হাই+লোন= বড় ঋণ

ঢাকা, সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

হাই+লোন= বড় ঋণ

স্বপন শর্মা
🕐 ৪:৪৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৫, ২০২১

হাই+লোন= বড় ঋণ

ক্ষুদ্রঋণের টাকায় হাইলোন কিনেছিলাম। অনেকদিন হলো। স্বাবলম্বী হয়েছি কি না সন্দেহ আছে আমার নিজের। প্রশ্ন আসতে পারে হাইলোন কী? হাই মানে উঁচু বা বড় এবং লোন মানে হচ্ছে ঋণ এটা হলো পুঁথিগত অর্থ, তাহলে বুঝতেই পারছেন ক্ষুদ্রঋণের টাকায় আমি বড় ঋণ কিনেছি, না তা নয়। তাহলে সেই ঋণের টাকায় যা কিনেছি সেটা জানার জন্য হলেও ছাগল সম্পর্কে জানতে হবে কেননা সবার উপরে ছাগল সত্য। বিভিন্ন রঙের কর্কশ লোমাবৃত দেহ ও ফাঁপা শিং এবং ছোট লেজবিশিষ্ট স্তন্যপায়ী তৃণভোজী চতুষ্পদ প্রাণীর নাম হলো ছাগল। এই ছাগল জাতিকে সময় ও লিঙ্গ ভেদে বিভিন্ন নামকরণ হয়ে থাকে।

যদি স্ত্রী লিঙ্গের ছাগল কিশোর বয়সী হয় কিংবা উত্তীর্ণ হতে পারে তবে সেই ছাগল এখন পর্যন্ত বাচ্চা নেয়নি অর্থাৎ কুমারী আছে তাদের নিঃসন্দেহে হাইলোন বলবেন।

এই রকম হাইলোন কিনেছিলাম ক্ষুদ্রঋণের টাকায়। সে সময়ে একটির দাম ছিল দেড় হাজার টাকা মাত্র। মোট তিনটে কিনেছিলাম। সেই তিনটের যন্ত্রণা যে কী ভয়াবহ তা একমাত্র ভুক্তভোগী মাত্রই জানে। সেই সময়ের ৪৫০০ টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে প্রতিবেশীদের কাছে আমার ঋণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। প্রতি সপ্তাহে ১৭৫ টাকা করে ক্ষুদ্রঋণ দান প্রতিষ্ঠানে দিতে হতো। এখানে আমার নামে জমা হতো ৫০ টাকা আর বাকিটা ঋণ পরিশোধের কাজে লাগত। চলছিল স্বপ্ন বাস্তবায়ন। একদিন হঠাৎ দেখি আমার স্বপ্নের একটি অংশ অর্থাৎ একটি হাইলোন নাই। কোথায় গেল? চলছে খোঁজ। দুদিন পর্যন্ত চলল খোঁজাখুঁজি কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। তৃতীয় দিন এক হাইলোন বিশেষজ্ঞের আবির্ভাব ঘটল এলাকায়। উনি নিশ্চিন্ত করল টেনশনের কারণ নেই, হাইলোন বের হবে, হবেই। আমিও আশ্বস্ত হলাম বিশেষজ্ঞের বিশেষ পরামর্শে। তার কথামতো এলাকায় ও এলাকার আশপাশের কোন কোন বাড়িতে পাঁঠা আছে সেটা খোঁজ করতে হবে। ঢাকা শহরে একটি বাড়ির ঠিকানা বের করা যতটা দুরূহ কাজ না, তার চেয়ে বড় কঠিন কাজ হলো গ্রামে হারানো হাইলোন খুঁজে পাওয়া। এখন সেই হাইলোন যদি গরম হয়ে থাকে তাহলে নিশ্চিত ঠাণ্ডা হওয়ার জন্য সে আশপাশে যেখানে পাঁঠা আছেন সেখানে তার গন্তব্য হয়ে থাকতে পারে। এই থিউরি হাইলোন বিশেষজ্ঞের। সেই মতে আমিও বের হলাম...।

আমার হাইলোন হারানোর পঞ্চমদিনে পাঁঠা খুঁজতে শুরু করলাম। কিন্তু যাকেই পাঁঠার কথা জিজ্ঞেস করি সেই ঘুরে-ফিরে আমাকে শুধায়, হাইলোন পেয়েছেন কি?

আরে ভাই, না পাই নাই। তবে পাওয়ার জন্যই এখন পাঁঠা খুঁজছি। যা হোক হাইলোন হারালে পাঁঠা খুঁজতে হয়, এটাই না কি হাইলোন খুঁজে পাওয়ার সূত্র। এই সূত্র প্রয়োগ করে চলতে ষষ্ঠদিন পার হলো, এসে গেল সাপ্তাহিক কিস্তির সময়। গত সপ্তাহে কোনো কাজ না করায় এলাকায় লগ্নি কারবারির কাছে নিজেই হাইলোন হিসেবে ধরা দিয়ে তার নিকট হতে ৫০০ টাকার ৫০ টাকা মাসিক সুদ হিসেবে নিতে হলো। কিস্তির ১৭৫ দেওয়ার পর বাকি টাকা দিয়ে কী করব তার একটা খসড়া সিদ্ধান্ত হলো এ রকম- বিশেষজ্ঞের বিশেষ জ্ঞানের কাজ না হওয়ায় এবার সাধারণ জ্ঞানের চর্চা শুরু হলো। একটা মাইক ভাড়া নিয়ে আরও একজনকে কিছু টাকার বিনিময়ে হারানো বিজ্ঞপ্তি প্রচারের কাজে লাগানো হলো।

কিন্তু সেই হাইলোন যখন আর পাওয়া গেল না তখন পাওয়ার আশা ছেড়ে বাকি দুটোর প্রতি লালনপালনে দৃষ্টি দেওয়া উচিত। এদিকে পরের সপ্তাহে কিস্তির সময় উপস্থিত হলে কী করব বুঝতে না পেরে একটা হাইলোন বিক্রির সিদ্ধান্ত নিলাম। যথারীতি হাটবারে বাজারে উঠানো হলো। যেটাকে গত দুমাস আগে দেড় হাজার দিয়ে কিনেছি সেটার দাম বলছে হাজার/ বারশ’। ঋণ থেকেই যাচ্ছে। সুদ আসল বাড়ছে।

পরিশেষে বিশেষজ্ঞের বিশেষ পরামর্শে অনন্ত একটি পাঁঠা ছাগল কিনতে হবে। যুক্তি আছে। হাইলোন গরম হলে অর্থাৎ প্রজননকাল এলে সে পাঁঠার সন্ধানে যাতে আর বাইরে না যেতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। ততদিন ক্ষুদ্রঋণের হাইলোন মাত্র একটি আছে। সেই সুদের ৫০০ টাকা পরিশোধ করতে না পারায় এখন মহাজনের ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫০০০ টাকা। আমি দিনমজুর হাইলোন চাষি। হাই + লোন মানে যে বড় ঋণ তা এতদিনে বুঝতে পেলাম।

উলিপুর, কুড়িগ্রাম

 
Electronic Paper