‘রিফাত হত্যা পরিকল্পনায় মিন্নি সরাসরি সম্পৃক্ত’

ঢাকা, শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯ | ৯ ভাদ্র ১৪২৬

‘রিফাত হত্যা পরিকল্পনায় মিন্নি সরাসরি সম্পৃক্ত’

বরগুনা প্রতিনিধি ২:০৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৮, ২০১৯

print
‘রিফাত হত্যা পরিকল্পনায় মিন্নি সরাসরি সম্পৃক্ত’

রিফাত শরীফকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় প্রধান সাক্ষী ও নিহত রিফাতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি রিফাত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন। বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন।

পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন বলেন, মঙ্গলবার দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ ও বুধবার মিন্নির রিমান্ড মঞ্জুরের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে রয়েছে মিন্নি। ইতোমধ্যেই মিন্নি রিফাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। এ হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গেও মিন্নি যুক্ত ছিলেন।

এছাড়াও বুধবার বিকালে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল আদালতে মিন্নিকে হাজির করা হয়। এ সময় এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির আদালতকে বলেন, রিফাত শরীফকে হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর ঘটনায় তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা ওরফে মিন্নি জড়িত ছিলেন। তিনি হত্যা পরিকল্পনায়ও অংশ নেন। হত্যাকাণ্ডের আগের দিন তিনি নয়ন বন্ডের বাড়িতে গিয়ে এ হত্যার নীলনকশায় অংশ নেন। রিফাত শরীফ হত্যার ঘটনায় মূল নায়ক নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীর সঙ্গে মিন্নি পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটান।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বরগুনা জেলা পুলিশের এক সদস্য জানান, মূলত রিফাতকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল না। তাকে মারধর করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু দুর্ঘটনাবশত নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীর ধারালো অস্ত্রের আঘাতে রিফাত শরীফের মৃত্যু হয়।

বরগুনা জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হওয়ার দু’দিন আগে হেলাল নামে এক ছেলের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় রিফাত শরীফ। হেলাল রিফাত শরীফের বন্ধু হলেও নয়ন বন্ডের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। সেই মোবাইল ফোন উদ্ধারের জন্য নয়ন বন্ড মিন্নির দারস্থ হয়।

পরে মোবাইলটি উদ্ধার করে মিন্নি। কিন্তু সে সময় রিফাত শরীফের মারধরের শিকার হন মিন্নি। পরে হত্যাকাণ্ডের আগের দিন মঙ্গলবার নয়নের সঙ্গে দেখা করে মিন্নি সেই মোবাইল নয়নের হাতে তুলে দেন।

এ সময় মিন্নি তার স্বামী রিফাত শরীফের হাতে যে মারধরের শিকার হয়েছেন তার প্রতিশোধ নিতে নয়নকে রিফাত শরীফকে মারধর করতে বলেন। তবে মারধরের সময় নয়ন যাতে উপস্থিত না থাকেন, সেটাও মিন্নি নয়নকে বলে দেন।

গতকাল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির জানান, হত্যাকাণ্ডের আগের দিন প্রধান আসামি নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির ফোনালাপের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব বিষয় নিশ্চিত হতে এবং মামলাটির অধিকতর তদন্তের জন্য মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। এজন্য সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করার আবেদন জানান তিনি। পরে আদালতের বিচারক মো. সিরাজুল ইসলাম গাজী মিন্নির পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এদিকে শাহ নেয়াজ রিফাত শরীফকে (২৫) কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তৃতীয় আসামি রিশান ফারাজীকেও গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. শাহজাহান হোসেনের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্তের স্বার্থে রিশানকে কোথা থেকে গ্রেফতার করা হলো তা জানায়নি পুলিশ।

রিশান বরগুনা পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের ধানসিঁড়ি রোডের দুলাল ফরাজীর ছেলে এবং ওই মামলার দ্বিতীয় আসামি রিফাত ফরাজীর ছোট ভাই।

এ ঘটনায় পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন বলেন, ‘আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী মিন্নিসহ এখন পর্যন্ত ১৫ জন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এছাড়াও মামলার প্রধান অভিযুক্ত নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন।’

গ্রেফতারদের মধ্যে ১০ জন রিফাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এছাড়াও এ মামলার চারজন অভিযুক্ত রিমান্ডে রয়েছেন। রিশান ফরাজীকে আজ আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করা হবে বলেও জানান তিনি।

এদিকে রিফাত শরীফকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেফতারের পর ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বুধবার (১৭ জুলাই) বিকেলে বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতের বিচারক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম গাজী এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রিফাত হত্যা মামলার মূল রহস্য উদঘাটন ও সুষ্ঠু তদন্তের জন্য গত মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) সকাল ১০টার দিকে মিন্নিকে তার সদর উপজেলার দক্ষিণ মাইঠা এলাকার বাড়ি থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ নিয়ে যায়। রাত ৯টার দিকে তাকে গ্রেফতার দেখায়।

সেদিন রাত সোয়া ৯টায় সংক্ষিপ্ত এক সংবাদ সম্মেলনে বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন জানান, দিনব্যাপী জিজ্ঞাসাবাদ শেষে এবং এর আগেও দীর্ঘ সময় ধরে প্রাপ্ত তথ্যাদি পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মিন্নির সংশ্লিষ্টতা প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। তাই মামলার মূল রহস্য উদঘাটন এবং সুষ্ঠু তদন্তের জন্য আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেফতার করা হয়।

প্রসঙ্গত, রগুনা সরকারি কলেজের পাশে গত ২৬ জুন (বুধবার) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত লোকের উপস্থিতিতে স্ত্রীর সামনে শাহ নেয়াজ রিফাত শরীফকে (২৫) কুপিয়ে গুরুতর জখম করে ফেলে রেখে চলে যায়।

পরে স্থানীয় লোকজন রিফাত শরীফকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে রিফাত শরীফের মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় বরগুনার পুরাকাটা এলাকায় গত ২ জুলাই ভোররাতে বন্দুকযুদ্ধে এ মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড নিহত হয়।

নিহত নয়ন বন্ড বরগুনা পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের পশ্চিম কলেজ রোড এলাকার মৃত মো. আবুবক্কর সিদ্দিকের ছেলে এবং রিফাত শরীফ হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি ছিলেন।