অপরাধ বাড়ছে হাতিরঝিলে

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২ মার্চ ২০২১ | ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭

অপরাধ বাড়ছে হাতিরঝিলে

কে এম জাহেদ ১০:০৫ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৬, ২০২১

print
অপরাধ বাড়ছে হাতিরঝিলে

অবসর সময় কাটাতে বর্তমান সময়ে রাজধানীর সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন জায়গা হচ্ছে হাতিরঝিল। পরিবেশ ও নান্দনিকতায় খুব সহজেই যা নগরবাসীর মনে জায়গা করে নিয়েছে। পাশাপাশি অনিয়ম আর অপরাধ বেড়েই চলছে। পাঁচ থানার মিলনস্থল হাতিরঝিলে দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে উঠছে অপরাধচক্র। মাদক বাণিজ্য, দেহবাণিজ্যসহ নানামুখী অপরাধ এখন ওপেন সিক্রেট। ফলে এখানে ঘুরতে আসা লোকজন নিজেদের অনিরাপদবোধ করছেন। হাতিরঝিলে গভীর রাত পর্যন্ত বেপরোয়া মোটরসাইকেল রেসিংয়ে মগ্ন থাকে কিশোর ও তরুণ গ্যাং। চলে কার রেসিংও। এখানে গাড়িতে বসে নারীদের উত্ত্যক্ত করে বখাটেরা। 

এছাড়া গত বৃহস্পতিবার অজ্ঞাত এক যুবকের লাশ উদ্ধার এবং পৃথক অভিযানে নতুন আইস মাদক, হেরোইন ও ইয়াবা ট্যাবলেটসহ চার মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে এখান থেকে লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। স্থানীয়দের দাবি, হত্যার পর লাশ সরাতে হাতিরঝিল এলাকাকে নিরাপদ আশ্রয় মনে করছে অপরাধীরা। নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি সিসি ক্যামেরা বৃদ্ধি করা গেলে কমে আসবে অপরাধ মনে করছেন তারা। গতকাল শুক্রবার অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারের বিষয়ে হাতিরঝিল থানার পরিদর্শক অপারেশন মোহাম্মদ গোলাম আযম বলেন, এলাকাবাসীর কাছ থেকে খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার রাতে বেগুনবাড়ি সেতুর পূর্ব পাশে জলাশয় থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয়। আনুমানিক ২২ বছর বয়সী ওই যুবকের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। পরনে ট্রাউজার ছিল। নিহত যুবকের হাত-পা বাঁধা ছিল বলে জানান তিনি।

তিনি আরও জানান, শুক্রবার হাতিরপুল ও হাতিরঝিল মহানগর প্রজেক্ট এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে নতুন আইস মাদক, হেরোইন ও ইয়াবাসহ চার মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হাতিরঝিলে এমন লাশ পাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও কয়েকবার হাতিরঝিলের বিভিন্ন স্থান থেকে লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তারা জানান, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো হাতিরঝিল এলাকা নীরব হয়ে যায়। এ সুযোগেই অপরাধীরা অপরাধ সংঘটিত করে পালিয়ে যায়। যদিও রাত কিংবা দিনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তা টহল থাকলেও সুযোগ বুঝে এসব অপরাধ করছে অপরাধীরা। এলাকাবাসীর দাবি, হাতিরঝিলজুড়ে নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি সিসি ক্যামেরা বৃদ্ধি করা গেলে কমে আসবে অপরাধ।

সূত্রে জানা গেছে, সন্ধ্যার পর থেকে হাতিরঝিলের সঙ্গে সংযুক্ত অন্তত ৩৮টি চোরাগোপ্তা গলি আর বাসাবাড়ির চোরাগেট ঘিরে বেড়ে যায় মাদক ব্যবসায়ী ও নেশাখোরদের আনাগোনা। তৎপরতা বাড়ে ছিনতাইচক্রের। ঝিলের সংযোগ সেতুর আশপাশেই মাদক বিক্রেতা ও সেবনকারীদের তৎপরতা বেশি। রাতে আলো স্বল্পতার সুযোগে সেখানে জুটিবদ্ধ হয়ে আপত্তিকর কর্মকা- করছে কেউ কেউ। রাত যত গভীর হয় নিশিকন্যাদের উপস্থিতিও বাড়তে থাকে। কোথাও দলবেঁধে চলছে নেশার আসর। দেহব্যবসাকে ঘিরে হাতিরঝিলজুড়ে বেশ কজন দালাল তৎপর রয়েছে।
সম্প্রতি হাতিরঝিলে ঘুরতে এসেছিলেন সুমন, রবিউল ও রাহুল নামে তিন বন্ধু। রাত সাড়ে ৯টায় হাতিরঝিলে তেজগাঁও অংশে লেকের পাড়ে তাদের ঠেক দিয়ে তিনটি মোবাইল সেট নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।

ভুক্তভোগী সুমন বলেন, থানায় অভিযোগ করে লাভ কি? আরও বাড়তি ঝামেলায় পড়তে হবে। এ চক্রের অধিকাংশই কিশোর ও যুবক। ইয়াবার নেশায় বুঁদ হয়ে এদের অনেকেই অশালীন নৃত্যে নেচে ওঠে। ফাঁকে ফাঁকে চলে বাইক রেসিংয়ের প্রতিযোগিতা। ধনীর নেশাখোর ছেলেমেয়েরা এসে আড্ডা জমায় হাতিরঝিলে। এছাড়া ব্রিজগুলোর রেলিং ঘেঁষে বসে চলে মাদকসেবনসহ অসামাজিক কার্যকলাপ।

হাতিরঝিল প্রকল্প পরিচালক জামাল আখতার ভূঁইয়া বলেন, হাতিরঝিলের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিরাপত্তাকর্মীরা কাজ করছে। তিনি বলেন, ছিনতাই, দুর্ঘটনাসহ নানা ঘটনার অভিযোগ আসার পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের আপত্তিকর আড্ডার বিষয়টি নিয়ে অনেকেই অভিযোগ করছেন। আমরাও বিষয়টি খতিয়ে দেখেছি। রেলিং ঘেঁষে বসে কেউ যেন অযথা আড্ডা দিতে না পারে, এ জন্যই কাঁটাতার বসানো হচ্ছে। আরও বিভিন্ন পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে।

হাতিরঝিল থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মোহাম্মদ গোলাম আযম আরও বলেন, অপরাধ দমনের লক্ষ্যে অনেক বড় এলাকাকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এলাকায় বিভক্ত করে অপরাধীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করে থাকি। ঠিক তেমনিভাবে হাতিরঝিলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি রয়েছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ২ জানুয়ারি উদ্বোধনের পর হাতিরঝিলে সড়ক দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত ৫০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কয়েকশ। আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন। কয়েকটি গাড়ি সড়ক থেকে ছিটকে পড়েছে লেকের পানিতে। চার মাস আগে ১২ অক্টোবর মেরুল-বাড্ডা সংলগ্ন হাতিরঝিলের লেক থেকে হাত-পা বাঁধা এক যুবকের লাশ উদ্ধার করে হাতিরঝিল থানা পুলিশ। একই থানা পুলিশ এর আগে ২০১৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর হাতিরঝিলের কুনিপাড়া এলাকার লেক থেকে একটি ও ২০১৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর অর্ধগলিত আরও একটি লাশ উদ্ধার করে।