রণক্ষেত্র বোরহানউদ্দিন

ঢাকা, রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

হ্যাকড ফেসবুকে ধর্মীয় উসকানি

রণক্ষেত্র বোরহানউদ্দিন

পুলিশের গুলিতে নিহত চার, বিজিবি মোতায়েন

ভোলা প্রতিনিধি ১০:৪১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০১৯

print
রণক্ষেত্র বোরহানউদ্দিন

ভোলার বোরহানউদ্দিনে ফেসবুক মেসেঞ্জারে কথোপকথনে ধর্ম অবমাননা হয়েছে- এমন অভিযোগ তুলে রোববার সকালে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে সমাবেশ থেকে জনতা ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

এ সময় উত্তেজিত জনতা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছোড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গুলি চালালে চারজন নিহত হন। নিহত চারজনকে নিজেদের কর্মী বলে দাবি তৌহিদী জনতার। সংঘর্ষে ১০ পুলিশ সদস্যসহ দেড় শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। ঘটনার পর সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিকে আনতে হেলিকপ্টারে চার প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়।

পুলিশ জানায়, যে ব্যক্তির ফেসবুক মেসেঞ্জারের কথোপকথন ঘিরে এ ঘটনা ঘটে, সেটি হ্যাকড হয়। কটূক্তিপূর্ণ কথোপকথনের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়ে তথ্য জানতে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে। হ্যাকের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে তিনজনকে আটক করা হয়েছে।

পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নিহত চারজন হলেন বোরহানউদ্দিন পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মাহফুজ (৪৫), বোরহানউদ্দিন উপজেলার মহিউদ্দিন পাটওয়ারীর ছেলে মাহবুব পাটওয়ারী (১৪), মনপুরা হাজিরহাট এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান (৪০) ও বোরহানউদ্দিনের মো. শাহিন। আহতদের মধ্যে বোরহানউদ্দিন হাসপাতালে শতাধিক ব্যক্তিকে, ভোলা সদর হাসপাতালে ৪০ জনকে এবং পাঁচজনকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ অক্টোবর মেসেঞ্জারের সেই কথোপকথনটি স্থানীয়ভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সেদিন বিকেলে সেই ব্যক্তি ভোলার বোরহানউদ্দিন থানায় যান এবং তার ফেসবুক আইডি হ্যাকড হতে পারে উল্লেখ করে সাধারণ ডায়েরি করেন। ভোলার পুলিশ সুপার জানান, ফেসবুক হ্যাকিংয়ের অভিযোগে ইতোমধ্যে তিনজনকে আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ফেসবুক হ্যাকিং সম্পর্কিত সব তথ্য আমরা হাতে পেয়েছি।’

তিনি বলেন, অভিযুক্তদের পুলিশি হেফাজতে রেখে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে প্রশাসন ও পুলিশ উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু, এরপরও একটি গোষ্ঠী বিষয়টি উস্কে দিতে থাকে।

বরিশাল রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি একেএম এহসানুল্লাহ বলেন, ‘১৯ অক্টোবর রাতে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তারা স্থানীয় ইমাম ও ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে। কিন্তু, আজ (রোববার) সকালে একদল ব্যক্তি মঞ্চ বানিয়ে সেখানে ১৭টি লাউডস্পিকার বসায়। তাদের একটি অংশ পরে সহিংস হয়ে ওঠে।’

তিনি জানান, খুব দ্রুত সেখানে ৩০-৪০ হাজার লোক সমবেত হন। পুলিশ তাদের শান্ত হতে বললে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছুড়তে শুরু করে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ কাছাকাছি একটি রুমে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। তারা সেই রুমের দরজা আংশিকভাবে ভেঙে ফেললেও পুরোপুরি ভাঙতে পারেনি। তার দাবি, আমরা বিছানার ম্যাট্রেস দিয়ে নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করেছি। রুমে ঢুকতে পারলে তারা আমাকে, এসপি ও ইউএনওকে মেরে ফেলত। ইউএনও পরে পরিস্থিতি নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি তখন গুলি ছুড়তে ছুড়তে বের হয়ে আসতে বলেন। গুলি করা ছাড়া আমাদের আর কোনো সুযোগই ছিল না।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে অভিযুক্তের বিচার দাবিতে গতকাল ঈদগাহ মাঠে বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে তৌহিদী জনতা। পুলিশের অনুমতি না নিয়েই এ সমাবেশের জন্য মাইকিং করে লোক জমায়েত শুরু করে তারা। সকাল ৯টা থেকে লোকজন মাঠে জড়ো হতে থাকে। মিছিল করতে না পেরে সেখানেই অবস্থান শুরু করে তারা। পরে পুলিশ ‘বাটামারা পীর সাহেব’ মাওলানা মহিবুল্লাহকে সেখান থেকে সরে যাওয়ার অনুরোধ করে এবং তাকে ঈদগাহ জামে মসজিদের দোতলায় নিয়ে যায়। ওই সময় গুঞ্জন ওঠে, মাওলানা মহিবুল্লাহকে পুলিশ আটক করেছে।

এ নিয়ে সেখানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে কিছু লোক পুলিশের প্রতি সহিংস আচরণ শুরু করে। ইট-পাটকেল ছুড়তে শুরু করে। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে মসজিদের ইমামের কক্ষে আশ্রয় নেয়। উত্তেজিত জনতা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। পরে পুলিশ গুলি ছোড়ে।

বোরহানউদ্দিন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মু. এনামুল হক জানিয়েছেন, শুক্রবার রাতে যার ফেসবুক মেসেঞ্জার থেকে কথোপকথনের স্ক্রিনশট ছড়িয়েছে, তিনি নিজের ইচ্ছায় থানায় আসেন। তিনি এখন পুলিশের হেফাজতে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঘটনা সত্য প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।