ভাগ্নিজামাই

ঢাকা, রবিবার, ২৯ মে ২০২২ | ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

ভাগ্নিজামাই

আবুল কালাম আজাদ
🕐 ৮:৫২ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ০৯, ২০২১

ভাগ্নিজামাই

সকালে অফিসের জন্য বের হচ্ছি। বউ বলল, শোনো, ছোটমামাকে ফোন করে একটু বাসায় আসতে বলবে তো।

: এ কথা তুমিই তো বলতে পারো।
: ছোটমামা আমার কথাকে ঠিক গুরুত্বের সাথে নেয় না। তুমি বললে গুরুত্বের সাথে নেবে। শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে জামাইদের ওজন বেশি।
: কী যে বলো!
: আর তুমি তো একটু অন্যরকম। তুমি মামাশ্বশুর, মামাশাশুড়ি, চাচাশ্বশুর, চাচাশাশুড়ি এদের সাথে কথা বলতেই চাও না। তোমার একটা ফোন পেলে তারা কত খুশি হয়!
: আচ্ছা, ফোন করব। সমস্যা হলো, ছোটমামার যেমন শতেক রকম ব্যবসা তেমন শতেক রকম ফোন নম্বর। আজ যে নম্বরে ফোন করলাম, কাল সে নম্বর বন্ধ।
: ফোন করতে বলেছি আর শুরু হয়ে গেল তোমার বক্তৃতা।
বউ একটা কাগজে আমার মামাশ্বশুরের নম্বর লিখে দিল। কাগজটা বুক পকেটে রেখে অফিসের জন্য বের হয়ে গেলাম।
ছুটির পর অফিস থেকে বের হয়ে মনে হলো, এত তাড়াতাড়ি বাসায় গিয়ে কাজ নেই। সন্ধ্যার চা-নাস্তাটা সেরে যাই। আমাদের অফিসের অপজিটে ছোট একটা রেস্টুরেন্ট আছে। চা-কফি পাওয়া যায়। এছাড়া শিঙাড়া, সমুচা আর লুচি থাকে বিকালে। এখানকার লুচিটা আমার কাছে তুলনাহীন লাগে। এমন পেটফোলা লুচি আর কোথাও দেখিনি। চাইলে লুচির পেটের ভিতর ডিম ভেঙে ঢুকিয়ে দেয়। স্বাদই আলাদা।
রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসলাম। দুটো লুচি অর্ডার করলাম। ওয়েটার বলল : স্যার, ডিম ঢুকিয়ে দেব?
: দাও। শোনো, ডিম ভেঙে পেঁয়াজ আর মরিচ দিয়ে ভালো করে গুলিয়ে নেবে। তারপর দুটি ডিমের পেটের ভিতর ফিফটি ফিফটি চালান করে দেবে।
: জি স্যার।
লুচির জন্য অপেক্ষা করছি তখনই মনে পড়ল মামাশ্বশুরকে কল করা হয়নি। বাসায় ফিরলে বউ জিজ্ঞেস করলে যদি বলি, ভুলে গেছি, নিশ্চিত ঝগড়া শুরু করে দেবে। মেয়েরা নিজের আত্মীয়স্বজনের বিষয় নিয়ে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে মজা পায় খুব।
পকেট থেকে কাগজটা বের করে নম্বর টিপলাম। কল ঢুকে গেল। রিসিভ হলো। আমি বললাম : মামা, আমি আপনার ভাগ্নিজামাই।
: ও বাবা, ভুলেই গেছিলাম। এখনই দশ হাজার টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছি। এখনই দিচ্ছি।
ফোন কেটে গেল। একটু পরেই আমার নম্বরে দশ হাজার টাকা চলে এলো। কী আশ্চর্য! তার কাছে টাকা কে চেয়েছে? টাকা পেয়ে বসে থাকলে হবে না। তাকে বাসায় আসার দাওয়াত দিতে হবে। না হলে বউ মুখ ঝামটা দিয়ে বলবে : ও টাকা নিতে খুব ভালো লাগছে, কিন্তু দাওয়াতটা দিতে পারলে না। কত্ত দিন ছোটমামা আমার বাসায় আসে না !
আমি আবার ফোন করলাম। বললাম : মামা...!
: বাবা, টাকা তো পাঠিয়েছি। এটা তোমার বিকাশ নম্বর না?
: জি মামা, মামা...।
: আরও লাগবে? ঠিক আছে, কাল সকালে আমি আরও দশ হাজার পাঠিয়ে দেব।
ফোন কেটে গেল। কী আশ্চর্য লোক! কথা বললেই টাকা পাঠাতে চায়। দাওয়াত তো দিতে পারলাম না। আবার ফোন করলে হয়তো আরও দশ হাজার দিতে চাইবে। আসলে ব্যবসায়ীদের সাথে সামাজিক আলাপ কঠিন। এরা হলো টাকার পোকা। এদের মাথার মধ্যে টাকা ছাড়া আর কিছু থাকে না। লুচি এলো। এক টুকরা লুচি মুখে দিলাম। কী স্বাদ! তৃপ্তিতে চোখ বুজে এলো। একটু আগে একেবারেই অনাকাক্সিক্ষতভাবে ফোনে দশ হাজার টাকা এসেছে। মামাশ্বশুর দিয়েছে। নিশ্চয়ই ফেরত দিতে হবে না। মেঘ না চাইতেই আষাঢ়ের ঢল। হয়তো এ কারণেই লুচি বেশি স্বাদ লাগছে। বউয়ের দেওয়া টুকরো কাগজটা সামনেই একটা গ্লাসের নিচে নামানো ছিল। লুচি খেতে খেতে মোবাইল টিপছিলাম। টেপার মতো একটা জিনিস পেয়েছে বিশ্ববাসী। টিপতে টিপতে মামাশ্বশুরের নম্বরে চোখ আটকে গেল। কাগজের নম্বরটাও দেখলাম। শেষ ডিজিট ভুল হয়েছে! ৭ এর জায়গায় ৮ টিপেছি। কার মামাশ্বশুরের কাছে ফোন চলে গেল? কার মামাশ্বশুর আমাকে দশ হাজার টাকা পাঠাল? লুচি খাওয়ার স্বাদ মরে গেল।
ডিজিট ঠিক করে আবার ফোন করলাম। এবার আমার মামাশ্বশুর ফোন রিসিভ করল। বললাম : সøামালিকুম মামা, আমি আপনার ভাগ্নিজামাই।
: কেমন আছ বাবা? তুমি তো ফোন-টোন করোই না। সরকারি চাকরি করো। সরকারি চাকরি মানে সারা জীবনই অবসর। অথচ একটা ফোন করার টাইম পাও না।
: মামা, আপনার নম্বর তো প্রতিদিনই চেঞ্জ হয়।
: প্রতিদিন নম্বর চেঞ্জ হবে কেন? মাঝে মাঝে চেঞ্জ হয়। ব্যবসা করলে মাঝে মাঝে নম্বর চেঞ্জ করতে হয়। তা বাবা, আমার মা জননী কেমন আছে?
: ভালো আছে। আপনাকে বাসায় আসতে বলছিল।
: আসব। সময় বের করার চেষ্টা করতেছি।
: মামা, ব্যবসা আর বাড়ায়েন না। আপনার অবস্থা দেখে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে চায়।
: আরে ব্যবসা তো বাড়াতে চাই না। বেড়ে যায়।
: তাহলে কবে আসবেন মামা?
: দেখি...।
মামাশ্বশুরের সঙ্গে তো কথা বললাম। এখন এই দশ হাজার টাকার কী করব? কাল সকালে হয়তো আরও দশ হাজার পাঠাবে। আবার ফোন করলে আরও দশ হাজার পাঠাতে চাইবে। এই লোক যদি আমার মামাশ্বশুর হতো কী যে ভালো হতো। আমার মামাশ্বশুর! এত্তগুলা কথা বললাম, একবার একটা টাকা দেওয়ার কথা মুখে আনল না। চিন্তায় পড়ে গেলাম। লুচি পাশে ঠেলে দিয়ে চুপচাপ বসে রইলাম। ওয়েটার এলো চা নিয়ে। বলল : স্যার, লুচি কি ভালো হয় নাই?
: ভালো হয়েছে।
: তাহলে?
: আগে চা খেয়ে নিই।
চা খাচ্ছি। পেছনে কে যেন কথা বলছে : কী বলছেন মামা? আপনে দশ হাজার টাকা পাঠিয়েছেন? কখন? আশ্চর্য! একটু আগে আমি কি আপনাকে ফোন করেছি? আমি আপনাকে এখন ফোন করলাম। আরে না মামা, দুইবার ফোন করার প্রশ্নই আসে না। মামা, আপনার ফোন থেকে টাকা আসবে আর আমি তা অস্বীকার করব? ভাগ্নিজামাই সম্পর্কে আপনার এই ধারণা? মামা, আপনি কোন নম্বরে টাকা পাঠিয়েছেন একটু ভালো করে চেক করে দেখুন। মনে হয়, কিছু একটা ভুল হচ্ছে।
পেছনে তাকালাম। দেখি আমারই বয়সী এক লোক। বললাম : ভাই সাহেব, যদি কিছু মনে না করেন, সমস্যাটা কী বলবেন?
: আমার মামাশ্বশুর বলতেছেন একটু আগে আমাকে দশ হাজার টাকা পাঠিয়েছেন।
আমি হাঁফ ছাড়লাম। বিরাট সমস্যায় পড়েছিলাম। দেখি সমাধান আমার পেছনের বেঞ্চে বসে আছে। বললাম : ভাই সাহেব, আপনার মামাশ্বশুরের নম্বরটা একটু দেখাবেন?
লোকটা নম্বর দেখাল। দেখলাম সেই নম্বর থেকেই আমার কাছে দশ হাজার টাকা এসেছে। তাকে আমার মামাশ্বশুরের নম্বর দেখালাম। তারপর বৃত্তান্ত বললাম। দুজনই খুব হাসলাম। তারপর আরও চারটা লুচি অর্ডার করে দুজন একসঙ্গে খেলাম। সে তার মামাশ্বশুরকে আমার নম্বর দিয়ে বলল : মামা, এই নম্বরে টাকা পাঠিয়েছিলেন? ওপার থেকে ইতিবাচক জবাব এলো। সে বলল : ঠিক আছে মামা, আমি টাকাটা পেয়েছি। তবে এই নম্বরে আর কখনো টাকা পাঠাবেন না। সে আরেকজনের ভাগ্নিজামাই।
আমি তার বিকাশ নম্বরে দশ হাজার টাকা পাঠিয়ে দিলাম। আমার অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্সে একশ’ টাকা রইল। মনটা একটু খারাপ হলো। কিন্তু নিজেকে খুব হালকা লাগল।

 
Electronic Paper