অপরাধ জগতে বাড়ছে নারী

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮ | ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

অপরাধ জগতে বাড়ছে নারী

এম কবীর ১০:২২ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৯, ২০১৮

print
অপরাধ জগতে বাড়ছে নারী

রাজধানীতে দিন দিন বাড়ছে নারী অপরাধী। ছিনতাই, চুরি, অপহরণ, প্রতারণা, অস্ত্র বহন, মাদক বিক্রি ও বহন, যৌনতার জালে ফেলে প্রতারণা, নকল টাকা বহনসহ বিভিন্ন ভয়ঙ্কর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে নারী। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নারীদের দিয়ে অপরাধ করানো তুলনামূলক নিরাপদ।

এ কারণেই বড় অপরাধীরা তাদের দলে টানছে। প্রশাসন বলছে, সামাজিক অবক্ষয় এবং কোমল মানসিকতার সুযোগ নিয়ে নারীদের বিপথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের প্রধানরা মোটিভেটেড করে তাদের অপরাধ জগতে নিয়ে যাচ্ছে।

সম্প্রতি গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া বেশ কয়েকজন নারী অপরাধীর কাছ থেকে পাওয়া গিয়েছে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে নগদ টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেওয়াসহ খুনের মতো অপরাধে জড়িত হচ্ছে তারা। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের রয়েছে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। অপরাধ করেও সহজেই জেল থেকে বের হয়ে যায় তারা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল থেকে প্রায় এক বছর আগে চুরি হওয়া শিশুকন্যা জিমকে নারায়ণগঞ্জ থেকে উদ্ধারের পর জাহানারা নামে এক মহিলাকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। কিন্তু কয়েক মাস পরেই জেল থেকে বের হয়ে ফের ঢামেকের বহিঃবিভাগে সঙ্গীসহ তাকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যাচ্ছে। জাহানারাসহ আরও কয়েকজন মহিলার নামে বেশ কয়েকবার শিশু চুরির অভিযোগ ছিল। তারপরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে দিয়েই ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা ঢামেকের ভেতরে।

সম্প্রতি উত্তরা থেকে নায়িকা ও ডাক্তাররূপী সাবিয়া সানি ওরফে সাবিয়া তানিয়াকে প্রতারণার দায়ে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে পরিচয়ের সূত্র ধরে কৌশলে বিত্তশালী ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের টার্গেট করে তাদের ফাঁদে ফেলে সর্বস্ব হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আবার কতিপয় সুন্দরী নারী মোবাইল ফোনের মাধ্যমে উঠতি বয়সের যুবকদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে যৌনাবেদন সৃষ্টি করে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে ছবি ও ভিডিও তুলে ব্ল্যাকমেল করে হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা।

রাজধানীর অভিজাতপাড়ায় মধ্যরাতে দেখা মেলে সুন্দরীদের, যারা টাকার বিনিময়ে জড়িয়ে পড়েন নানা অনৈতিক কর্মকা-ের সঙ্গে। মাদক সেবন, বিক্রিসহ দেহ ব্যবসাও সেখানে অনেকটা ওপেন সিক্রেট। টিনএজার থেকে শুরু করে বৃদ্ধরা পর্যন্ত জড়িয়ে পড়ছেন এ চক্রে। এদেরই একজন ১৯ বছর বয়সী ইডেন ডি সিলভা ওরফে রামিসা সিমরান নামে একজনকে গত মাসে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অভিজাত এলাকায় তাকে ইয়াবা সুন্দরী হিসেবে অনেকেই চেনে।

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় থেকে ধনাঢ্য পরিবারের সন্তানদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে ব্ল্যাকমেল করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গুলশান, বনানী ও মিরপুরসহ একাধিক থানায় তার নামে বেশ কয়েকটি মামলা ও জিডি রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত এক বছরে রাজধানীর বিভিন্ন স্পটে নারী ছিনতাইকারীদের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। ঢাকা শহরে যে পরিমাণ মাদক প্রবেশ করে তার নব্বই ভাগের বহনকারী নারী, একইভাবে মাদক বিক্রির ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হচ্ছে তাদের।

পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছেন মোস্ট ওয়ানটেড কয়েজন সুন্দরী। এদের আসল কাজ বিয়েবাণিজ্য। টাকাওয়ালাদের ব্ল্যাকমেল করে মোটা অঙ্কের টাকার কাবিন করে শেষে নানা অজুহাতে ঝগড়া বাধিয়ে কাবিননামার টাকা আদায় করছে। এর পেছনেও রয়েছে একটি পুরুষ চক্র।
পুলিশের অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্প্রতি রাজধানীতে হাই সোসাইটির সুন্দরী মেয়ে ও মফস্বল এলাকা থেকে আগত সুন্দরী মেয়েদের বেশি করে আগমন ঘটছে অপরাধ জগতে। এদের ব্যবহার করা হচ্ছে প্রতারণায়।

গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিশাত রহমান বলেন, ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় কয়েকটি চক্র সুন্দরী ও উঠতি বয়সের নারীদের ব্যবহার করে একটি পুরুষ চক্র দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ করে যাচ্ছে। এ ধরনের কয়েকটি চক্রকে গোয়েন্দা পুলিশ শনাক্ত করে অনেককেই গ্রেপ্তার করেছে। আরও কিছু চক্র রয়েছে যাদের নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। যে কোনো সময় তাদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হবে পুলিশ। কেন নারীরা অপরাধমূলক কাজে জড়াচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সমাজের নানান রকম অবক্ষয় ও বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য অনেকেই বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত হচ্ছে। তবে নারীরা কোনো না কোনোভাবে মোটিভেটেড হয়ে বিপথে পা রাখছে বলেও মনে করেন তিনি।

পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক মো. সোহেল রানা মনে করেন, একজন পুরুষকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহজে অপরাধী হিসেবে শনাক্ত করতে সুযোগ পায়। অন্যদিকে নারী যখন বিভিন্ন ড্রাগস কিংবা নিষিদ্ধ বস্তু বহন করে তখন তাকে সন্দেহের আওতায় নিয়ে আসাটা কঠিন। এ সুযোগে নারীদের দিয়েই অপরাধীরা অপরাধমূলক কাজ করাচ্ছে।

মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, নারীরা সমাজের বিভিন্ন অবস্থান থেকে নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়। বিশেষ করে যৌন হয়রানির শিকার হয়ে অনেকেই অপরাধ জগতে পা রাখছে। অনেকেই পরিবারের প্রধান ব্যক্তিটির ইচ্ছাপূরণে বড় বড় অপরাধ করছে। কেউ কেউ ব্ল্যাকমেলের শিকার হয়ে বাধ্য হচ্ছে নানান অপকর্মে জড়াতে। অপরাধীরা অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে নারীদের ব্যবহার করছে। নারীদের সমঅধিকারের জায়গা করে দিলে অপরাধ জগতে আসবে না বলে মন্তব্য করেন খ্যাতনামা এ আইনজীবী।