সংস্কার কাজের দেড় কোটি টাকা বাটোয়ারার মিশন

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২০ | ২৯ শ্রাবণ ১৪২৭

বরিশাল শেবাচিম হাসপাতাল

সংস্কার কাজের দেড় কোটি টাকা বাটোয়ারার মিশন

হেলাল উদ্দিন, বরিশাল ১০:০৫ অপরাহ্ণ, জুন ২৮, ২০২০

print
সংস্কার কাজের দেড় কোটি টাকা বাটোয়ারার মিশন

বরিশালে শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালে মেরামত ও সংস্কার কাজের জন্য বরাদ্দকৃত দেড় কোটি টাকা ভাগ-বাটোয়ারার মিশনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, বরিশাল গণপূর্ত বিভাগ ও একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ মিশন সম্পন্ন করতে ইতিমধ্যে সব ধরনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। অনিয়মের বিস্ময়কর তথ্য হচ্ছে, কাজ শেষ তো দূরের কথা, বলতে গেলে কাজ শুরুর আগেই ঠিকাদারদের অনুকূলে বরাদ্দকৃত অর্থ বা বিলের চেক হস্তান্তরও করা হয়েছে। এখন শেষের দিকের দু-একটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারলেই নিশ্চিন্ত মনে ভাগ-বাটোয়ারার কাজটি শেষ করতে পারে তারা।

 

বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে চেক প্রদানের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জেড়াল্ড অলিভার গুডা। তবে অনুমোদিত সব কাজ নিয়মমাফিক সম্পন্ন করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, এতে অর্থ লোপাটের কোনো সুযোগ নেই। এদিকে চলমান কাজ নিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী ও দায়িত্বরত উপ-সহকারী প্রকৌশলীর ভিন্ন ভিন্ন ও বিভ্রান্তিকর তথ্য অনেকটা স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে দুর্নীতির চিত্র।

তথ্য সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্র্থবছরে জিওবি রাজস্ব বাজেটে শেবাচিম হাসপাতালের সংস্কার ও মেরামত কাজের জন্য ১ কোটি ৫২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ২৭ ধরনের এ কাজের অনুমোদন প্রদান করে অর্থ ছাড়ের জন্য চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাকে চিঠি দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের মেরামত অধিশাখার উপসচিব মোহাম্মদ শাহদাত খন্দকার স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে মোট বরাদ্দের অর্ধেক (৫০ শতাংশ) টাকা ছাড়করণের নির্দেশনা দেওয়া হয়। সাধারণত এই চিঠি ইস্যুর মাস খানেকের মধ্যে বরাদ্দকৃত টাকা ছাড় দেয় প্রধান হিসাবরক্ষণ অফিস।

নিয়ম অনুযায়ী মন্ত্রণালয় প্রাক্কলিত কাজের অনুমোদন দেওয়ার পরপরই দরপত্র আহ্বানসহ অন্যান্য প্রক্রিয়া শুরুর প্রস্তুতি  গ্রহণ করে থাকে স্ব স্ব নির্বাহী প্রকৌশলী। সে হিসেবে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে দরপত্র আহ্বানসহ সব প্রক্রিয়া শেষ করে কাজ শুরু করার কথা। কিন্তু গত কয়েক দিন আগে তড়িগড়ি করে শুরু করা হয় এসব কাজ। মূলত অর্থ বছর শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকায় বরাদ্দকৃত অর্থ ফেরত না দেওয়ার কৌশল হিসেবে এবং অর্থ লোপাটের সহজ এ সুযোগ হাত ছাড়া না করতেই শুরু হয় এসব কাজ।

এদিকে গুরুত্বপূর্ণ দু একটি ছাড়া নিয়ম নীতির কোনো শর্তই মানা হয়নি পুরো প্রক্রিয়ায়। কাজ শেষ করার পূর্বে অর্থ বা বিল প্রদান না করা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধানকে কার্যাদেশ ও প্রাক্কলনের অনুলিপি প্রেরণ নিশ্চিত করা, কাজ সম্পর্কে অনাপত্তি পত্র গ্রহণ এবং কার্য সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে মর্মে প্রত্যয়ন প্রাপ্তির পর বিল পরিশোধসহ কোনো নিয়মই মানা হয়নি এসব কাজের ক্ষেত্রে।

এমনকি প্রতিটি কাজের দৃশ্যমান স্থানে ন্যূনতম ৩ ফুট দৈর্ঘ্য ও আড়াই ফুট প্রস্থ সাইজের বোর্ডে কাজের নাম অর্থের পরিমাণ, প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম ও মোবাইল নম্বরসহ সব তথ্য আবশ্যিকভাবে প্রদর্শন করা এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কর্তৃক প্রতিটি কাজ তদারকি করার নিয়ম পাত্তাই পায়নি কোনো ক্ষেত্রে।

এদিকে গত ৯ জানুয়ারি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বরত প্রতিষ্ঠান প্রধানদের কাছে মন্ত্রণালয়ের মেরামত অধি শাখার উপসচিব মোহাম্মদ শাহদাত খন্দকার স্বাক্ষরিত একটি চিঠি প্রেরণ করা হয়। যাতে করোনা পরিস্থিতির কারণে বাধাগ্রস্ত হওয়া প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের সকলকে সহযোগিতা করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। একই সঙ্গে প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন শেষে ব্যবহারকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কাজ বুঝে নিয়ে প্রত্যয়ন পত্র প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য নির্দেশনাও প্রদান করা হয়।

জানতে চাইলে বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জেড়াল্ড অলিবার গুডা বলেন, এ মাসের শুরুর দিকে আমরা অর্থ বরাদ্দ পেয়েছি। তাই সব প্রক্রিয়া শেষ করে করোনার এই সংকটের মধ্যেও কাজ শুরু করেছি। তিনি বলেন, কাজে সব ধরনের শর্ত পালন করা হয়েছে। তবে সময় সংকট প্রশ্নে অর্থ যাতে ফেরত না যায় সে জন্য সিকিউরিটি স্বরূপ পে-অর্ডার রেখে ঠিকাদারদের অনুকূলে বিল প্রদান করা হয়েছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসলে করোনা সংকটে বরাদ্দ দেওয়া হবে কি-না সে বিষয়ে উপরমহলই সিদ্ধান্তহীনতায় ছিল। তাই এ কাজ শুরু করতে বিলম্ব হয়েছে। কাজের দায়িত্বরত উপসহকারী প্রকৌশলী সেলিম প্রথমে ফেব্রুয়ারি মাসে কাজ শুরুর কথা বললেও পরক্ষণেই কিছু দিন আগে কাজ শুরু হয়েছে বলে জানান। এ বিষয়ে আর কোনো কথা বলতে রাজি হননি তিনি।

হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন বলেন, কোনো মতে স্বল্প পরিসরে কাজ শুরু হয়েছে। কাজ শেষ করার আগে বিল প্রদানের বিষয়ে তিনি বলেন, আমার প্রত্যয়ন ছাড়া বিল প্রদানের নিয়ম নেই। তারপরও নির্বাহী প্রকৌশলী সেটা করে থাকলে সে দায়ভার তার। আমি আমার কাজ বুঝে  সম্পূর্ণ বুঝে পেলেই হলো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগরীর একাধিক অভিজ্ঞ ঠিকাদার বলেন, সময় সংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে বিল আগে প্রদান করা হয়ে থাকে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে কাজে কম বেশি ত্রুটি দেখা যায়। আর দুর্নীতি করার সুযোগটাও বেশি তৈরি হয়। অনেক সময় ওই কাজ অসম্পূর্ণও থেকে যায়। যেহেতু গণপূর্ত বিভাগের হাতে প্রয়োজনীয় সময় ছিল তাই স্বার্থ হাসিলের জন্য এটা তাদের নিজেদের তৈরি সংকট বলে মন্তব্য করেন তারা।