে দিতে ঘাটের দিকে এগিয়ে যান বিভিন্ন বয়সী মানুষ।

প্রতিমা বহনকারী ট্রাকগুলো বিকেল চারটার মধ্যেই সদরঘাটে এসে জমা হয়। এরপর ট্রাক থেকে একে একে ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয় প্রতিমা। প্রতিমা বিসর্জনের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী চারদিকে জল ছিটিয়ে এবং আরও কিছু নিয়ম মেনে কাঁধে করে প্রতিমা নৌকায় তোলা হয়। নৌকায় করে প্রতিমা মাঝ নদীতে নিয়ে গিয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়। বিসর্জনের সময় ঘাটে দাঁড়ানো হাজারো ভক্ত দেবী দুর্গার উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে নানা ধ্বনি দিতে থাকেন।

প্রতিমা বিসর্জনের বিষয়ে আজিমপুর সার্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপন পরিষদের পুরোহিত শিবু ভট্টাচার্য বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতি শরতে স্বর্গলোক কৈলাস ছেড়ে কন্যারূপে পৃথিবীতে আসেন। লক্ষ্মী, কার্তিক, সরস্বতী আর গণেশ এই চার সন্তানকে নিয়ে নির্দিষ্ট তিথি পর্যন্ত বাবারবাড়িতে অবস্থানের পর আবার ফিরে যান দেবালয়ে। দেবীর অবস্থানকালে এই পাঁচদিন পৃথিবীর ভক্তরা ‘দেবী মা’-এর বন্দনা করেন।

এ বিষয়ে আজিমপুর থেকে আগত পূজারী নারায়ণ সেনগুপ্ত জানান, আমরা এবার সাত্বিক পূজা করেছি। যে কারণে কোনো ধরনের মাদকের কোনো ছোঁয়া ছিল না পূজায়। ওই পূজা যারা করে তারা হলো তামসিক পূজা করে। সেখানে সব নারীকে মা ও বোনের চোখে দেখা হয় না। কিন্তু সাত্বিক পূজার ক্ষেত্রে এই যে এখানে যেসব নারীরা গান বা ঢাকের তালে নাচছে তাদের আমরা মা ও বোনের চোখে দেখি। এ কারণে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা নেই। আর আমি আগামী নির্বাচন যেনো সুষ্ঠু হয় সে প্রার্থনা বিশেষভাবে করেছি। তাছাড়া এই ধরনের পূজায় নিজস্ব বলে কোনো বিষয় নেই।

বিসর্জন যাত্রায় খিলক্ষেত থেকে আগত কলেজ ছাত্রী মায়া রানী জানায়, মা চলে যাচ্ছেন এটা যেমন আনন্দের বিষয় তেমনি কষ্টেরও। আনন্দের কারণ মা'র কারণে অনেক আশির্বাদ পেয়েছি নিজের ও সবার জন্য। আর মা দুর্গা চলে যাওয়ার মাধ্যমে ত্যাগের শিক্ষায় শিক্ষিত করে দিয়ে গেছেন আমাদেরকে। তাই আমরা হাসিমুখে আনন্দযাত্রার মাধ্যমে মাকে বিদায় দিচ্ছি।

প্রতিমা বিসর্জনের কেন্দ্রীয় শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেন ঢাকা মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদ। পূজা উদযাপন কমিটির নেতারা জানান, দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে মূলত সকালেই দেবীর শাস্ত্রীয় বিসর্জন সম্পন্ন হয়। বিকেলে শুধু আনুষ্ঠানিক শোভাযাত্রা সহকাওে দেবী দুর্গা ও অন্যান্য দেব-দেবীর বিসর্জন দেয়া হয়।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্যমতে, এবার সারাদেশে ৩১ হাজার ২৭২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৬ হাজার ৮০৪টি, চট্টগ্রামে ৪ হাজার ৫০৬টি, সিলেটে ২ হাজার ৩৪১টি, খুলনায় ৪ হাজার ৮৮৩টি, রাজশাহীতে ৩ হাজার ৫৪২টি, রংপুরে ৫ হাজার ৩৭১টি, বরিশালে ১ হাজার ৭২৪টি ও ময়মনসিংহ বিভাগে ২ হাজার ১০১টি। আর রাজধানী ঢাকায় এবার পূজা হয়েছে ২৩৪টি মণ্ডপে। গত বছর সারা দেশে ২৯ হাজার ৭৪টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং রাজধানীতে মণ্ডপের সংখ্যা ছিল ২২৫টি।

ঢাকা মহানগরীর ২৩৪টি মণ্ডপের মধ্যে ৯টি ছিল সবচেয়ে বড় মণ্ডপ। এগুলো হলো- ঢাকেশ্বরী মন্দির, রামকৃষ্ণ মঠ, কলাবাগান পূজামণ্ডপ, বনানীর মণ্ডপ, সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির, রমনা কালীমন্দির, উত্তরা সার্বজনীন পূজামণ্ডপ, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট সনাতন সমাজকল্যাণ সংঘ ও বসুন্ধরা সার্বজনীন পূজামণ্ডপ।