ছেলে সমাচার

ঢাকা, শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭

ছেলে সমাচার

বিশ্বজিৎ দাস ১২:১৬ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২১

print
ছেলে সমাচার

তুই নাকি ছেলেদের দু’চোখে দেখতে পারিস না? শাপলা জানতে চাইল।
‘কে বলল?’ রিনি বলল।
‘শম্পা বলল। তোরা নাকি একই স্কুলে একসঙ্গে পড়েছিস?’
মাথা ঝাঁকাল রিনি। ওরা দুজনে অনেকদিন একই স্কুলে যাতায়াত করেছে।
‘ঠিকই বলেছে শম্পা। আমি আদতে কোনো ছেলেকেই দু’চোখে দেখতে পারতাম না।’
‘কেন?’ অবাক হয়ে জানতে চাইল শাপলা।

‘আরে দেখিস না, ওরা কত খারাপ! আর শুধু ছেলে বলে কত স্বাধীনতা পায় ওরা! সন্ধ্যার পর বাসা থেকে বের হতে পারে। তুই আমি পারব?’
‘হুম। তার জন্য ওরা খারাপ হতে যাবে কেন?’
‘আরে, ওরা যখন বুঝে যায় ছেলে হিসেবে বেশকিছু বাড়তি সুযোগ আছে, তখনই তো ওরা বখে যায়। খারাপ কাজ করেও ছাড় পেয়ে যায় বলেই না নষ্ট হওয়ার উৎসাহ পায়।’
‘ঠিকই বলেছিস।’
‘যখন আমরা স্কুলে পড়তাম, তখন একটা ছেলে শম্পাকে খুব ডিস্টার্ব করত। আমার খুব বিরক্ত লাগত।’
‘আর শম্পা? ও কিছু বলত না?’
‘প্রথম দিকে পাত্তা দিত না। পরে যখন বাড়াবাড়ি করল, ওর বাসাতে জানাজানি হওয়ার ফলে স্কুলে যাওয়াই বন্ধ হয়ে গেল শম্পার।’
‘হুমম। তুই ঠিকই বলেছিস রিনি। ছেলে মানেই খারাপ।’ সম্মতি দিল শাপলা।

দুই.
‘সব ছেলেই খারাপ না।’ মনে মনে বলল রিনি।
করোনাকালেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে কলেজের কয়েকজন স্যার প্রাইভেট পড়াচ্ছেন। রিনিও পড়তে শুরু করেছে।
প্রাইভেট টিচার ক্লাস নিচ্ছেন। বকবক করেই যাচ্ছেন। ক্লাসে মনোযোগ নেই রিনির। বারবার অজান্তে হাত চলে যাচ্ছে বেঞ্চে রাখা ব্যাগের ওপর। নতুন পাওয়া মোবাইলটা স্পর্শ করে দেখতে ইচ্ছে করছে। শুভ কোনো মেসেজ পাঠাল কিনাÑ সেটাই চেক করছে বারবার।
সবুজ ওর নতুন বয়ফ্রেন্ড। বেশ কয়েকদিন ধরেই পিছু পিছু ঘুরছিল। সাহস পাচ্ছিল না বোধহয়। শেষে রিনিই এগিয়ে গিয়ে ওর সঙ্গে কথা বলেছে।
‘অ্যাই ছেলে, তুমি কি কিছু বলবে?’
‘জি না মানে...।’ সবুজ আমতা আমতা করে বলেছিল।
‘তুমি আমার পিছু পিছু ঘুরছ কেন?’ রিনি জিজ্ঞেস করেছিল।
‘মানে, আপনাকে আমার...।’
‘আমাকে তোমার কী?’ সাহস জুগিয়েছিল রিনি।
তাতে কোনো লাভ হয়নি। সবুজ মাথা নত করেই দাঁড়িয়ে ছিল।
‘ঠিক আছে, কাল সকালে তুমি রেডি হয়ে এখানে এসে দাঁড়িয়ে থেক, আমি আসব। তারপর আমরা বেড়াতে যাব।’
‘কোথায় যাব?’ বোকার মতো জানতে চেয়েছিল সবুজ।
হেসেছিল রিনি। ছেলেটা এত বোকা!
পরদিন দুজনে মিলে স্থানীয় শিশুপার্কে বেড়াতে গিয়েছিল। সেদিনই রিনি জেনেছিল, ছেলেটির নাম সবুজ।
সব শুনে চোখ কপালে তুলে ফেলেছিল শাপলা, ‘তুই না কোনো ছেলেকে দুই চোখে দেখতে পারিস না। এখন আবার একটা ছেলের সঙ্গে ঘুরতে বেরিয়েছিস।’
‘সব ছেলে খারাপ না। এই ছেলেটা খুব ভালো। সহজ সরল।’ লাজুক হাসি হেসেছিল রিনি।

তিন.
প্রাইভেট থেকে বের হয়ে সবার থেকে আলাদা হয়ে গেল ও।
একা একা হাঁটতে লাগল। যখন দেখল, ওর সঙ্গী-সাথীরা আশপাশে নেই। মোবাইল ফোনটা ব্যাগ থেকে বের করল রিনি।
‘কী করছ জান?’ দু’দিনের পরিচয়েই সম্বোধন পাল্টে ফেলেছে ও।
‘ব্যস্ত আছি।’ ফিসফিস করে বলল সবুজ।
‘কী নিয়ে ব্যস্ত গো? আমি ছাড়া আর কী তোমাকে এত ব্যস্ত রেখেছে?’
‘আমি টয়লেটে। বড় কাজ সারতে চাইছি। হচ্ছে না।’
‘বেশি করে পানি খাও।’
‘টয়লেটে বসে পানি কই পাব। বদনার পানি খাব।’ বিরক্ত হয়ে বলল সবুজ।
‘বাইরে এসে হাঁটাহাঁটি কর।’
‘বাইরে এখন যেতে পারব না। গেলে ধরা পড়ে যাব।’
‘ধরা পড়ে যাবে? মানে কী?’
‘আরে, সকালে উঠে বিড়ি না খেলে আমার টয়লেট ক্লিয়ার হয় না। তাই বিড়ি ধরিয়েছি।’
‘এ মা! তুমি বিড়ি খাও!’
‘তো কী করব। সিগারেট খাব!’
‘খাবে। বিড়ি খায় তো রিকশাওয়ালা, অটোওয়ালা। তুমি সিগারেট খাবে।’
‘সিগারেট কেনার টাকা কে দেবে শুনি- তুমি?’
‘দেব। তুমি আমাকে মোবাইল ফোন কিনে দিতে পার, আর আমি তোমাকে সিগারেট কিনে দিতে পারব না!’
‘আমি তোমাকে মোবাইল ফোন কিনে দিইনি।’
‘তাহলে?’
‘ওটা আরেক বন্ধবীর। আমাকে গিফট করেছে। আমার ভালো লাগে না। সেটাই তোমাকে দিয়েছি।’
‘তুমি অন্য বান্ধবীর দেওয়া মোবাইল ফোন আমাকে দিয়েছ? ছি ছি, তুমি এত খারাপ!’
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এলো না।
‘কী হলো, কথা বলছ না কেন? কে সেই বান্ধবী? কার ফোন তুমি আমাকে এনে দিয়েছ। তুমি এটা চুরি করে আনোনি তো?’
ওপাশ থেকে কোনো জবাব এলো না।
‘কী হলো? উত্তর দাও।’ চেঁচিয়ে উঠল রিনি। ভুলেই গেছে রাস্তায় হাঁটছে ও।
‘আপা, আপনি কার সঙ্গে ঝগড়া করতাছেন?’ ওপাশে দাঁড়ানো রিকশাওয়ালা বলল।
‘তাতে আপনার কী?’ ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলল রিনি।
‘এখানে তো কেউ নাইক্যা। তাই জিগাইলাম, কার লগে ঝগড়া করেন আপা?’ রিকশাওয়ালা হেসে বলল।
‘আমি মোবাইল ফোনে কথা বলছি একজনের সঙ্গে।’
‘আপা, মোটরসাইকেলে চইর‌্যা দুইটা পোলা তো আপনার মোবাইল ফোন লইয়া গেছে গা। আপনি টের পান নাইক্যা।’
রিকশাওয়ালা যেন বোমা ফাটাল।
রিনি অবাক হয়ে কান থেকে হাত নামাল।
হাত শূন্য!
মোবাইল ফোন নেই!