বিএ নয় বিয়ে পাস!

ঢাকা, সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১ | ৩ কার্তিক ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

বিএ নয় বিয়ে পাস!

অলোক আচার্য
🕐 ২:৫১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২১

বিএ নয় বিয়ে পাস!

হারানদা আমাদের গ্রামের কোনো কৃতী সন্তান না। কোনো বিখ্যাত নেতাও না। তবে তার পরিচিতি কোনো বিখ্যাত মানুষের চেয়ে কম কিছু না! সে হিসেবে বলা যায় তিনি আমাদের গ্রামের সেলিব্রেটি! হারানদার সঙ্গে আমার বেশ ভালোই সখ্য। একই গ্রামের। বন্ধুর মতো কিন্তু পুরোপুরি বন্ধু নই। সমবয়সী নই এবং হারানদা আমার থেকে কম করে হলেও বছর ছয়েকের বড় হবে। পড়ালেখাও সেই হিসেবে আগেই শুরু করেছিলেন। শেষটা হিসাব করে হয়নি। কিন্তু ফেল করতে করতে এমন অবস্থা হলো যে আমরা ক্লাস সিক্সে একসঙ্গে শিক্ষাজীবন শুরু করলাম। প্রথম দিকে না হলেও ধীরে ধীরে সম্পর্কটা সহজ হতে হতে তুই-তোকারিতে নেমে এলো। হারানদাও এতে কিছু মনে করত না। আমারও সুবিধে হতো। তুই-তোকারি হলেও কিন্তু হারানদাকে স্কুলের বাইরে দাদাই বলতাম। বছর বছর হারানদা যেভাবে আদু ভাইকে অনুসরণ করতে লাগল তাতে আমরা ম্যাট্রিক পাস করে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হলেও হারানদা তখন মাত্র ক্লাস টেনেই থেকে গেলেন।

হারানদাকে ব্যক্তিগতভাবে পড়া দেখিয়ে দিয়েছি। এ ব্যাপারে হারানদার মধ্যে কোনো দ্বিধা কাজ করত না। আমি ছাড়া আরও অনেকের কাছেই গেছেন দু’চারটা অঙ্কের সমাধান করতে। কিন্তু তার মাথাটাই যা কাজ করত না! তিনি মাঝে মধ্যে দুঃখ করতেন এই গোবরভর্তি মাথা নিয়েই। একই সঙ্গে আমাদের স্কুল-কলেজ ছিল বলে তার সঙ্গে আমার দেখা হওয়াটা ছিল নিত্য ঘটনা। ততদিনে তিনি কিছুটা ইতস্তত বোধ করতে শিখেছেন। নিজের মধ্যে কেমন যেন একটু গুটিয়ে থাকতেন। কারণ ততদিনে তার বিয়ের বয়স পার হচ্ছিল। অবশেষে আমরা যখন উচ্চ মাধ্যমিক পাস করলাম তখন হারানদা ম্যাট্রিক পাস করে গ্রামের মান-সম্মান রক্ষা করার সঙ্গে সঙ্গে নিজের স্কুল জীবনের ইতি টানল। নিজের স্কুল জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে তিনি কলেজে ভর্তি হলেন। বাড়ি থেকে সবাই তাকে লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে একটা সুলক্ষণা মেয়ে বিয়ে করে খেত-খামারে লেগে যাওয়ার পরামর্শ দিল। কিন্তু হারানদা নাছোড়বান্দা। আগেও এ প্রস্তাব বহুবার তার কাছে এসেছে। তার কাছে এসব প্রস্তাব বেশ অসম্মানজনক মনে হয়েছে।

ধৈর্য ছিল লোহার চেয়েও শক্ত! গ্রামের সবাই প্রায় হাল ছেড়েই দিয়েছিল একমাত্র হারানদা ছাড়া। আমরা কলেজ ছেড়ে এলাকার বাইরে চলে গেলাম। হারানদা বিপুল উৎসাহ নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকের পড়া শুরু করলেন। সেই বিপুল উৎসাহ কতটা কাজে দিয়েছিল তা বলতে পারব না, তবে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে তার বেশ কয়েক বছর লেগেছিল বলে লোকমুখে খবর পেয়েছি। তা কবে শেষ হয়েছিল তা ঠিকঠাক বলার ক্ষমতা আমার নেই। কারণ ততদিনে আমাদের মাঝে বেশ দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। মাঝে মধ্যে হারানদার খবর এর ওর মুখ থেকে পেতাম বৈকি। তবে সেসবই টুকরো খবর। তার উচ্চ মাধ্যমিক পাসের খবর পেয়েছিলাম। তারপর শুনেছি, হারানদার বাবার মৃত্যুর পর তার পড়ালেখা আর এগোতে পারেনি। কাজের সন্ধানে তাকে শহরে যেতে হয়েছে। তারপর সব কিছু চুপচাপ। আর কোনো খোঁজ নেই। নেওয়ার সুযোগও নেই। আমি চাকরির সন্ধান করি। এরই মধ্যে একদিন গ্রামে এসে জানলাম হারানদা নাকি শহরে গিয়ে বিএ পাস করেছেন! আমি একইসঙ্গে কিছুটা আনন্দিত এবং মোটামুটি অবাক হলেও তার লেখাপড়ার ধৈর্যের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধাবোধ ছিল। ইতোপূর্বেও নিজের ধৈর্যশক্তির প্রমাণ দিয়েছেন।

খবর এলো হারানদা বাড়ি আসবেন। আমরা গ্রামের কয়েকজন মিলে ঠিক করলাম এমন একজন ধৈর্যশীল মানুষকে রীতিমতো সংবর্ধনা দেওয়া উচিত। উদ্যোগ নিয়ে বেশ দু’একটি সভা করে ফেললাম। কীভাবে হারানদাকে গ্রামে বরণ করে নেওয়া হবে। কে ফুল দেবে ইত্যাদি। অবশেষে হারানদা গ্রামে আসার চূড়ান্ত খবর পাঠাল। আমরা রীতিমতো আনন্দ শোভাযাত্রা নিয়ে গ্রামের মুখে গিয়ে দাঁড়ালাম।
হারানদা এলেন।
আমরা সোৎসাহে জানতে চাইলাম, ‘তোমার ডিগ্রি পাসের সার্টিফিকেটটা কোথায়?’
হারানদা অবাক- ‘কীসের ডিগ্রি পাস! কে করল? কবে করল?’
আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি- ‘তুমি ডিগ্রি পাস করোনি হারানদা?’
‘না তো।’
‘তবে যে তুমি খবর দিয়েছিলে তুমি বিএ শেষ করেছ?’
‘আরে গাধা আমি বিএ না বিয়ের কাজ শেষ মানে বিবাহজীবন শুরু করার কথা বলেছি! এই দ্যাখ তোদের ভাবি।’ অবশেষে তার বিয়ে পাসের সার্টিফিকেট মানে তার বউ গাড়ি থেকে নেমে এলেন। আমরা বিপুল উৎসাহে হারানদার বউসহ তাকে বরণ করে গ্রামে আনলাম। এত আয়োজন বৃথা যেতে দেওয়া যায় না!

 
Electronic Paper