ঢাকার যানজটে দায়ী ব্যক্তিগত গাড়ি

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০১৯ | ৮ শ্রাবণ ১৪২৬

ঢাকার যানজটে দায়ী ব্যক্তিগত গাড়ি

ছাইফুল ইসলাম মাছুম ১০:১৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০১৯

print
ঢাকার যানজটে দায়ী ব্যক্তিগত গাড়ি

রাজধানী ঢাকায় বাড়ছে মানুষ, বাড়ছে গাড়ি, কিন্তু বাড়ছে না সড়ক। ফলে দিন দিন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে যানজট। ঢাকার সমার্থক নাম হয়ে উঠেছে যেন ট্রাফিক জ্যামের শহর। এতে ভোগান্তি বাড়ছে মানুষের, নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা। রাজধানী ঢাকার অসহনীয় যানজটের পেছনে দায়ী কে? এ ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিগত গাড়িকেই দুষছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

সম্প্রতি নাম্বিও নামের একটি গ্লোবাল ডেটাবেইসের সমীক্ষায় ২০১৯ সালে ঢাকাকে বিশ্বের সর্বাধিক যানজটের শহর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ট্রাফিক ইনডেক্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনও বলছে, যানজটে বিশ্বের শীর্ষ নগর ঢাকা। এর আগের দুই বছর ঢাকার স্থান ছিল দ্বিতীয়, ২০১৬ সালে ছিল তৃতীয়। ঢাকা মহানগরের যানজট যে লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে সমীক্ষাতে সেই ইঙ্গিতই পষ্ট।

যানজটের কারণে ঢাকার জীবনের গতি থেমে যাচ্ছে। এই শহরের গাড়ির গতি কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাঁটার গতির চেয়ে কম। ওয়ার্ল্ড ট্রাফিক ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় যানবাহনের গড়গতি এখন ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। ২০ বছর আগে রাজধানীতে যানবাহনের গড়গতি ছিল ২৭ কিলোমিটার। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৮ সালে এক গবেষণায় দেখিয়েছে, যানজটের কারণে প্রতিদিন ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। বছরে এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৩৭ হাজার কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ব্যক্তিগত গাড়িগুলোই এ যানজটের অন্যতম কারণ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে ঢাকার রাস্তায় বছরে ৯০ হাজার নতুন গাড়ি নামে এসব গাড়ির ৮৫ ভাগই ব্যক্তিগত ব্যবহারের। আর বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন নতুন ৫৫টি প্রাইভেটকার যুক্ত হচ্ছে ঢাকা নগরীতে। সে হিসাবে ঢাকার রাস্তায় বছরে নামছে প্রায় ২০ হাজার নতুন প্রাইভেটকার। বেসরকারি সংস্থা ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকায় মাত্র ৯ শতাংশ মানুষের প্রাইভেটকার (ব্যক্তিগত গাড়ি) সড়কের ৭০ শতাংশ জায়গা দখল করে। ৯১ ভাগ মানুষের জন্য গণপরিবহন সড়কের মাত্র ৩০ শতাংশ স্থান ব্যবহার করে।

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক খোলা কাগজকে বলেন, ঢাকায় যানজটের মূল কারণ হচ্ছে, যে হারে গাড়ি বাড়ছে, সে হারে রাস্তা নেই। পাকিস্তান আমলের রাস্তা ব্যবস্থাপনায় এখনো এই শহর চলছে। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সরকারগুলো সেভাবে সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেনি।

ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত শহর গড়তে সচেতনতা সৃষ্টি করছে কার-ফ্রি সিটিস এলায়েন্স। আন্তর্জাতিক এ জোটটি যান্ত্রিকবাহনমুক্ত শহর গড়তে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১২টিরও বেশি দেশে কাজ করছে। সংস্থাটি বলছে, সাধারণ ব্যক্তিগত গাড়িভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রাধান্যের কারণে প্রতিদিন বাংলাদেশে সৃষ্টি হচ্ছে অসহনীয় যানজট। বৃদ্ধি পাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনা, নষ্ট হচ্ছে সময়, অপচয় হচ্ছে হাজার হাজার কর্মঘণ্টা। সেই সঙ্গে যানবাহন থেকে নির্গত বিভিন্ন রাসায়নিকের কারণে দূষিত হচ্ছে বাতাস, অপচয় হচ্ছে মূল্যবান জ্বালানি। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ এবং ব্যাহত হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন। প্রচণ্ড শব্দ ও বিষাক্ত ধোঁয়ায় আক্রান্ত হতে হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে।

বেসরকারি সংস্থা ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক মারুফ হোসেন খোলা কাগজকে বলেন, বেইজিংসহ পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে যানজট ও দূষণ কমাতে প্রাইভেটকার জোড়-বেজোড় চালানোর জন্য নিয়ম করেছে। কিন্তু আমাদের দেশে কোনো নিয়ম নেই। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণের জন্য পার্কিংয়ের জন্য কড়াকড়ি আরোপ করা, ট্যাক্স বাড়ানো, গাড়ি লোন না দেওয়া, রেজিস্ট্রেশন লিমিট করে দেওয়া যেতে পারে।

মারুফ হোসেন বলেন, প্রাইভেটকার রিকশার চেয়ে আড়াইগুণ বেশি জায়গা নেয়। রিকশা গণপরিবহন হিসেবে সারা দিন ৫০ ট্রিপের মতো দেয়, এতে বহু মানুষ সহজে যাতায়াত করতে পারে। অথচ প্রাইভেটকারের দিকে আঙ্গুল না তুলে রিকশার দিকে আঙ্গুল তোলা হচ্ছে।

ব্যক্তিগত গাড়ি প্রসঙ্গে অধ্যাপক শামমুল হক বলেন, ‘প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেলসহ ব্যক্তিগত ছোট ছোট যান দখল করে রাখে ঢাকার প্রায় ৮৫ ভাগ রাস্তা। ওরা পঙ্গপালের মতো চলে, এদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না পুলিশ। পৃথিবীতে প্রাইভেটকারকে বলা হয়ে থাকে অভিশাপ। চলার জন্য যেমন জায়গা চায় বেশি, থামার জন্যও জায়গা চায় বেশি।’

তিনি বলেন, একটি মেগা সিটির পরিবহন ব্যবস্থাপনার জন্য যে বিজ্ঞান থাকা উচিত আমাদের পরিবহন কর্তৃপক্ষ তার ধারে কাছেও নেই। প্রাইভেট গাড়ি অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, নইলে পুরো ঢাকা একদিন পার্কিং এরিয়া হয়ে যাবে।

শামসুল হক বলেন, রাস্তা কম হওয়ায় সরকারের কৌশল হওয়া উচিত, প্রাইভেট গাড়িকে নিরুৎসাহিত করে দ্বিতল গণপরিবহন বাড়ানো। সড়ক ব্যবস্থাপনায় যারা আছেন তারা জানেন না, রাস্তার ধারণক্ষমতা কত? এতে কত গাড়ি রেজিস্ট্রেশন দেওয়া উচিত? কর্তৃপক্ষ যদি এই সমীকরণ না বোঝেন তাহলে যানজটের পরিত্রাণ নেই।