করোনার গতি বুঝে এবারের বইমেলা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

করোনার গতি বুঝে এবারের বইমেলা

তুষার আহসান ৮:৫২ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০২০

print
করোনার গতি বুঝে এবারের বইমেলা

এমন সময়ে প্রকাশনা সংস্থাগুলোতে থাকে প্রাণচাঞ্চল্য। এবার তাতে কিছুটা হলেও ভাটা পড়েছে। অনেক প্রকাশক ভয়ে আছেন অর্থলগ্নি নিয়ে। অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০২১ যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়ে দ্বিধান্বিত আয়োজক সংস্থা বাংলা একাডেমি। ‘যদি’তে আটকে আছে তার সিদ্ধান্ত। করোনা পরিস্থিতির আরও অবনতি না হলে যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে, বলছে সংস্থাটি। সে লক্ষ্য সামনে রেখে চলছে প্রস্তুতিও। আর করোনার সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষায় গতবারের তুলনায় কমতে পারে স্টল সংখ্যা। তবে দোটানায় ঝুলে থাকা সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা সংস্থাগুলোর। মেলা হওয়া না হওয়া নিয়ে একটি সিদ্ধান্তের দাবি তাদের।

প্রকাশকরা বলছেন, মাঝামাঝি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই, কারণ প্রকাশনা সংস্থাগুলোর অর্থলগ্নির বিষয় আছে। এদিকে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ১০০ বই করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত বাংলা একাডেমি ২৭টি বই প্রকাশ করছে। ফলে তাদের গতিতেও আশাহীন হয়ে পড়ছেন মেলায় অংশ নিতে আগ্রহী প্রকাশকরা।


বাংলা একাডেমি সূত্রে জানা গেছে, করোনার পরিস্থিতির বর্তমান অবস্থা অব্যাহত থাকলে অমর একুশে গ্রন্থমেলা বরাবরের মতো ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনই উদ্বোধন হবে। একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হবে মেলা। তবে করোনারোধে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষায় মেলার স্টল সংখ্যা গতবারের তুলনায় কমতে পারে। মেলায় আগত দর্শনার্থীদের কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রবেশাধিকার দেওয়া যায় তারও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কিন্তু কোনো কারণে নভেম্বর-ডিসেম্বরে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে মেলার বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আর প্রকাশক ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে বসে মেলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বাংলা একাডেমিকে। কারণ এখন বাংলা একাডেমি বলল বইমেলা হবে। সেই অনুযায়ী আমরা অর্থলগ্নি করে মেলায় বই প্রকাশের প্রস্তুতি নিলাম। কিন্তু পরে সরকারের অনুমতি না পেয়ে বাংলা একাডেমি যদি বলে মেলা হবে না, তাহলে প্রকাশকদের যে ক্ষতি হবে তা অপূরণীয়। তাই মেলা হবে নাকি হবে না একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাদের মতে, ২০২০ এর মেলায় আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া ও সারা বছর ধরে কাজ করার পরও নতুন বই প্রকাশ হয়েছিল ৪ হাজার ৯১৯টি। বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছিল ৪১টি নতুন বই। আর এবার মার্চ থেকে অন্তত জুলাই পর্যন্ত সব কাজ থেকে বিরত ছিল প্রকাশনীগুলো। এখন মেলার বাকি আর তিন মাস। এখনো ‘কনক্রিট’ সিদ্ধান্ত না পেলে কাজে হাত দেওয়া কঠিন।

অন্যপ্রকাশের মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘মানুষ এখন স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে আছে। বড় বড় শপিং মল খুলে দেওয়া হয়েছে। এমনকি সিনেমা হলও খুলে দেওয়া হয়েছে। কাজেই মেলা না হওয়ার কোনো কারণ দেখি না।’

সিদ্দিকীয়া পাবলিকেশন্সের স্বত্বাধিকারী ও ছড়াশিল্পী মালেক মাহমুদ বলেন, ‘করোনার সেকেন্ড ওয়েভ নিয়ে স্বাস্থ্যবিদরা শীতকে তুলে ধরেছেন। আমার জানা মতে, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে শীত তেমন আর থাকে না। সে হিসেবে মেলা শুরুর ও শেষের সময় নিয়ে ভাবা যেতে পারে। একুশের চেতনায় ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখ থেকে শুরু করে স্বাধীনতার মাসে গিয়ে শেষ করার কথা ভাবতে পারে আয়োজকরা। সেক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীরা ঝড়-বৃষ্টির কথা মাথায় রেখেই তাদের স্টল সাজিয়ে মেলা চালিয়ে যেতে পারবেন স্বাচ্ছন্দে।’ প্রকাশনা সংস্থা ‘সাহিত্যদেশ’র প্রকাশক মো. সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মেলাকে সামনে রেখে আমাদেরকে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হয়। এর পিক টাইম চলছে। অথচ অর্থলগ্নি নিয়ে আমাদেরকে ভাবতে হচ্ছে।’ এবারের বইমেলায় অংশগ্রহণে আগ্রহী সবার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে স্টল করে দেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার উদারহস্তে প্রায় সব সেক্টরকেই প্রণোদনা দিয়েছেন। কিন্তু জ্ঞান বিকাশের মাধ্যম বইয়ের প্রকাশকরা দুরবস্থায় থাকলেও কেউ খোঁজ নেননি। বইমেলাকে কেন্দ্র করে অন্তত তাদের কথা চিন্তা করা উচিৎ।’ আগামী প্রকাশনীর ওসমান গনি বলেন, ‘বাংলা একাডেমি মেলার আয়োজনের কাজ শুরু করেছে এটা ঠিক। কিন্তু তারা যে কথাটা বলছে যে সরকার যদি কোনো সময় বন্ধ করে দেয় তাহলে এটাতে আমাদের কোনো আপত্তি করা যাবে না। এটা একটা নেগেটিভ বিষয়। এটাতে আমার অবজারভেশন হচ্ছে, বাংলা একাডেমি সরকারসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষের পূর্ব অনুমতি না নিয়ে কাজ শুরু করেছে। বলা যেতে পারে যে তারা প্রধানমন্ত্রীর কোনো অনুমতি না নিয়ে কাজটা শুরু করেছে। তিনি আরও বলেন, তাই বন্ধ করে দিলে আপত্তি করা যাবে না এই ধরনের কথা বলতে হচ্ছে তাদের। এখানে নেগেটিভ বিষয় হচ্ছে, মেলার আয়োজনের কাজ শুরু আগেই যার যার অনুমতি দরকার তা নিয়ে নিতে হবে। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, যখন একটা বইমেলা হয় তখন আমাদেরও একটা প্রস্তুতির বিষয় থাকে। এখন আমরা মেলার প্রস্তুতি নিলাম, তখন যদি মেলা না হয় তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে?

তথ্য বলছে, ২০২০-এর বইমেলায় ৮২ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছিল। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমি অংশে সব মিলিয়ে ৫৬০টি প্রতিষ্ঠানকে ৮৭৩টি ইউনিট বা স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ২০২১ এর বইমেলায় অংশ নিতে আগ্রহপত্র মাস খানেক আগে আহ্বান করলে গতবার মেলায় যারা অংশ নিয়েছে তাদের প্রত্যেকেই আগামী মেলায় অংশ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। নতুন আরও কিছু প্রকাশনা সংস্থা স্টল বরাদ্দের আবেদন করবেন বলে জানা গেছে। ফলে নতুনদের বিষয়ে না ভাবলেও পুরাতন প্রকাশনীকে বাদ দেওয়া কঠিন হবে মেলার আয়োজক সংস্থার জন্য। তাই নভেম্বর মাসে মেলার স্টলের ডিজাইন করার আগ পর্যন্ত আগামী মেলায় কতটি স্টল করা হবে তা এই মুহূর্তে বলা কঠিন বলে জানিয়েছে বাংলা একাডেমি সূত্র।

বাংলা একাডেমির পরিচালক ও গত মেলার পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদ বলেন, ‘আগামী বইমেলায় স্টলের সংখ্যা কমলেও খুব একটা কমবে না। আরও মাসখানেক পরে যখন স্টলের ডিজাইন করতে যাবো এবং তখন যদি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় তখন হয়তো কিছু কমতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে আগ্রহ দেখাচ্ছে তাকে স্টলের সংখ্যা কমার সম্ভাবনা খুবই কম।’ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ১০০ বই করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে একশ বই করার কথা রয়েছে বাংলা একাডেমির। এরমধ্যে ২৭টি বই বেরিয়েছে। ৩ বছরে ১০০ বই করার কথা রয়েছে। সেভাবে আমরা আগাচ্ছি। এবারের বইমেলায়ও বঙ্গবন্ধুর ওপর ২০ থেকে ২৫টি বই প্রকাশিত হবে।

মেলা প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা বলতে পারি অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০২১ যথাসময়েই হবে। ১ ফেব্রুয়ারি মেলার উদ্বোধন হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই এবারের মেলা হবে। তবে নভেম্বর-ডিসেম্বরে করোনা পরিস্থিতি যদি আরও খারাপ হয়, তখন পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, বর্তমান যে পরিস্থিতি তা অব্যাহত থাকলে আগামী বইমেলা আয়োজন করতে কোনো বাধা নেই। সেই অনুযায়ী আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মেলার আয়োজন করা হবে আগামী এক মাসের মধ্যে এ নিয়ে বৈঠক করে বিস্তারিত জানানো হবে।এবারের বইমেলা