কঞ্জুসের সকাল সন্ধ্যা

ঢাকা, বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১ | ৪ কার্তিক ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

কঞ্জুসের সকাল সন্ধ্যা

শফিক হাসান
🕐 ২:৪৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২১

কঞ্জুসের সকাল সন্ধ্যা

কেন যে এই বুড়ো বয়সেও দূরসম্পর্কের আত্মীয়স্বজনের বাসায় বেড়ানোর ইচ্ছা জাগে বাবার- বুঝি না ছাই। সুযোগ পেলেই এখানে-ওখানে নানাখানে চলে যাচ্ছেন। তা যান, আমার সমস্যা কী! শেষপর্যন্ত আমাকেই ঝামেলায় ফেলে দেন। রীনা আপার বাসায় তিন মাস বেড়ানো শেষে বাড়ি ফিরেছেন। কিন্তু পরদিনই কল করে জানালেন, গামছাটা ফেলে এসেছেন; নিয়ে আসতে হবে। যতই বলি, বাড়তি খরচের দরকার কী, ওই টাকায় নতুন তোয়ালে কিনে নিলেই হয়। বাবা বোঝেন না। তার যুক্তি, একটা সুইও খোয়ানো যাবে না। লক্ষ-কোটি কামান জলে ফেলে দেবেন উদ্ধার-প্রয়োজনে! এর আগে আমার নানাবাড়ি থেকে রুমাল, খালাবাড়ি থেকে নিমের মেসওয়াক, ফুপাবাড়ি থেকে সিকি-আধুলি উদ্ধার করেছেন। এমন আচরণে অনেকেই ক্ষুব্ধ বাবার প্রতি। একেকটা জিনিস হারায়, জ্বালা বাড়ে আমার।

ভিনদেশে হারানো গরু কিংবা মোষ খুঁজে পাওয়া যত সহজ, ঢাকা শহরে মানুষের বাসা খুঁজে বের করা ততটাই কঠিন। সকাল থেকে যেভাবে গরু খোঁজার মতো রীনা আপার বাসা খুঁজে চলেছি, এভাবে কেউ হারানো স্মৃতিও খোঁজে বলে মনে হয় না! মোবাইল ফোনে আমাকে ঠিকানা জানানোর পর অনেক কাজই সেরেছেন রীনা আপা। টুম্পাকে স্কুলে পৌঁছে দিয়েছেন, আবার এনেছেনও। তারপর ভাতঘুমের মধ্যে জরুরি কল এলে ছুট লাগিয়েছেন গাজীপুরে। তখনো আমি বোগদার মতো ঠিকানা খুঁজে চলেছি! শেষমেশ গলদঘর্ম হয়ে যখন খুঁজে পেলাম, আপা কল করলেন তখনই- ‘উত্তরায় আছি, যানজটে। আসতে কত ঘণ্টা লাগবে জানি না। তুমি কোনো দোকানে বসে চা খাও। আমি এসে বিল পরিশোধ করব।’

এত কষ্টে ঠিকানা খুঁজে পেলাম, এখন খুঁজতে গিয়ে যদি আবার হারিয়ে ফেলি! তাই বলে অফারও হাতছাড়া করা উচিত হবে না। খাব চা-ই, সঙ্গে শিঙ্গাড়াও খেয়েছি বলে বিল তুলে নেব। অদ্ভুত প্রস্তাবের মধুর প্রতিশোধ। অনেক ঘুরে একটা হোটেল খুঁজে বের করলাম। এদের চা আবার বিশ টাকা কাপ। লে পরোটা! চা পর্ব শেষে বাসা খুঁজে পেতে কোমল পানীয় গলাধঃকরণ করতে হলো তিন লিটার। ঘাম যেহেতু লিটার বা কেজিতে পরিমাপ করার সুযোগ নেই, সেই হিসাবে গেলামও না। ঘুরতে ঘুরতে যখন চেনা পথে পা পড়ল। এক বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘সাংবাদিক খোকন সাহেবের বাসা কোনটা?’
তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘তার আগে তুমি বলো, ঢাকা শহরে মাগনা কোন জিনিসটা পাওয়া যায়?’
‘উড়ন্ত ধুলা-বালি। ডাক্তারি পরামর্শ।’
‘ঠিক বলেছ। এখন যাও একটা কচি ডাব কিনে আনো। তারপর ঠিকানা দেখিয়ে দেব। বাসার নাম জাহানারা মঞ্জিল। ঠিক বলেছি?’
‘এটাই তো বাসার নাম! কীভাবে জানলেন?’
‘বুদ্ধি থাকলে সাধারণ জ্ঞানের কিংবা কোনো বই না পড়েও বিসিএস পরীক্ষা দেওয়া যায়।’
‘আপনার কদম মোবারকখানা এগিয়ে দেন ওস্তাদ, কদমবুসি করি!’
‘পা ধরার চার্জ নগদে ১০০ টাকা।’
‘এই নেন টাকা। তবুও বঞ্চিত করবেন না।’
পকেট থেকে চকচকে (আদতে কচকচে; একই বানান, শুধু চ আর ক অদলবদল করতে হয়) ১০০ টাকার নোট বের করে দিলাম। জ্ঞানী ভাই নির্বিকার মুখে সেটা পকেটস্থ করে বললেন, ‘বাসা দেখিয়ে দেব। এখন যাও, ডাব নিয়ে আসো।’
‘কচি ডাবের পানি কিন্তুক কডা। কডা খাইবেন?’
‘কডা কী রে?’
‘কডা হইল কডা! মিষ্টি ছাড়া।’
‘সমস্যা নেই। চিনি মিশিয়ে খাব। সামনের দোকান থেকে এক কেজি চিনিও এনো।’
‘দুই টাকার চিনি আনলে হবে না?’
‘তাহলে চা খাব কী দিয়ে! মাঝে-মধ্যে শরবতও তো পান করি।’
নিমরাজি হয়ে পা চালালাম। কেন যে ওই সময় বাসার সামনে থেকে সরলাম। রাগ হলো নিজের প্রতি। রীনা আপার প্রতিও। এমন প্যাঁচালো ঠিকানায় কেন থাকেন!
ডাব কিনতে গিয়ে পড়তে হলো মহাফ্যাসাদে! ডাবওয়ালারা যে এতটা অবিশ্বাসী হয় আজ প্রথম জানলাম। পকেটে আছে সাকুল্যে ৫০০ টাকার একটা নোট। সেটা দিতে চাইলে মুখ ঝামটে বললেন, ‘ভাংতি করণের মতলবে আইছ, মিয়া?’
‘না। ডাব লাগবে।’
‘তাইলে ভাংতি নিয়া আসো।’
মুখ কাটা ডাবটা নিয়ে হাঁটা দিলে ধমক শুনতে হলো, ‘ডাব রাইখা যাও।’
আশি টাকার ডাবের জন্য ৫০০ টাকা কীভাবে বড় নোট হয়! কী মুসিবত। ডাব রেখে দিলাম সযতনে। তিনি বললেন, ‘হাতের ব্যাগটাও রেখে যাও।’
‘ব্যাগ রাখব কেন?’
‘পরে যদি না আসো!’
চিনি কিনলে ভাংতি মিলতে পারে। দোকান থেকে বেরিয়ে চিনিই কিনলাম! ডাবওয়ালার কাছে ফিরতে গিয়ে দেখলাম, গুবলেট পাকিয়ে গেছে। এত পথ কত দিকে মিশেছে; এখন সঠিক রাস্তাটিই খুঁজে পাচ্ছি না। চিনির দোকান খুঁজতে খুঁজতে চলে এসেছি অনেক দূরে। বিরক্তি চলে এলো সিস্টেমের প্রতি- এক দোকানে কেন সব জিনিস পাওয়া যাবে না! ডাব আনিনি, টাকাও দিইনি এটা না হয় সমানে সমান হলো কিন্তু আমার ব্যাগ? ভিতরে রয়ে গেছে দরকারি-অদরকারি জিনিসপাতি। আবার পথে নামলাম এই তিন কূল হারিয়ে। পইপই করে নিজেকে কতবার বোঝালাম, পাওয়া ঠিকানা হারাতে নেই। নদীতে ডুব দিয়ে হাতিয়ে মাছ ধরার মতো ঠিকানাও একটু ঢিল দিলে লুকিয়ে যায়।
রাত নেমে এসেছে চারপাশে। অন্ধকারে ঠিকানা খুঁজে বের করা আরও মুশকিল হবে। তবুও থামলে চলবে না। রীনা আপা এই পর্যন্ত তিনবার কল করেছেন। একবারও ধরিনি। তার সাহায্য না নিয়েই বুঝিয়ে দেব, এই মোকসেদ আলীর পক্ষে একটা বা একশ’টা ঠিকানা খুঁজে বের করা ব্যাপার না! বরাত খারাপ বলে আজ নিজস্ব গাড়ি নেই। থাকলে ড্রাইভারকে যেখানে যেতে বলতাম, চলে যেত। খালাত ভাই মিজান ড্রাইভারের মতো। তার বস গাড়িতে উঠলে প্রশ্ন করে- ‘কোথায় যাব, স্যার?’
তিন শব্দের প্রশ্নের এক শব্দে উত্তর। ঘুরতে থাকে গাড়ির চাকা। যানজট পেরিয়ে যেখানে এসে মিজান গাড়ি থামায়, অতঃপর নিঃশব্দে খুলে দেয় পেছনের দরজা- সেটাই গন্তব্য। এসব ভাবনা দুর্ভাবনার মধ্যেই পেরিয়ে আসি অন্তবিহীন পথ। সুদৃশ্য এক বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ততোধিক সুবেশ ভদ্রলোককে প্রশ্ন করি- ‘এটা খোকন সাহেবের বাসা?’
‘হ্যাঁ। তাকে দরকার?’
‘জি।’
‘খোকন, সামনে এসো। তোমার অতিথি এসেছে।’ ভদ্রলোকের ডাকে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসে এক শিশু। সে আমার দিকে তাকিয়ে দুর্বোধ্য ভাষায় প্রশ্ন ছোড়ে- ‘উগা বুগা গুলা?’
এই বাক্যের অনুবাদ কী- আমারে খোঁজস কিল্লাই?
‘কিছু না!’ বলে রাস্তা মাপি। পেছন থেকে ভেসে আসে সম্মিলিত হাসি। খোকন হাসে খিলখিল! তার হাসির তরঙ্গে সব রাগ উবে যায়। আরেকটু এগোলে দেখি, ল্যাম্পপোস্টের নিচে বই পড়ছেন এক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। কিছু লাল নীল কালো বই তার সামনে ছড়ানো। দৃশ্যটা অন্যরকম লাগল। হাঁটু মুড়ে বসে পড়ি সামনে- ‘ও বিদ্যাসাগর ভাই, কী করেন?’
‘মাছ ভাজি।’
দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে জবাব দেন তিনি। ডানে-বামে তাকাই। কোথাও চাল, মুড়ি, কড়াই কিংবা চুলা চোখে পড়ে না। আছে বহুরঙা বইপত্র। বলি, ‘আপনি তো পড়ছেন!’
‘দেখছেনই যখন প্রশ্ন কীসের!’
‘কী পড়েন?’
‘অনেক কিছু।’
‘এত পড়ে লাভ কী! বড় চাকরি পাবেন?’
‘চাকরির পড়া পড়ি না। দর্শন খুঁজি।’
‘ধর্ষণ! সেটা তো কেউ কেউ করে। আপনি না করে খোঁজেন কেন?’
‘উচ্চারণ হয়নি। প্রথমে দ, তারপর তালব্য শ। দর্শনে খুঁজি মুক্তির পথ।’
‘আমিও তো পথ খুঁজছি সকাল থেকে। পাচ্ছি না। আপনি না হেঁটে বইয়েই খুঁজে পান?’
‘এটাই হচ্ছে মুক্তির সরল পথ। কোথায় যাব আমরা। গিয়ে কী করব। কোন পন্থায় যাব- এসব মেলে পাঠে।’
‘খোকন সাহেবের বাসায় যেতে চাই। আমাকেও পাঠিয়ে দেন।’
‘ধুর মিয়া ভোদাই, কীসের মধ্যে কী খোঁজেন!’
পথ-দার্শনিকের কোপানল থেকে রক্ষা পেতে এবার রীনা আপার কল রিসিভ করি। গড়বড় করে তিনি বলেন, ‘আমি এখনো উত্তরা থেকে একচুলও নড়তে পারিনি। কোথাও থেকে হেলিকপ্টার ভাড়া নেওয়া যায় কিনা চেষ্টায় আছি। তুই বরং আজ চলে যা।’ ‘আরেকদিন আসব! ভাড়া দেবে কে?’
খেঁকিয়ে উঠলেন আপা, ‘তাহলে তুই অপেক্ষা কর। বেসরকারি বিমান কোত্থেকে সংগ্রহ করা যায় সেই চেষ্টাও চালা। আমার আসতে দেরি হলে তোর লোকসানই বেশি।’
এবার পড়লাম মহাফাঁপরে। কোথাও কল দিলে তো টাকা খরচ হবে! একটা পুরনো গামছার জন্য আর কত টাকা জলে (এবং চায়ে, কোমল পানীয়তে, ডাবেও) ফেলব!

 
Electronic Paper