কোকিলা যখন লেখক

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২২ | ১২ মাঘ ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

কোকিলা যখন লেখক

মনিরা পারভীন
🕐 ২:৫৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৩০, ২০২১

কোকিলা যখন লেখক

কোকিলা এখন লেখক হয়েছে বোধহয়। যদিও সে নিজেকে লেখকের কাতারে ফেলতে লজ্জা বোধ করে। কারণ সে ভালো করেই জানে দুই কলম লিখে আর দুই-চারটা লেখা পত্রিকায় প্রকাশ পেলেই লেখক হওয়া যায় না। তবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে তার কর্মস্থলে হৈচৈ পড়ে গেছে। অনেকেই দেখা হলে বলে ওঠে, কী ব্যাপার কবি!

কেউ বিদ্রুপ করেই বলে, এখন বড় কবি হয়েছেন। আমাদের কী আর চিনবেন!

কোকিলা খুব বিনয়ের সঙ্গেই উত্তর দেয়, না ভাই। কবি হওয়া তো সহজ নয়। লিখি কিছু সখের বশে।

দিন দিন কোকিলার পরিচিতি বাড়তে থাকে। অনেকেই তাকে ইতিবাচক মন্তব্য করেন। উৎসাহ দিয়ে থাকেন। নিজ শহরে তাকে নিয়ে মিটিং সিটিং হয়। আড্ডায় উঠে আসে তার নাম। কেউ করে হাসাহাসি কেউ আবার কাশাকাশি। কেউ বলে, লিখুক না একটু। এগিয়ে যাক ভাই। প্রতিভা তো কেউ কেড়ে নিতে পারে না। কেন এভাবে বলছেন?
এ কথা কেউ বললেই সে বেচারাকে শুনতে হয়, কী ভাই, কুছ কুছ হোতা হ্যায় নাকি?
কেউ বলে ওঠে, মেয়েমানুষ পেলে তো আপনারা আবার আকাশে তোলেন।
কেউ কথার জবাব দিয়ে থাকেন, ভাইরে আপনিও কি ছেলে নন? আপনেও তো কম জানেন না। বিষয়টি এমন যার বিয়ে তার খবর নেই পাড়াপড়শির ঘুম নেই।
কোকিলা জানেও না তাকে নিয়ে ভাবার সময় আছে মানুষের। সময় তো বড় মূল্যবান। মানুষ যেখানে সময় পায় না নিজের জন্য ভাবার সেখানে তাকে নিয়ে এত সময় যাদের হয় তারা সত্যি ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। কোকিলার জন্য দুই তিন ঘণ্টা কেউ ব্যয় করছে তার মানে সে কিছু তো বটেই।
কোকিলার কবিতা পড়ে নতুন নতুন কবির পাখা গজিয়েছে। তারা চিপে চিপে একটা কবিতা হলেও কোকিলার কাছে নিয়ে আসেন। কোকিলা তাদের উৎসাহ দেন। কবিতা যে এমন সহজ বিষয় নয় তা বলার দুঃসাহস তার নেই। তবে তাদের কবি হওয়ার বাসনা ক্বচিৎ থাকলেও মুখ্য বিষয় তা নয়। তারা জানতে চান কোকিলা কীসের টানে ছুটছে এই পথে। অতি উৎসাহী সহকর্মীদের একজন সেদিন বলে বসলেন, কোকিলা শোনেন, একটা কবিতা লিখেছি। পত্রিকায় দিতে চাই। কোন পত্রিকায় আপনি দেন? কীভাবে পাঠান? আমার কবিতা ছাপাব। কত টাকা লাগে আপনার?
কোকিলার মুখ অমাবস্যার চাঁদ হয়ে গেল। কারণ দুই দিন আগে আরেকজন কলিগ প্রশ্ন করেছিলেন, কত টাকা পান এসব লিখে? কোকিলা বলেছিল, টাকার জন্য কি লেখে মানুষ?
তারা উত্তরে বললেন, তাহলে এসব ছাইপাশ লিখে সময় নষ্ট করে কী হবে?
কোকিলা মৃদু হেসেছিল মাত্র। আরেকজন একদিন জানতে চাইলেন, কোকিলার বই বিক্রি কেমন হচ্ছে? কত টাকা সে পায়। কেমন লাভ হয়? কোকিলার বলতে ইচ্ছে করছিল, ভাই আপনাকেও তো বই এমনি দিয়েছি। মূল্য তো দেননি। আজকাল এক শত টাকা খরচ করেও কি কেউ বই কিনতে চায়? কোকিলা জেগে জেগে ঘুমায়। কারণ উলুবনে মুক্তো ছড়িয়ে লাভ নেই। তাদের সম্পর্কে কোকিলা খুব ভালো করেই অবগত। কোকিলার উপস্থিতিতে তাকে লক্ষ্য করেই গল্প বলা হয়। যেন কোকিলা তীর প্রাকটিসের মোক্ষম ক্ষেত্র। তার অনুপস্থিতিতে রসালো গল্পের চমচম খেতে তারা বড়ই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। প্রতিদিন তাদের মূল্যবান সময় কোকিলার জন্য বরাদ্দ থাকে। কোকিলা কী খাচ্ছে, কীভাবে চলছে, কী বলছে, কী তার হওয়া উচিত, কী নয় ইত্যাদি ইত্যাদি। যত বাক্য ব্যয় এতদিন তারা করেছে তাতে কয়েকটা উপন্যাস অনায়াসে হয়ে যেত।
তবে কোকিলাকে নিয়ে এখানেই উৎসাহের শেষ নেই। ঈর্ষাতে জ্বলে যারা তাদের অনেকের প্রমাণ ভালো মেলে ফেসবুকে। কোকিলাকে কে কী কমেন্ট করে, কোকিলা কাদের কমেন্ট করে, কমেন্টে কী লেখা হচ্ছে এ নিয়ে গবেষণা চলে সর্বক্ষেত্রেই। কোকিলার নিজের ছবি পোস্ট দিলে লাইক কমেন্টের ঝড় ওঠে। ঠিক তারা এড়িয়ে যান যখন কোনো লেখা পত্রিকায় আসে আর তা পোস্ট দেওয়া হয়। কিন্তু যদি কোথাও একটা কোনো ভুল করেছেন তো মরেছেন। তারা সমালোচনার ঝড় তুলবে। এমন করে কমেন্ট করবে যেন কোকিলা উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। বানান ভুল মানেই অশুদ্ধ প্রতিভা। যা লিখেছে তার ইতিবাচক কোনো দিক তাদের সুন্দর পটলচেরা চোখে পড়ে না। মন্তব্য শুনে মনে হয় তারা দেশবিখ্যাত লেখকের কাতারে দাঁড়িয়ে আছেন। অথচ জীবন শেষের পথে দাঁড়িয়ে অর্জনের ঝোলার তলাটাই পূর্ণ হয়নি বোধহয়। আবার যাদের কোনোদিন পোস্টে একটা লাইক দিতেও দেখেনি তারা যে দেখেও চুপ থাকে তার প্রমাণ মেলে যখন নেতিবাচক মন্তব্য করে নিজেদের মূল্য বাড়াতে চান। সমালোচনা করার ন্যূনতম জ্ঞান তাদের মধ্যে নেই এটা বোঝার জ্ঞানও তাদের নেই। কোকিলা তবু তাদের ধন্যবাদ জানাতে ভুল করে না। কোকিলা জানে, যারা সত্যিকার লেখক তারা কাউকে ছোট করতে বা একটা ভুল ধরিয়ে দিতেই ব্যস্ত থাকেন না। তারা সম্ভব হলে সঠিক পথ দেখাতেই সাহায্য করে থাকেন। আর তাদের প্রকাশভঙ্গি ঈর্ষান্বিত তথাকথিত কবিদের মতো নয়। তাদের অমায়িক ব্যবহার, বাচনভঙ্গি অন্যদের থেকে করেছে অনন্য। তারা তাদের নিজ গুণেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন।
অবশ্য এ নিয়ে লেখক মহলে একদিন কথা উঠেছিল। একজন লেখক বললেন, আমার কাজ লেখা। বানান সংশোধন করা নয়। পত্রিকার প্রুফ রিডার আছেন কী জন্য?
একজন বললেন, ভাই ঠিক আছে তবে আমাদেরও সচেতন থাকতে হবে।
আরেকজন বললেন, ভাই সিøপ হতেই পারে। যারা সাদা কাগজে থাকা একটা কালো বিন্দু দেখে তারা পুরো সাদা কাগজের বিশালতা কখনো বুঝবে না। চায়ের আড্ডায় এমন ঝড় প্রায়শই ওঠে। একদিন বন্ধুত্বের আড্ডায় কোকিলার আগমন দেখে অনেকের মুখ পেঁচার মতো হলো। একজন বলে উঠল, আমাদের কবিবন্ধু এসেছেন। শোন কোকিলা, আমি তোর লেখার ভক্ত। এ কথা শুনে আশপাশের কারও কারও মগজ টগবগ করতে লাগল। মনে মনে কেউ বলল, ওই সব আমরাও পারি। লিখি না তাই। কেউ কেউ এসব না শোনার ভান করে প্রসঙ্গ পাল্টে দিল সুকৌশলে। আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকেও মুক্তি নেই। ফেসবুকে পোস্ট দেখে তার প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে সাক্ষাৎ হলেই খোলস খুলে আসে। বলে ওঠে, কী রে তোর নাকি পত্রিকায় লেখা, ছবি ছাপা হয়? কেউ বলে, বিশ্বকবির খেতাব পাবে বোধহয়। এ কথা সে কথা নিয়ে অনেক হাসাহাসি করে তারা। কোকিলার বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না। যাদের কাছে টাকা, গাড়ি, বাড়ি সোনা মূল্যবান তাদের কাছে কাগজ আর কালি চানাচুর বিক্রেতার ঠোঙ্গা ছাড়া কিছু নয়।
খুব সহজ করে কোকিলা তখন বলে, দোয়া কর সবাই। আত্মীয়স্বজন একসঙ্গে হওয়া মানে স্টার জলসা শুরু। নয়ত জি বাংলার সিরিয়াল। কোকিলার এসব সময় নেই। মূলত রুচি নেই। তার চিন্তাভাবনা পাগলামি বলে অনেকে উপহাস করলেও সে জানে কোনো অন্যায় সে করছে না। তারা কলমের শক্তি জানে না তবে কথার খোঁচা ভালো রপ্ত করেছে। এভাবে নানা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে লেখা অব্যাহত আছে কোকিলার। সে উপভোগ করছে সবকিছু। যেন চারপাশ হয়ে উঠছে লেখার উপকরণ!

 
Electronic Paper