সিঙ্গেল কমিটির বিবাহিত সভাপতি

ঢাকা, সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

সিঙ্গেল কমিটির বিবাহিত সভাপতি

রাফিদুল রাফি
🕐 ২:৫৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২১

সিঙ্গেল কমিটির বিবাহিত সভাপতি

মাঘ মাস শেষ হতে তখন মাত্র দিন দুয়েক বাকি। শীতের কম্বল-জ্যাকেট-সোয়েটার ছেড়ে লোকজন সবে ফুলহাতা শার্ট-টিশার্ট ধরা শুরু করেছে। এর মধ্যে একদিন ভার্সিটির সিঙ্গেল কমিটির সম্মানিত সভাপতি, ‘আজন্ম সিঙ্গেল’ শাকিল ভাই ডেকে নিলেন সকল সদস্যকে। কমিটির সাধারণ সম্পাদক দিনকয়েক আগেই নিজের সিঙ্গেলত্ব বর্জন করে মিঙ্গেল হয়ে গেছেন। কমিটি থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের কাজ আমাকেই চালিয়ে নিতে হচ্ছে।

শাকিল ভাইয়ের ডাকে সবাই গিয়ে জড়ো হলাম সেন্ট্রাল ফিল্ডের এক ধারে। সম্মানিত সভাপতি প্রেমঘটিত ব্যাপার এবং এর নানাবিধ কুফল নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা শেষে সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘মামা, (ইনি সিনিয়র-জুনিয়র সবাইকে প্রথমে মামা বলে সম্বোধন করেন।) তোরা সবাই আমার ভাই, তোরা হইতেছিস এক একটা হীরার টুকরা। এই যুগে সিঙ্গেল থাকা বিরাট চ্যালেঞ্জ আর তোরা এক একটা ‘আনবিটেন চ্যালেঞ্জার’। আসল কথায় আসি। হলুদ পাঞ্জাবি বানাবি না এবার কেউ। সবাই বানাবি কালো পাঞ্জাবি। আমরা শোকের আবহ নিয়ে মিছিল শেষে কাপলদের নানান যন্ত্রণা করব। প্যাঁচ লাগায়া দিব সম্পর্কে। ব্যস, ব্রেকআপ। এবার কিন্তু পহেলা ফাগুন আর ভালোবাসা দিবস একলগে পড়সে। দুইটা দিবস একই দিনে পড়ায় বিরাট সুবিধা। বড় উপকার হইল।’
আমাদের মধ্য থেকে আমান আচমকাই বলে ফেলল, ‘ভাই, কালা রং না প্লিজ। আমি তো এমনিতেই কালা। ভাই, আমারে লাল দেন না। সাদা দিলেও হইব।’
আমানের কথা শুনে হো হো করে হেসে ফেলল সবাই। কথা আর না বাড়িয়ে শাকিল ভাইয়ের প্রস্তাবে সায় দিয়ে সবাই সমস্বরে ‘সহমত ভাই’ বলে কালো পাঞ্জাবি বানাতে দিয়ে দিলাম আমরা।
বসন্তের প্রথম দিন অর্থাৎ পহেলা ফাগুন এবং ভ্যালেন্টাইন্স ডে’র আগের দিন পাঞ্জাবি ডেলিভারিও নেওয়া হয়ে গেল। শাকিল ভাইয়ের সংগ্রামী ডাকে পরদিনের কর্মসূচি সম্পর্কে আলাপ করতে একটি বর্ধিত সভা ডাকা হলো।
কমিটির ছেলেপেলেরা সবাই এসে বসে আছে অথচ শাকিল ভাইয়ের দেখা নেই। ঘণ্টাখানেক পর হল থেকে নেমে শাকিল ভাই ধীর পায়ে মিটিংয়ে এলেন। তাকে প্রথমটায় চিনতে রীতিমতো ভিমড়ি খেতে হলো। তার সারা গা চাদরে মোড়ানো। মুখে মাস্ক। মাথায় শীতটুপি। ঠা-ায় কাঁপছেন। সবার মধ্য থেকে আকিব জিজ্ঞেস করে বসল, ‘ভাই, আপনের হইসে কী? কাঁপেন কেন?’
শাকিল ভাই সভাপতির আসনে বসতে বসতে বললেন, ‘আরে মামা, আর কইস নারে ভাই। কাল রাইত থাইক্যা পেটের সমস্যা, সকাল থাইক্যা জ্বর। বিরাট ঠান্ডা লাগতাসে। ওই আশরাফ, তুই বইলা দে কালকের কর্মসূচি।’
আশরাফ পরদিনের কর্মসূচি ব্রিফ করে দিল আমাদের। প্রথমে প্রেম এবং যুগলবিরোধী বিক্ষোভ মিছিল ক্যাম্পাসের চারদিক প্রদক্ষিণ করে শেষে কাপল জোনে গিয়ে কাপলদের ত্যক্ত করবে। তারপর সারাদিন শাকিল ভাইয়ের লেখা ত্রিশ পাতার গবেষণাগ্রন্থ ‘সিঙ্গেল থাকার ১০১টি সুবিধা এবং উত্তরাধুনিক সিঙ্গেলত্ব’ বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হবে এবং সেটির কয়েকশ’ কপি বিনামূল্যে বিতরণও করা হবে।
পরদিন সকালে মিছিল শুরু করা হবে, তবে শাকিল ভাইয়ের দেখা নেই। তার ফোনও বন্ধ। তিনি থাকেন হলের পাঁচতলায়। সেখানে গিয়ে তাকে দেখে আসার বা নিয়ে আসার এনার্জি পেল না কেউ। অতঃপর পদাধিকার বলে, আমিই মিছিলটির উদ্বোধন করলাম। মিছিলে ব্যবহৃত হলো, ‘কেউ পাবে কেউ পাবে না, তা হবে না তা হবে না’ এবং ‘একটা একটা কাপল ধরো, ধইরা ধইরা সিঙ্গেল করো’ ইত্যাদি স্লোগান।
মিছিল শেষে ভার্সিটির কাপল জোনে গিয়ে কাপলদের নানাপ্রকারে ত্যক্ত-বিরক্ত করা হলো। কিন্তু প্যাঁচ লাগানো গেল না। হতাশ হয়ে শাকিল ভাইয়ের গবেষণাগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচনের কর্মসূচি শুরু করার দিকে মন দেওয়া হলো। কিন্তু যার বই সে-ই তো নেই। এবার তো শাকিল ভাইকে পাঁচতলা থেকে নামিয়ে আনতেই হয়। শুভ্রকে সঙ্গে নিয়ে শাকিল ভাইয়ের রুমে গিয়ে দেখি সেখানে তালা ঝুলছে। শাকিল ভাই খুব বেশি সিঙ্গেল দাবি করেন নিজেকে, এমনকি হলে তিনি সিঙ্গেল রুমে থাকেন। অথচ তার কোনো রুমমেট থাকলেও তারা তার খবর দিতে পারত। কিন্তু হলের কেউ তার খোঁজ দিতে পারল না। হল থেকে নেমে রঙ-বেরঙের কাপল দেখে রাগে মাথার চুল ছিঁড়ছি এমন সময় হঠাৎ নিশি ছুটে এসে বলল, ‘কাম তো হইছে একটা ব্যাডা। শাকিল ভাই আমাগোর ভার্সিটির স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চ্যাগায়া পইড়া আছে। তার গায়ে গুটিবসন্ত। চল সবাই যাই।’
খবর পেয়ে দ্রুত ছুটে গেলাম সেখানে। শাকিল ভাই বেডে শুয়ে কাতরাচ্ছেন। তার নাক-মুখ এমনকি সারা গায়ে গুটিবসন্তের উপস্থিতি। শাকিল ভাইয়ের মাথার পাশে একজন অপরিচিত রমণীকে দেখলাম। চিন্তিত মনে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। শাকিল ভাই আমাদের সবার দিকে একবার তাকালেন তারপর চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে গাইতে লাগলেন, ‘মামা, বসন্ত গতরে মামা, বসন্ত গতরে, ও সইগো...’।
হঠাৎ রমণীটি চিৎকার করে কেঁদে উঠল, ‘আমার মানুষটার কী হইল গো? গুটিবসন্ত বার হইছে মানুষটার। এহন দেহি মাথাও খারাপ হয়া গেছে গা। সকালে খবর পায়া গেরাম থাইক্যা আইছি। ও মন্টুর বাপ, কিচ্ছু হইত না তোমার। এমন করতাছ কেন?’
রমণীর কথা শুনে আমরা অবাকের ওপর আরও বেশি অবাক হয়ে নির্বাক হয়ে গেলাম। বলে কী! শাকিল ভাই বিবাহিত! তিনি আমাদের থেকে অনেক সিনিয়র। ইয়ার ড্রপ খেতে খেতে এখনো ক্যাম্পাসে পড়ে আছেন এবং তিনি একজন গর্বিত সিঙ্গেল। তার সম্পর্কে এসব কথাই আমরা এতদিন জানতাম। কিন্তু তিনি যে বিবাহিত এবং মন্টু নামে একটা ছেলেও আছে তা জানা ছিল না। তিনি এসব কথা লুকিয়ে মারাত্মক বাটপাড়ি করেছেন। এক জরুরি সভা ডেকে সিঙ্গেল কমিটির সভাপতির পদ থেকে শাকিল ভাইকে সরিয়ে দেওয়া হলো সেদিনই। আর শাকিল ভাইয়ের সিঙ্গেলদের নিয়ে লেখা গবেষণাগ্রন্থটির সব কয়টি কপি ভাবির হাতে তুলে দিলাম আমরা। শুনেছি বইগুলোকে কেজি ধরে ভাবি বিক্রি করে দিয়েছেন। বর্তমানে আমরা একজন সত্যিকারের সিঙ্গেল সিনিয়র বড়ভাইকে খুঁজতে মাঠে নেমেছি যিনি কিনা কমিটিকে দেবেন আশা, দেবেন ভরসা, হবেন ‘সংগ্রামী সভাপতি’।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

 
Electronic Paper