ফেসবুকে কবিতা দৌড়

ঢাকা, সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২ আশ্বিন ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

ফেসবুকে কবিতা দৌড়

খালিল ইমতিয়াজ
🕐 ৩:৩৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৩, ২০২১

ফেসবুকে কবিতা দৌড়

মধুসূদন দত্ত ও শামসুর রাহমানের ফোনালাপ।
-শামসু?
-কে?
-আমি তোর মধুদা।
-নমস্কার মধুদা।
-কী করতেছস?

-কবর থেকে বের হয়ে একজন কবিবন্ধুর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছি।
-কবর থেকে বের হলি কেন?
-মনের দুঃখে।
-কী তোর দুঃখ?
-গতকাল কবর থেকে শুনতে পেলাম, এখন ফেসবুকে একজন আরেকজনের নিমন্ত্রণে পাঁচ দিনে পাঁচটা কবিতা লেখার গরু দৌড় প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছে।
-বলিস কী শামসু? এখন তাহলে এত বাঘা বাঘা মেধাবী কবির জন্ম হয়ে গিয়েছে?
-এটাই জানার চেষ্টা করছি মোবাইল ফোনে। আমি তো আমার ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতাটাই কয়েক মাস চিন্তা করে লিখেছি, মধুদা।
-আরে শামসু, এটা তো অনেক কম। আমি সনেট লিখতে বসলে তো ঘাম ঝরা শুরু করত। অনেক চিন্তা-ভাবনা, অনেক সাধনা, প্রচুর মেধা খরচ করে আমি আমার চতুর্দশপদী কবিতাগুলো লিখতাম। আর এখন পাঁচ দিনে পাঁচ কবিতা! দুনিয়া কত এগিয়ে গেছে। মানুষের নয়, একেবারে যেন উটের কদমে।
-মধুদা, আমার বন্ধুকে পেয়েছি। আপনি একটু লাইনে থাকেন। অন্য লাইনে একটু কথা বলি, এই কবিতা দৌড় নিয়ে। কথা শেষে কতক্ষণ পর...
-মধুদা, কবিতা রেইস নিয়ে বন্ধুর সঙ্গে কথা বলেছি।
-কী বলল সে?
-বলল, এইটা হলো বর্তমানের অধিকাংশ নিম্নমানের কবিদের কবিতার রেইস। ভালো কবি যে নেই, সে এটা বলেনি। তবে এগুলোর বেশিরভাগই আগাছা, কবিতা নয়। এরা কী লেখে, এর কোনো তাল-বেতাল নেই। নিজেরাই বোঝে না। স্বঘোষিত কবি নামধারী, অধিকাংশ এদের লেখা কোনো কবিতার কাতারেই পড়ে না। পাগল-ছাগলের পেল্লাব। পাঠকের কাছে এগুলোর গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা নেই বললেই চলে। মধ্যমানের দু’চারটা, বাকিগুলো অখাদ্য। বাংলা কবিতায় এদের ভূমিকা ও সম্মান শূন্যের কোটায়। তাদের এই অথর্ব কবিতাদৌড় প্রতিযোগিতা, মৌলিক বাংলা কাব্য সাহিত্যের না জ্বর, না ঠা-া, মধুদা।
-বাঁচাইলি শামসু, ধন্যবাদ তোকে। ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। এই বাংলা কাব্য সাহিত্যের উন্নতির জন্য কত কবি, কত লেখকের কত সাধনা, কত পরিশ্রম। তিলে তিলে, পদে পদে, সোপানে সোপানে, দিনে দিনে, মাসে মাসে, বছরে বছরে, যুগে যুগে কত পরিশ্রম ও মেধার ফসল এই বাংলা কাব্য সাহিত্য। একটা সুকর্ম গড়তে শত বছর লাগে, ভাঙতে কিছু সংখক উচ্চাভিলাষী দুর্বল মস্তিষ্কের কিছু দিনের অপকর্মই যথেষ্ট। এই কবিতাদৌড়ের কথা শুনে তাই আমি অনেকটা ভীত হয়ে ছিলাম বাংলা কাব্য-সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
-মধুদা, একদম ঠিক বলেছেন। আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারব, জীবনে কোনোদিন ভাবিনি। আমাকে কীভাবে ফোন করলেন? আপনি এখন কোথায় থাকেন?
-আমি থাকি শান্তির নীড়ে। আমি এখান থেকে ইচ্ছে হলে, যে কাউকে ফোন করতে পারি। আমার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা বিধাতার তরফ থেকে। কারণ আমি একসময় বিদেশি ভাষায় কবিতা লেখা শুরু করেছিলাম। কিন্তু পরিশেষে আবার মাতৃভাষাতেই ফিরে আসি। এজন্যই বিধাতা আমার জন্য পুরস্কারস্বরূপ এখানে ফোনের ব্যবস্থা রেখেছেন।
-মধুদা, দেশের কথা বলা অনেক সওয়াবের কাজ। তাই অনেক মাস খরচ করে ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতাটি লিখে আমিও মোবাইলে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি বিধাতার কাছ থেকে। বলুন দেখি মধুদা, আপনি যদি এত মেধা খরচ না করে সনেট না লিখতেন, তাহলে কি মোবাইলের এই সুযোগটা পেতেন, বিধাতার কাছ থেকে?
-অবশ্যই নয়। ঘোড়ার আ-াও পেতাম না। পাঁচ দিনে একটা কবিতাও অনেক সময় লেখা সম্ভব নয়। কবিতা কবির ভিতরের অনুভূতি ও মন থেকে আসে। এটা সৃজনশীলতার ব্যাপার, এটা চিন্তাভাবনার নির্যাস, এটা বিধাতার তরফ থেকে আসে, এটা প্রকৃতির দান। চাইলেই লেখা যায় না। এটা প্রতিদিন হাঁসের ডিম পাড়া নয়। পাঁচদিনে পাঁচ কবিতা লেখা, এটা অনেকটা গর্দভের দৌড়।

 
Electronic Paper