শিকলবন্দি আলমগীর

ঢাকা, শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২ | ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

শিকলবন্দি আলমগীর

গিয়াস উদ্দিন মিয়া, গৌরনদী (বরিশাল)
🕐 ৭:২৩ অপরাহ্ণ, মে ২৭, ২০২২

শিকলবন্দি আলমগীর

মানবতাসংজ্ঞায়ীত হয় মানুষ হওয়ার গুণ দিয়ে, মানুষ প্রকৃতির সুনির্দিষ্ট একটিবস্তু। যে কারণে মানুষ অন্য প্রাণীদের থেকে একটু আলাদা। সেই মনুষ্যত্বর সামনে, আটফুট লোহার শিকলে শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত জঙ্গলে বন্দি গৌরনদী উপজেলার শরীফাবাদ গ্রামের আলমগীর পাইক। অর্ধাহারে অনাহারে ঝড়, বৃষ্টি এমনকি প্রচন্ডশীতেও তাকে জঙ্গলের একটি গাব গাছের সাথে কয়েক টুকরা পলিথিনের মধ্যে কাটাতে হয়। দীর্ঘ ৫০ বছরের নির্দয় বসতি আলমগীরপাইকের। তার একটাই অপরাধ সে পাগল!

এলাকাবাসীর দাবি, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর কাছে মো. আলমগীর পাইকে শিকল থেকে মুক্ত করে সুচিকিৎসা দেয়ার। রুপকথার গল্পকেও হার মানানো এই আলমগীর পাইক উপজেলার প্রত্যন্ত শরীফাবাদ গ্রামের মৃত আবদুর রবপাইকের পুত্র। ৬ ভাই ১ বোনের সংসারে আলমগীর পাইক তৃতীয়।

কোন জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় তার সঠিক বয়স জানা যায়নি। তবে স্বাধীনতা সংগ্রামের বছর আলমগীর পাইক স্থানীয় মাহিলাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণীর মেধাবী ছাত্র ছিলেন। এবং ওই বছরই ঘুমের মধ্যে কোন খারাপ সপ্ন দেখে খুব কান্নাকাটিকরার পর থেকে অস্বাভাবিক আচরন করতে থাকে। এর ৬ মাস পর থেকে ইশিকল বন্ধী জীবন আলমগীর পাইকের।

অনেক বড়সংসারে জন্ম নিয়েও আলমগীর পাইক এখন বড় অসহায়। যেই বাড়িতে জন্মেছেন সেই বাড়ির পাশের একটি বাগানের মধ্যে গাব গাছের সাথে লোহার শিকল দিয়ে বেধে রাখা হয়েছে তাকে। খাওয়া দাওয়া গোসল প্রকৃতির সব কাজ আট ফুট লোহার শিকলেবন্ধী থেকেই করতে হয়। তাকে দেকভাল করারমত কেউ নাই। আলমগীর পাইকের বড়ভাইয়ের দরিদ্র বিধবাস্ত্রী মুকুল বেগম (৬৫) কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করেন।

২০ বছর আগে আলমগীরের বাবা মারা যান। ৭ বছর আগে মাও মারা গেছেন। এর পর থেকে তার বড় ভাইর বিধবা স্ত্রী ওনাকে দেখভাল করেন। কিছ ুখাবার দেন, সেও অতি দরিদ্র এবং বৃদ্ধ হয়ে গেছে।

আলমগীর পাইকের অন্য জীবিতভাই বোন দেশের বিভিন্নএলাকায় ভালো থাকলেও,আলমগীর পাইকের খবর নেয়না কেউ। গত বছর একজন এলাকাবাসী আলমগীর পাইকের এ করুন অবস্থা দেখে একটিতাবুকিনে দিয়েছেন। তার শরীরে এখন বিভিন্ন রোগ দেখা দিয়েছে।

ওই বাড়ির গৃহবধু আমেনা বেগম (৪৫) বলেন, আমি আজ ত্রিশ বছর এই বাড়িতে বউ হয়ে আসার পর থেকে আলমগীর পাইককে এ ভাবেই শিকলবন্ধী দেখী। আমরা শুনেছি, ভয়ঙ্কর কিছুসপ্নে দেখার পর থেকে সে পাগল হয়ে গেছেন।

প্রতিবেশী এবং আলমগীরের নিকট আত্মীয় হালিমা বেগম (৬০) জানান, স্বাধীনতা যুদ্ধেরবছর থেকেই এই অবস্থা। মাঝে মধ্যে আলমগীরকে ছেড়ে দেয়া হলে গ্রামের বিভিন্ন জনকে মারধরকরত, এমনকি অনেক বাড়িতে ঢুকে ভাংচুরও করত। যে কারনে শিকল দিয়ে বেধে রাখা হয়েছে। এহনতবুড়া হয়ে গেছে। আমরা কি করমু মাঝে মধ্যে আসি দেখে যাই, খারাপলাগে কিন্ত আমাগো কিছু করার নাই।

বর্তমানে আলমগীর পাইককে দেখভাল করা তার বড় ভাইর বিধবাস্ত্রী মুকুল বেগম (৬৫) জানান, মানবিক কারণে আমরা তাকে খাওয়ার ব্যবস্থা করি। তার বাবা মা থাকতে তারাই দেখভাল করছেন। ওনার বাবা মা মারা যাওয়ার পর আমার সাদ্য অনুযায়ী চেষ্টা করছি। আমি সরকারের কাছে আলমগীরের চিকিৎসার জন্য সাহায্য চাই।

স্থানীয় ব্যবসায়ী সরদার বাবুল (৫৪) জানান,আমি ছোট বেলা থেকেই আলমগীর পাইকে এভাবে শিকলবন্ধী দেখে আসছি। আসলে শুরু থেকেই আলমগীরেরভ ালো কোন চিকিৎসা হয় নাই। আলমগীর পাইক মাঝে মধ্যে কাছে আসলে বলে আমা রশিকলটা খুলে দেও। আমাকে চিকিৎসা দেও। বর্তমানে ওনাকে সুচিকিৎসা দিলে, সুস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন। আমরা স্থানীয় সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর কাছে আলমগীরকে মুক্ত করাসহ তার সুচিকিৎসার জোড় দাবি জানাচ্ছি।

গৌরনদী উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা সুশান্ত কুমার বালা বলেন, বিষয়টি আমাকে কেউ জানায়নি। আমি লোক পাঠিয়ে খবর নিব এবং বিষয়টি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকেও জানাবো।

 
Electronic Paper