শক্তি- দ্য পাওয়ার

ঢাকা, সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২ আশ্বিন ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

শক্তি- দ্য পাওয়ার

শফিক হাসান
🕐 ২:৫১ অপরাহ্ণ, জুলাই ২০, ২০২১

শক্তি- দ্য পাওয়ার

পাগল-ছাগল মার্কা গরুর ত্যাড়া শিংয়ের গুতা না খেয়েছে যে- তার পক্ষে কিছুতেই বোঝা সম্ভব নয়, কী যাতনা ‘আশীবিষে’! বিশাল পরিসরে ত্রাণ বিতরণ যখন শেষপর্যায়ে, মঞ্চের পেছন থেকে মোটা ত্রিপল ভেদ করে ছুটে এলো মারমুখী একটা গরু। কী তেজ তার, যেন গুতিয়ে ঠান্ডা করে দেবে পৃথিবী।

ওকে-তাকে-ওকে তাড়া করে, চেয়ার-টেবিল উল্টিয়ে গরুটা ছুটল দ্বিতীয় মিশনে! এদিকে দবির মণ্ডল খোঁজার চেষ্টা করলেন বিপক্ষ দলের কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে লাল শার্ট পরে এসে গরুকে উসকে দিয়েছে কি না! মাটিবর্তী মঞ্চে সাঁটানো ব্যানারে বড় নেতার নাম দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে। অতি উৎসাহী কেউ কেউ মোবাইল ফোনে ছবি তুলছে, ভিডিও করছে। লাইভ শুরু করেছে ইউটিউব চ্যানেলের এক সাংবাদিক। ঘোলাটে পরিস্থিতিতে হতভম্ব দবির মণ্ডল তার বিশ্বস্ত ক্যাডার হাঁটু-কাটা আলফাজের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘খোঁজ নে, গরুটার মালিক কোন বেকুব!’

ডান হাতের তালুতে বাম হাত ঘষল আলফাজ, ‘মালিক কি আর গরু রে তাণ্ডব চালাইতে কইছে! অনুষ্ঠান পণ্ড করার কতা হিখাইয়া দিছে! সন্দ করেন হুদাই।’
‘তাহলে এই গরু এখানে কেন, আর কোনো জায়গা পায়নি?’
‘আমার মনে অয়, এটা গরু সমাজের কোন্দলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। এই গরুর বাচ্চা হয়তো বিরোধী দলের! যদি তাই অয়, গরুডা আবার ফিইরা আইব এইখানে।’
‘মাথা ঠিক আছে তোর?’
‘বিলকুল কুল-Cool ঠিক আছে। এক পাড়ার কুত্তার লগে অইন্য পাড়ার কুত্তার মিল-মিশ দ্যাখছেন কোনোদিন? দেখেন নাই। দখল বা এলাকায় প্রভাব বিস্তার- মালিকানা প্রতিষ্ঠাকরণের লাইগা তারা ঝগড়া করে।’
‘তুই বলতে চাস এটা কুকুরনীতি? মানে কুকুররাও রাজনীতি করে, তাদের সমাজব্যবস্থায়?’
‘পেরতেক প্রাণীই রাজনীতি করে। বিরোধী পক্ষের লগে সংঘর্ষে লিপ্ত অয়। তয় কুত্তাগো নীতি বা দুর্নীতি আমরা ক্লিয়ার বুঝবার পারি।’
‘তুই তো পণ্ডিত মানুষের মতো কথা বলছিস! এখন খবর নে- এই নগ্ন হামলার পেছনে গরু সমাজের কোন কোন গরু দায়ী।’
‘সামনে ঈদ। এখন গরু ইস্যু নিয়া মাঠ গরম করলে সমস্যা আছে, লিডার!’

ইঙ্গিতটা বুঝলেন দবির মণ্ডল। হাঁটু-কাটা আলফাজ বড় সন্ত্রাসীই শুধু নয়, বড় বুদ্ধিজীবীও। তিনি নিজেও কম বুদ্ধিজীবী নন। অপ্রত্যাশিত এই ঘটনাকেই ‘ক্যাশ’ করে নিলেন। এত বিশৃঙ্খলার মধ্যেও কিছু মানুষ লাইন থেকে একচুলও নড়েনি। বোঝা যায়, ত্রাণের একটি লুঙ্গি, শাড়ি, স্যান্ডো গেঞ্জি কিংবা করোনা-সাবানের জন্য কতটা লালায়িত এই আমজনতা। ভুখা-নাঙ্গা সাহায্যপ্রার্থীদের দিকে তাকিয়ে বললেন দবির মণ্ডল ‘দেখলেন তো সবাই? আমরা আপনাদের পাশে থাকি, সাহায্য-সহযোগিতা করি তা চায় না ওই হার্মাদ ইব্রাহিম পাটোয়ারী। তাই তার সন্ত্রাসী গরুকে লেলিয়ে দিয়েছে। আপনাদের সঙ্গে নিয়েই আমরা ওই রাজনৈতিক অপশক্তি, ছ্যাঁচড়া দুর্বৃত্তকে প্রতিহত করব। গড়ে তুলব দুর্বার আন্দোলন।’

জনতা রইল নিরুত্তর। ওদিকে দবির মণ্ডল সমর্থক গোষ্ঠী কোরাস তুলল- ‘মানি না, মানি না।’
তীব্র রোষ ও জোশে চিল্লিয়ে উঠলেন দবির, ‘থাম তোরা। কী মানিস না?’
মুহূর্তেই পাল্টে গেল স্লোগান- ‘ইব্রাহিম পাটোয়ারীর চামড়া/ তুলে নেব আমরা...।’
ছিন্নভিন্ন লুঙ্গি পরে লাইনে দাঁড়িয়েছেন এক বৃদ্ধ। ঊর্ধ্বাঙ্গ দিগম্বর। শরীরে ক্ষুধা ও দুর্বলতাজনিত কাঁপন শুরু হওয়ায় লাইন ঠিক রেখেই বসে পড়লেন। নতুন স্লোগান শুনে বিড়বিড় করে বললেন, ‘ইব্রাহিম ডাকাইতের চামড়া দিয়া কী করবি? গরু-ছাগলের চামড়ার লগে ভেজাল দিয়া বেচতে পারবি? মাইনষের চামড়া যদি বেচনের সুযোগ থাকত, তোগো বাবা-মার চামড়া ছিইলা বহুত আগেই বেইচা দিতি!’
ততক্ষণে শুরু হয়েছে আরেক স্লোগান-বাঁশডলা খাইব কে?/ ইব্রাহিম, ইব্রাহিম!
স্লোগানের ক্যাওয়াজ চলতে থাকুক। এই ফাঁকে আমরা গল্পের প্রথম অংশে প্রবেশ করি।

দবির মণ্ডল অনেক চেষ্টা-চরিত্র করে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার নির্বাচিত হয়েছেন। যদিও নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা দুর্মুখের অভাব নেই। প্রশ্নে ওঠে মেম্বার মহোদয়ের সততা ও যোগ্যতা নিয়েও। এসব কখনই পিঠে কিংবা পায়ে (পুরো গায়ে তো নয়ই) মাখেননি দবির। তিনি জানেন রাজনীতি করলে লোকজন অকথা-কুকথা বলবেই। মেম্বার হয়েছেন ভালো-মন্দে; তার লক্ষ্য সুদূরপ্রসারী, আগামীতে চেয়ারম্যান হবেন। ধাপে ধাপে কাউন্সিলর, মেয়র এবং এমপি। সব শেষে মন্ত্রী এ এক সুখের জগত। দবির মণ্ডল একটু ফুরসত পেলেই চোখ বন্ধ করে ভাবেন, মন্ত্রী হলে শানশওকত কতটা বাড়বে। কতজন সামনে দাঁড়িয়ে স্যার স্যার বলে মুখে ফেনা তুলবে। কাগজে ছবি ও সংবাদ ছাপা হবে প্রতিদিনই। সরকারি, বেসরকারি ও ইউটিউব টেলিভিশনের সুন্দর উপস্থাপকরা বিগলিত হেসে সংবাদ পড়ে যাবে- মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় জনাব দবির মণ্ডল...। এসব কল্প-ভাবনায় শরীর-মনে সুখের স্নিগ্ধ জোয়ার বইতে শুরু করে।

তিনি জানেন, এদেশে সবই সম্ভব। বেলাইন-মতো চললে মন্ত্রিত্ব পদ ঠেকায় কে! সে পর্যন্ত যাওয়ার আগে দরকার ব্যাপক জনসমর্থন। এলাকায়ও জনপ্রিয়তা বাড়াতে হবে। প্রতিপক্ষ ইব্রাহিম পাটোয়ারী ঘাঘু মাল। তার সঙ্গে প্রায়ই ঠুসঠাস লাগে। উভয়ের অনুসারীদের লাঠিসোটা নিয়ে দৌড়ায় তুচ্ছ কারণেও।

এলাকার মানুষের সামনে নিজের ক্লিন ইমেজ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ইব্রাহিম পাটোয়ারীকে খলনায়ক বানিয়ে দিতে হবে। কীভাবে কী হবে আগামীতে, সেই নীলনকশাও মাথায় আঁকা আছে। বোনা হচ্ছে নতুন জাল। পালাবি কোথায়!
সামনে ঈদ। মানুষের কাছে পৌঁছানোর এখনই সুযোগ। লাখ কয়েক টাকা লাগবে। এক প্রত্যুষে তিনি রওনা হলো শহরে, বড় নেতার বাসায়। কড়াকড়ি লকডাউন যাত্রাপথে বিঘ্ন ঘটাল না। তার প্রাইভেট কারে সাঁটানো আছে ‘জনপ্রতিনিধি’ সিটকার। পাশেই পিতলের স্ট্যান্ডে রয়েছে টুকরো কাপড় দিয়ে নির্মিত জাতীয় পতাকা। পুরনো হওয়ায় বিবর্ণ সেটা। ঔজ্জ্বল্য হারিয়েছে লাল-সবুজ রং।

দবির মণ্ডলকে দেখে বিরক্ত হলেন বড় নেতা- ‘তুমি আবার এসময়ে কেন এসেছ? কী চাও!’
‘বড় ভাই, এই ঈদে এলাকাবাসীর পাশে দাঁড়ানো জরুরি না!’
‘তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি শুয়ে থাকবে, যা ইচ্ছা করো। আমি এদিকে মামলা-মোকদ্দমা-অভিযোগ সামলানো নিয়ে ব্যস্ত আছি।’

বড় নেতার তেজও বড় হবে; দুর্নীতির মামলাও হবে বিশাল। এসবে বিচলিত হলেন না দবির মণ্ডল। মনে মনে বললেন, চুরি-চামারির সব টাকা একাই খাবি? আমাদের বাট্টা দিবি না! মুখে ঝোলালেন ফিচকে হাসি, ‘আপনার নামে একটা অনুষ্ঠান করতে চাই। ঈদ-বস্ত্র বিতরণ উৎসব। সাত বছর তো এলাকায় যান না। এই সুযোগ কম টাকায় এলাকাবাসীকে আপনার নাম মনে করিয়ে দিতে চাই।’

‘তা কেমন খরচ পড়তে পারে?’
‘লাখ পাঁচেক দিলেই হবে। এক লাখ খরচ করব মাইকিং ও পোস্টারিংয়ে। চার লাখ টাকায় কাপড় কিনব। কাপড়ে আপনার ছবিও রাখব। লোকজন যেখানেই যাক, আপনার ছবি বুকে নিয়েই ঘুরবে!’
‘চমৎকার আইডিয়া। তবে সস্তা কাপড় কিনবে। যাতে বেশি মানুষকে দেওয়া যায়। আমার ছবি রাখবে কাপড়ের মাঝখান বরাবর।’
‘আমার মাথায় আছে। ছবি নিচে দিলে দেখবে কে?
কাপড়ে জনপ্রতি ২০০ টাকা বাজেট করতে চাই।’
‘বলদের মতো কথা বলবে না। গরিব মানুষ কেন এত দামি পোশাক পরবে?’
‘এরচেয়ে কম দামি পোশাক কোথায় পাব?’
‘কারখানায় অর্ডার দিলে বানিয়ে দেবে। ওদের অনেক পুরনো ও পচা কাপড় থাকে।’
‘তাহলে ছবি দিতেও সুবিধা হবে। ওদেরকে দিয়ে সঠিক মাপে বসিয়ে নেব।’
‘দুই লাখ টাকা দিচ্ছি তোমাকে। পোস্টারে আমার ছবিটা বড় করে ছাপাবে। তোমার ছবিও রাখবে। তবে আমার ছবির পাশে না, পায়ের নিচে।’
‘রঙিন পোস্টার বানাব। আমার ছবি দেব ছোট করে।’

সব ঠিকঠাকই ছিল। বস্ত্র বিতরণও শুরু হলো ভালোভাবে। বাগড়া দিলেন এক বুড়ো। লুঙ্গিটা পাল্টে দিতে বললেন। বিতরণকৃত ত্রাণ বাছাইয়ের সুযোগ থাকবে কেন! দীর্ঘ সময় লাইনে বসে ভাগ্যকে শাপশাপান্ত করা বুড়ো দেখলেন- লুঙ্গিটায় বিশাল ফুটো। ফুটো সামনে মেলে ধরায় চেতে গেলেন দবির মণ্ডল। যখন চিনে ফেললেন বুড়োর বাড়ি ইব্রাহিম পাটোয়ারীর এলাকায়; জেগে উঠল ‘প্রতিশোধ’-স্পৃহা। ধাম করে একটা ঘুষি হাঁকালেন বুড়োর বুক বরাবর। কী আশ্চর্য, বুড়ো পড়ে না গিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন। লুঙ্গিটা ছুড়ে মারলেন দবির মণ্ডলের মুখে, ‘গোলামের পুত, এই লুঙ্গি তোর মরা বাপে রে পরাইস!’

লুঙ্গি সামলানো কি সহজ কাজ! ক্যাচ মিস হলো। এসময় সামনে থেকে এক বুড়ি চেঁচিয়ে বললেন, ‘বাপ, আমি কিন্তু হেই সক্কালবেলায় আইছি।’
‘তুই কি আমারে ভোট দিছস? সত্য কইরা ক। আর সকালে এসেছিস এটা তো ভালো খবর। দেখছিস না, ক্যামেরায় কত ছবি তোলা হচ্ছে!’
‘ছবি ধুইয়া পানি খামু নাকি? ভোট না দিলে তেরান বন্ধ রাখবি? দিবি না!’
‘কেন দেব না! এই নে।’ একটা শাড়ি ছুড়ে মারলেন দবির মণ্ডল। যে ব্যক্তি ভোট ও সমর্থন দেবে না- তার হাতে কাপড় তুলে দেওয়ার মতো সৌজন্য কেন দেখাতে হবে! বুড়ি শাড়ি লুফে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলেন। এরপর শ্লেষমাখানো কণ্ঠে বললেন, ‘এইডা শাড়ি নাকি জাকাতের কাপড়?’
‘কাফনের কাপড়!’ দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বললেন দবির ম-ল। সাহস কত, মুখে মুখে তর্ক করে।
‘তোর মায়ে রে একখান দেস নাই?’ বুড়ির সব কথা কানে গেল না দবির মণ্ডলের। এমন সময় মঞ্চের পেছন থেকে ভেসে এলো গুতাগুতির শব্দটা। হুড়মুড় করে সব যেন ভেঙে ফেলবে। কোনো এক দুষ্টু ছেলে দূর থেকে বলে উঠল, ‘আইছে হাম্বা, এইবার ঠেলা সামলা!’

 
Electronic Paper