ভালোবাসার ভয়

ঢাকা, সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২ আশ্বিন ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

ভালোবাসার ভয়

হেলাল নিরব
🕐 ৩:২৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৩, ২০২১

ভালোবাসার ভয়

বাসার নিচে দোকানদারকে বিশ টাকার একটা সবুজ নোট ধরিয়ে দিয়ে হাত পেতে আছি, এমন সময় সাঁই করে আরেকটা হাত ছিটকে দিল আমাকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝপাৎ করে চোখের সামনে নেমে গেল দোকানের সাটার। আমি তো হতভম্ব! চারদিকে সাটার নামানো শব্দ! একটা চাপা উত্তেজনা; লোকজনের কিঞ্চিৎ ছোটাছুটি আর ‘আইছে রে... নামা’ বলে ক্ষীণস্বরে চিৎকার। কেমন যেন একটা রহস্যে ঘেরা পরিবেশ! আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। মনে হলো মান্নার কোনো আকামের জবাবে বস্তি ভাঙতে মিশার লোকজন আসছে! কিন্তু না, এলাকায় বিধিনিষেধ চলছে, সেটা কার্যকর করতে পুলিশ আসছে।

এদিকে, যতক্ষণে আমার সংবিৎ ফিরল, ততক্ষণে আশপাশের মানুষের ছোটখাটো জটলা সৃষ্টি হয়ে গেছে। এখন আর কেউ দৌড়াচ্ছে না। সবাই খুব স্বাভাবিকভাবেই হাঁটাচলা করছে। পুলিশের নীল গাড়িটা কয়েকবার ধাক্কা খেয়ে খেয়ে ঠিক আমার সামনে এসেই থামল। আমি কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। শ্বাস বন্ধ করে ভুঁড়িটা চিমসে করে দোকানির দিকে তাকিয়ে আছি। কিন্তু, কী আশ্চর্য! বজ্জাত দোকানি আমাকে বিদায় না করে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পুলিশের সঙ্গে একপ্রকার খোশগল্প জুড়ে দিল! আমি পড়লাম মহাফাঁপরে! দোকানির কাছ থেকে পুলিশ ভাইয়েরা পান খেল, পানিও খেল; বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাড়াল, কিন্তু আমি বিদায় নিতে পারলাম না! এক ফাঁকে ছিঁচকে টাইপের এক কনস্টেবল জিজ্ঞেস করল, ‘এই ছেলে কী চাই। লকডাউন চলতাসে জানোস না!’ বেয়াদবের বেয়াদবি মনে নিলাম না। মুখে সাল্লু ভাই টাইপের একটা হাসি দিয়ে মিনমিনিয়ে বললাম, ‘একটু দোকানে আইছি স্যার! একটা...।’ পরে খেয়াল হলো ‘আমি একটা কনস্টেবলকে স্যার বলছি’! এটা কোনো সমস্যা না (সম্মান সবাইকে দেখানো উচিত)। সমস্যা হলো আমার পা কাঁপছে। পেটের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠল। মাথাটা ফাঁকা হয়ে গেছে। মিনিট ছয়েকের মাথায় পুলিশ চলে গেল। আমি দোকানিকে তাড়া দিলাম।

দোকানি বেশ ফুলে আছে। মাঝে মাঝে বিশ্রী ভাষায় গালি দিচ্ছে। আমি নাটকে স্লায্যাং ইউজ করলে যেমন পুতপুত করে শব্দ হয় আমি তার বিকল্পে ‘হুম’, ‘এমনই’ বলে তাকে সায় দিলাম। মিনিট পনের পরে আমার পাওনা বুঝিয়ে দিল দোকানি। ততক্ষণে আমার মাথা থেকে যা উবে গিয়েছিল তা আবার একটু একটু করে ফিরে আসতে শুরু করেছে।

বেশ কৌতূহলী হয়ে দোকানিকে জিজ্ঞাসা করলাম, তখন তাদের সামনে এত আলগা পিরিত দেখিয়ে এখন গালি দিচ্ছেন কেন?

দোকানি আমার দিকে চেয়ে বোকার মতো হাসল। এরপরে একটা পান মুখে দিয়ে কয়েকবার এ-গাল ও-গাল করে একটু থামল। চুনের কৌটা থেকে একটু চুন আঙুলে মাখিয়ে ‘চোউস’ শব্দ করে মুখে নিয়ে বলল, আরে এডি কইয়েন না। এডি হইতাছে ভালোবাসার ভয়!

পুলিশের গাড়িটা আবার ফেরত এলো। পরিস্থিতি আগের মতোই! ছপাৎ করে মুখের ওপর শাটার নেমে গেল। আমি আকাশে সুখ উড়িয়ে জটিল সমীকরণটার সেই সমাধান আওড়াচ্ছি ‘ভয়’! আদতে ‘ভয়’ই হচ্ছে ভালোবাসার বা কাউকে গ্রাহ্য করার প্রধান শর্ত।

 
Electronic Paper