কিশোরগঞ্জের লালডিঙ্গি পান

ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০ | ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭

কিশোরগঞ্জের লালডিঙ্গি পান

সাজন আহম্মেদ পাপন, কিশোরগঞ্জ ৯:৪০ অপরাহ্ণ, জুলাই ০২, ২০২০

print
কিশোরগঞ্জের লালডিঙ্গি পান

ভারতীয় উপমহাদেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লার একটি জনপ্রিয় গান আছে- ‘পান খাইয়া ঠোঁট লাল করিলাম, বন্ধু ভাইগো হইল না’। পানের প্রচলনটা শুধু ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে দেখা যায় বেশি। হরেক রকম জর্দা, সুপারি, চুন, খয়েরের মিশেলে এক খিলি পান যদি মুখে না তোলা যায় তাহলে খাবারে তৃপ্তি পায় না ভোজন রসিকরা। বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে সামাজিক রীতি, ভদ্রতা এবং আচার-আচরণের অংশ হিসেবেই পানের ব্যবহার চলে আসছে।

এক সময় বিয়ে-শাদি পূজা-পার্বনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান পান ছাড়া চলতোই না। কনের বাড়িতে বর পক্ষ পান না নিয়ে এলে বিয়ে পর্যন্ত ভেঙে যেত। প্রাচীন অভিজাত জনগোষ্ঠীর মাঝে বিভিন্ন উপকরণে পান তৈরি এবং তা সুন্দরভাবে পানদানিতে সাজানো লোকজ শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পেত। ওই সময়ের নানি দাদিদের পান খাওয়ার শখ ছিল গল্পের মতো। তারা খুবই সৌখিনতার আদলে পান খেতেন। ছিল পানের বাটা। সরতা।

যুগ পরিবর্তনে পানের বাটা, সরতা সোনালী অতীতে ঠাঁই নিলেও বাঙালি সমাজে পানের সমাদর কমেনি। পান খাওয়ার রীতি গ্রাম থেকে শহরের প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে এখনো চোখে পড়ে। ঐতিহ্য পরম্পরায় গ্রামের অধিকাংশ নারীরা এখনো পান খায়। নতুন বৌ এলে শখ করে নানি দাদিরা তাদের পান খাওয়ানো শেখায়।

বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরণের পান উৎপাদন হয়। পানের মান ও ধরনের ভিন্নতা আছে। চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও সিলেট অঞ্চলে বেশ কয়েকটি পানের জনপ্রিয় জাত রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কিশোরগঞ্জের ‘ লালডিঙ্গি’ পান। এই পান বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষের কাছে খুব পরিচিত একটি পান। আকারে বড়, মসৃন, পুরু এবং সুস্বাদু রকমের এই ‘লালডিঙ্গি’ পানের চাষ কিশোরগঞ্জেই বেশি হয়। কিশোরগঞ্জ তথা বৃহত্তর ময়মনসিংহের  মানুষ ‘পান’ বলতে যা  বোঝে ওই ‘লালডিঙ্গি’ পানকেই বোঝে। প্রাকৃতিক সুগন্ধিযুক্ত, পুরু ও রসে ভরপুর থাকায় তাদের কাছে এ পান সমাদৃত।

কিশোরগঞ্জ শহরের পুরান থানা বাজারের প্রবেশ মুখ ধরে কয়েক কদম সামনে এগুলেই গলির দুই ধারে পড়বে পানের দোকান। এখানে পাইকারি ও খুচরা দুইভাবেই পান বিক্রি হয়। গলি ধরে সামনে এগুলেই কাঁচাবাজারে যাওয়ার একটা মোড়। এই মোড়েই আবদুল মালেকের পানের দোকান। তার কাছ থেকেই প্রথমে জানা গেল  ‘লালডিঙ্গি’ পান সম্পর্কে। কোথা থেকে আসে এ পান? উত্তরে তিনি জানান, বাপ-দাদার আমল থেকেই তাদের পানের বরজ (বাগান) রয়েছে। বংশ পরম্পরায় পান বিক্রির সঙ্গেও তিনি জড়িত। করিমগঞ্জ উপজেলার সুবন্দি, সাঁতারপুর ও জাঙ্গাল গ্রামে অনেক পানের বরজ রয়েছে। এসব বরজ থেকে প্রতিদিন পান সংগ্রহ করে আনেন তিনি।

আবদুল মালেক জানান, কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় এই পানের চাষ বেশি হয়। এছাড়াও করিমগঞ্জ, হোসেনপুর কটিয়াদী ও ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলাসহ বিভিন্ন উপজেলায় এ পানের চাষ হয়। বিড়া হিসেবে (প্রতি বিড়ায় পান ১২০টি) এ পান কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন বাজারে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করা হয়। পুরান থানা বাজারের পানের ব্যবসায়ীরা মিলে গড়ে প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার ‘লালডিঙ্গি’ পান বিক্রি করেন।

`লালডিঙ্গি’ পান চাষের খোঁজখবর নিতে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া ও হোসেনপুর উপজেলার বিভিন্ন পানের বরজে গিয়ে জানা যায়, পাকুন্দিয়ায় সুস্বাদু লালডিঙ্গি পান চাষ করে অনেকে লাভবান হচ্ছেন এবং দিনদিনই এর ফলন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ উপজেলার কমবেশি সকলেই নিজেদের আবাদি জমির মধ্যে একটি অংশে পান চাষ করে থাকেন। নিজেদের খাবারের চাহিদা মিটিয়ে সপ্তাহে এক-দুইবার পান বাজারে বিক্রি করে সংসারের খরচ চালিয়ে যাচ্ছেন। হোসেনপুরের গোবিন্দপুর ইউনিয়নের পানও কম বিখ্যাত নয়।

তবে পান বেশি খাওয়ার বিষয়ে কিশোরগঞ্জের বিশিষ্ট ওরাল এন্ড ডেন্টাল সার্জন ডা. ফারুক আহমেদ বলছেন, রঙ-বেরঙের মসলাযুক্ত পান-সুপারি-জর্দার কারণে মুখগহ্বরের ক্যান্সারের ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাছাড়া দাঁতের ক্ষয়, মাড়ির রোগেরও অন্যতম কারণ এই পান সুপারি।