বরিশালে ওএমএস কার্ডে প্রভাবশালীদের ভাগ

ঢাকা, শনিবার, ৬ জুন ২০২০ | ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

বরিশালে ওএমএস কার্ডে প্রভাবশালীদের ভাগ

হেলাল উদ্দিন, বরিশাল ১১:১৮ অপরাহ্ণ, মে ১১, ২০২০

print
বরিশালে ওএমএস কার্ডে প্রভাবশালীদের ভাগ

করোনা দুর্যোগে বরিশালে সরকারের বিশেষ বরাদ্দ ওএমএস’র কার্ড নিয়ে চলছে তেলেসমাতি কারবার। খাদ্য মন্ত্রণালয় এই কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার কঠোর নির্দেশনা দিলেও তা যেন বরিশালে পাত্তাই পাচ্ছে না বা দেওয়া হচ্ছে না। কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা সর্বাগ্রে থাকলেও ক্ষমতাসীনদের চাপাচাপিতে মাঠপর্যায়ে তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।

কোথাও কোথাও নিম্নবিত্তদের বিশেষ ওএমএস’র কার্ড স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ভাগাভাগি করে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বরিশাল সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ৩০টি ওয়ার্ডের ক্ষেত্রে এমনটি হওয়ার উদাহরণ রয়েছে। এতে করে দেশের ক্রান্তিলগ্নে সরকারের এই মানবিক উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দরিদ্র শ্রেণির মানুষ ওএমএস’র কার্ড বঞ্চিত হলেও ক্ষমতাসীন মহলের ভয়ে বিষয়টি নিয়ে কেউ মুখ খুলছেন না।

তবে এ নিয়ে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঝে মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় একাধিক কাউন্সিলর কার্ড প্রাপ্তির তালিকা পর্যন্ত জমা করা তো দূরের কথা উল্টো শাস্তি-খড়গের ভাবনায় নিজেকে রক্ষায় আড়াল করে রেখেছেন। আবার কোনো কোনো ওয়ার্ড কাউন্সিলর স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সুপারিশে সেই ভাগাভাগির তালিকা জমা করে পড়েছেন বিপাকে। বিতর্কিত ওই তালিকা নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কর্তা-ব্যক্তিরাও রয়েছেন দুশ্চিন্তায়। তথ্য মতে, করোনা মহামারিতে ‘লকডাউন’ বরিশাল সিটি করপোরেশনের ৩০টি ওয়ার্ডের কর্মহীন রিকশাচালক, ভ্যানচালক, অটোচালক, পরিবহন শ্রমিক, ভিক্ষুক, তৃতীয় লিঙ্গ (হিজড়া), ভবঘুরেসহ নিম্নবিত্তদের অনুকূলে বিশেষ ওএমএস কার্ড বরাদ্দ দিয়ে তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে গত ১২ এপ্রিল নির্দেশনা দেয় খাদ্য মন্ত্রণালয়। এই তালিকাকরণে স্ব স্ব ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের সক্ষমতা দিয়ে নির্ধারিত একটি সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হলে ওই সারিতে থাকাদের শনাক্তে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সিটি করপোরেশন মাঝপথে এই সংক্রান্ত একটি কমিটি করে দিয়ে কাউন্সিলরসহ আওয়ামী লীগ, যুব-ছাত্রলীগসহ অন্তত সাতজনকে সদস্য করে চিহ্নিতকরণে নির্দেশনা দেয়।

একাধিক কাউন্সিলর জানান, তালিকা প্রণয়ন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকলেও সিটি করপোরেশন কমিটি করে দেওয়ার পরে পুরো প্রক্রিয়াটি এলোমেলো হয়ে যায়। ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা দরিদ্র শ্রেণির মানুষ চিহ্নিতকরণের বিপরীতে কার্ড ভাগাভাগিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার পুরো দায় কাউন্সিলরকে বহন করতে হবে এ ধরনের কঠোর নির্দেশনায় একাধিক কাউন্সিলরের সঙ্গে কমিটির সদস্যদের মতবিরোধ দেখা দেয়। ফলে দায় এড়াতে অন্তত ১০ জনের বেশি কাউন্সিলর সময়সীমা হলেও তালিকা জমা করেনি। আবার অনেকে জমা করলেও নির্ধারিত সময় অতিক্রম করেছে। এ ছাড়া যেসব ওয়ার্ড কাউন্সিলর বিএনপিপন্থী তাদের এই ওএমএস কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তই করা হয়নি। ফলে সে ওয়ার্ডে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাই চালাচ্ছেন কার্ড বিতরণ কার্যক্রম। যা নিয়ে অস্বচ্ছতার অভিযোগের শেষ নেই। অথচ কার্ড বিতরণে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সরকার বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে বিস্তার অভিযোগ সত্ত্বের এই কমিটির কোনো হস্তক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কাউন্সিলর বলেন, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে প্রতিটি ওয়ার্ডে ৪০০ জনকে চিহ্নিতকরণে নির্দেশ দিলেও সিটি করপোরেশন তাদের মনপুত লোক অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়ায় যাচাই-বাছাই তো দূরের কথা, যে যার মতো করে ভাগ বসাতে চাইছেন। কোনো কোনো ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সভাপতি-সম্পাদক ১০০টি, যুব ও ছাত্রলীগ সভাপতি-সম্পাদক ৫০টি করে নিয়ে নিজেদের কাছের ব্যক্তি-বিশেষের মাঝে বিতরণ করছেন। ফলে সরকারের এই মানবিক উদ্যোগ থেকে বাদ পড়তে চলছেন প্রকৃত দরিদ্র শ্রেণির মানুষ।

ইতোমধ্যে নগরীর ১০, ১১, ১৫, ২৪ ও ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে প্রণয়নকৃত তালিকা নিয়ে দেখা দেয় তুমুল বিতর্ক। এই সব ওয়ার্ডসমূহের তালিকা থেকে প্রকৃত দরিদ্র মানুষ বাদ পড়ায় বিষয়টি নিয়ে স্ব স্ব এলাকার বঞ্চিত মানুষরা বিক্ষোভও করেছেন। এসব অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে বরিশাল জেলা বাসদ নেত্রী ডা. মণীষা চক্রবর্তী ওএমএস কার্ড বিতরণ সংক্রান্ত বরিশাল নগর কমিটি প্রধান বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দফতরে লিখিত অভিযোগ করেন এবং সুষ্ঠু তদন্ত চেয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান বলেন, বিষয়টি নিয়ে মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ’র সঙ্গে একাধিকবার কথা হয়েছে। সর্বশেষ যে অভিযোগ উঠেছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কার্ড বিতরণের পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

জানা গেছে, কার্ড বিতরণ নিয়ে ক্ষমতাসীন মহলের ভাগাভাগি তোড়জোড় দেখে নিজের দায় এড়াতে অনেক কাউন্সিলর এ দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে ১৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর লিয়াকত হোসেন খান লাবু নিজেকে সরিয়ে নেওয়ায় পরবর্তীতে দায়িত্ব পান সংরক্ষিত কাউন্সিলর ইসরাত জাহান লাভলী। এই নারী কাউন্সিলর রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সুপারিশসহ তালিকা জমা দেওয়ার পরে তা প্রকাশ পেলে শুরু হয় তোলপাড়। অনুরূপ বিতর্ক দেখা দেয় ১০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ টি এম শহীদুল্লাহ কবিরের তালিকা নিয়েও।

আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ পরবর্তীতে নিজেদের সুপারিশ বা মনোপুত ব্যক্তিকে তালিকায় স্থান দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করলেও কাউন্সিলররা বলছেন- রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে স্বচ্ছতা বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। একই ধরনের মন্তব্য করে ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর জিয়াউর রহমান বিপ্লবও এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে প্রকৃতরা বঞ্চিত হতে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে জানতে সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ’র মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।