শত সংখ্যায় বাংলাওয়াশ

ঢাকা, বুধবার, ২০ জানুয়ারি ২০২১ | ৭ মাঘ ১৪২৭

শত সংখ্যায় বাংলাওয়াশ

বাংলাওয়াস ডেস্ক ৪:৫৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৪, ২০২০

print
শত সংখ্যায় বাংলাওয়াশ

বাংলাওয়াশের ১০০
আহসান হাবীব
খোলা কাগজের ফান সাপ্লিমেন্ট ‘বাংলাওয়াশের’ ১০০তম সংখ্যায় লেখার অনুরোধ এসেছে। যে অনুরোধ করেছে সে আমার খুব পছন্দের এক তরুণ। তাকে না করি কীভাবে? তাছাড়া অনুরোধের ঢেঁকি গিলতে আমরা বাঙালিরা যথেষ্ট পছন্দ করি। মাঝে মধ্যে ফ্রি ফ্রি একাধিক রাইস মিলও গিলে ফেলি। তার মানে দুইয়ে দুইয়ে চার (অবশ্য আজকাল নাকি দুইয়ে দুইয়ে মাঝে মধ্যে ২২ও হয়ে যায় বলে শুনেছি)! তাই সিদ্ধান্ত নিলাম লিখব...।

১০০ সংখ্যাটা আসলে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তিন ডিজিটের সংখ্যাটা নিয়ে কিন্তু ফানের অন্ত নেই। সবচেয়ে কমন ফানটা তো আমরা জানিই। সেই যে এক বাচ্চা এসে মাকে বলল সে অঙ্কে মাত্র এক-এর জন্য একশ’ পায়নি। মা জানতে চাইলেন কত পেয়েছে? সে গম্ভীর হয়ে জানাল ‘দুইটা শূন্য’!

বলা হয়ে থাকে বাঙালি নাকি একাই ১০০! তবে সমস্যা হচ্ছে ওই ১০০ বাঙালিকে এক করা আবার খুবই কঠিন কর্ম।

তখনও ৫০০ টাকার নোট আসেনি, বাজারে আছে শুধু ১০০ টাকার নোট। তখন এক নকলবাজ ১০০ টাকার নোট জাল করতে শুরু করল। এবং ভুল করে একবার ৭০ টাকার নোট বানিয়ে ফেলল একটা। কী করা? তারপর সে নোটটা চালাতে ট্রাই করল এক মুদির দোকানে।

দোকানিকে ৭০ টাকার নোটটা দিয়ে বলল— ভাই, ভাংতি হবে?
—হবে।
নকলবাজ তো ভিতরে ভিতরে চমকিত। মুদির দোকানদার গম্ভীর হয়ে দুটো নোট ফেরত দিল। নকলবাজ দ্রুত নোটটা নিয়ে চলে এলো, দেখে দুটো ৩৫ টাকার নোট।

এক ক্রিকেটার জীবনেও সেঞ্চুুরি করেনি (সেই ১০০)! সেই ক্রিকেটারের রোখ চেপে গেল। সেঞ্চুরি তাকে করতেই হবে, বাই হুক অর ক্যাপ্টেন জেমস কুক। সে বল ছুড়ে দেওয়ার মেশিন আর ব্যাট নিয়ে চলে গেল এক প্রত্যন্ত এলাকায়। যেখানে কোনো মানুষজন নেই।

তারপর বল ছোড়ার মেশিন চালু করে সে ব্যাটিং শুরু করল (এ মেশিন সর্বোচ্চ পর পর ২০টি বল ছুড়ে দিতে পারে)। শুরু হলো ব্যাটিং, মেশিন থেকে একটা একটা করে বল ছুটে আসে আর সে প্রতিবলেই ছক্কা মারতে লাগল। আর কী আশ্চর্য, ষোলটা পর পর ছক্কা আর একটা বাউন্ডারি মেরে সে সেঞ্চুরি করে ফেলল (৬ঢ১৬ = ৯৬+৪ = ১০০)!

—ঈশ্ব র, এ ক্রিকেটারকে তো বিশেষ এক অপরাধে আপনার শাস্তি দেওয়ার কথা ছিল কিন্তু এ দেখছি উল্টো সেঞ্চুরি করে ফেলল। উপরে মেঘের মধ্যে বসে বলল এক এঞ্জেল।
—এটাই ওর শাস্তি।
—কীভাবে ঈশ^র?
—ও যে সেঞ্চুরি করল, কেউ কি দেখেছে?
—না।
—কোনো সাক্ষী নেই তার এ সেঞ্চুরির, এ মানসিক যন্ত্রণাটাই ওর শাস্তি।
‘থিওরি অব আনসার্টেনিটি’র নোবেল প্রাইজ পাওয়া বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ তখন ছাত্র। কোনো একটা পরীক্ষায় বসেছেন। এক জটিল প্রশ্নের উত্তরে তিনি ইচ্ছে করে পদার্থবিজ্ঞানের আলোকে সঠিক উত্তরটি দেননি। তখন তার প্রফেসর রেগে গিয়ে তাকে ডেকে তার কারণ জানতে চান। হাইজেনবার্গ বলেন ‘পদার্থবিজ্ঞানের আলোকে এ প্রশ্নের ১০০টা সঠিক উত্তর আমি জানি... কোন উত্তরটা লিখব এটা ভাবতে ভাবতেই...! ’
তার মানে প্রিয় পাঠক, বুঝতেই পারছেন ১০০ সংখ্যাটি কতভাবে আমাদের জীবনে এসেছে বারবার, এখনো আসছে।
সব শেষে ১০০ নিয়ে আর একটি মাত্র গল্প! আমার উন্মাদ অফিসে এক তরুণ একদিন একটি রম্য গল্প নিয়ে এলো। গল্পের শেষ লাইনে সে ডট ডট দিয়েছে অসংখ্য। সাধারণত ডট ডট থাকে তিনটা। আমি বললাম, শেষ লাইনে এত ডট ডট কেন?
—স্যার, ইচ্ছে করেই ১০০টা ডট দিয়েছি।
—কেন?
—স্যার, গল্পের গভীরতা বোঝাতে।
—কিন্তু তিনটার বেশি ডট দেওয়ার নিয়ম নেই। আবারও তিনটা ডট দিতে চাইলে একটু গ্যাপ দিয়ে আবার তিনটা ডট ডট ডট (...) কিন্তু কখনই ১০০টা নয়। দেশের একমাত্র বানান ভুলসর্বস্ব পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে আমার জ্ঞানদানে সে বিশেষ সন্তুষ্ট হলো বলে মনে হলো না। তারপর আমি ভাবলাম এ ১০০ ডটের রম্য লেখককে আরেকটু জ্ঞান দিই। বললামÑ তিন ডটের অর্থ জানো তো?
—জি না। কী?
—অ্যান্ড সো অন!
অ্যান্ড সো অন ১০০ হওয়ার জন্য শুভেচ্ছা বা অভিনন্দন! এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক যেটাই গ্রহণ করেন।

ওয়াশ করে দিক সকল জঞ্জাল

সুমন্ত আসলাম

সম্ভবত শুরুটা ‘কার্টুন’ পত্রিকা দিয়ে। তারপর এল ‘উন্মাদ’। একটা পাঠকগোষ্ঠী সৃষ্টি হলো দেশে, যারা কার্টুন দেখতে চায় এবং স্যাটায়ার এবং মজার লেখা পড়তে চায়। আর আমাদের নিয়মিত পড়ার প্রথম দিকটা শুরু ওসব অন্যধারার পত্রিকা পড়েই। ‘উন্মাদ’ পত্রিকায় ছাপানো লেখা নিয়ে ভিউকার্ডের মতো স্টিকার বের হতো সে সময়, সারা দেশে যা তুমুল জনপ্রিয় ছিল। সেসবের মধ্যে একটা ছিল— মাইরের মইধ্যে ভাইটামিন আছে।

‘ম্যাড’ এবং ‘পাঞ্চ’ নামে দেশের বাইরের দুটো স্যাটায়ার ম্যাগাজিন ছিল, আমাদের দেশে নিয়মিত পাওয়া যেত। ওসবও দেখতাম আমরা। তারপর দেশে নতুন একটা দৈনিক পত্রিকা এলো— ‘প্রথম আলো’, তার সঙ্গে এল সাপ্তাহিক— ‘আলপিন’।

দৈনিক পত্রিকার সঙ্গে শুরু সেখান থেকেই।

তারপর যতগুলো দৈনিক পত্রিকা এসেছে দেশে, সঙ্গে একটা করে স্যাটায়ার ম্যাগাজিন এনেছে সবাই। এরই ধারাবাহিকতায় দৈনিক খোলা কাগজও একটা স্যাটায়ার ও ফান সাপ্লিমেন্ট এনেছে— ‘বাংলাওয়াশ’।

বাংলাওয়াশ নামটার মধ্যে বেশ অভিনবত্ব আছে। সম্ভবত নামটা এসেছে ক্রিকেট খেলার হোয়াইট ওয়াশ শব্দটা থেকে।

বাংলাওয়াশ যিনি সম্পাদনা করেন, ফান ও স্যাটায়ার ম্যাগাজিনের জগতে সেই শফিক হাসানের ইতিহাস খুবই সমৃদ্ধ। ‘আলপিন’ থেকে শুরু করে প্রায় সব স্যাটায়ার ম্যাগাজিনে লিখেছেন তিনি। এটাকে কেবল লেখা বললে ভুল হবে, ভালো ভালো সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লিখেছেন তিনি। এরকম একজন লেখকের পক্ষেই এরকম একটা সাপ্লিমেন্ট সম্পাদনা করা সাজে এবং তিনি সেটাই করছেন।
সফলও হয়েছেন।

‘বাংলাওয়াশ’ আমি নিয়মিত দেখি। বেশ ভালো হয়। তবে লেখাগুলোর মতো আঁকাগুলোও হলে এক শ’তে একশ’ হতো।
মত প্রকাশের এ দুর্যোগময় সময়ে অনেক স্যাটায়ার ম্যাগাজিনই বন্ধ হয়ে গেছে, সেখানে বাংলাওয়াশ একশ’ সংখ্যায় পা রাখল, এটাই এটার মূল সার্থকতা। আরও কয়েকশ’ সংখ্যায় পথ চলুক বাংলাওয়াশÑ প্রত্যাশা ও কামনা এটাই। ধন্যবাদ ‘খোলা কাগজ’, অভিনন্দন ‘বাংলাওয়াশ’।


অভিনন্দন সেঞ্চুুরিতে!
অমল সাহা

পৃথিবীর সকল সাহিত্যেই রম্য সাহিত্যের একটি বেগবান ধারা উপস্থিত ছিল। এখনো আছে তবে সে ধারা যেন কিছুটা মিয়ম্রাণ। আমাদের বাংলা রম্য সাহিত্যে পরশুরাম, শিবরাম চক্রবর্তী, আবুল মনসুর আহমদ, খন্দকার আলী আশরাফ রম্য ঘরানার লেখা লিখেই খ্যাতিমান হয়েছিলেন। আবার সিরিয়াস সাহিত্যের মধ্যেও এক ধরনের তীক্ষè বিদ্রুপ হাস্যরসের মধ্য দিয়ে সাহিত্যে পরিবেশন করেছেন। এর মধ্যে নমস্য সর্বজনমান্য সৈয়দ মুজতবা আলী, আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন, হুমায়ূন আহমেদ, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও আহসান হাবীব। রম্য মানে শুধু নিছক হাসির জন্য হাসি নয়। পেছনের বেদনাকে বিপরীত রসে জারিত করে পরিবেশন করা। এখানে মানুষের অর্থহীন কাজ, ভাবনা বা তার চারদিকের অসামঞ্জস্যতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করাই রম্য রচনার মূল উদ্দেশ্য।

সে যাই হোক, সত্য ভাষণে বলতে গেলে, সংখ্যার দিক থেকে ক্ষয়িষ্ণু একটা পাঠক সমাজে প্রধানতম নয় এমন একটি দৈনিক পত্রিকার রম্য সাময়িকী ‘বাংলাওয়াশ’-এর ১০০তম সংখ্যায় পৌঁছানো একটি উদযাপনযোগ্য ঘটনা। দৈনিক খোলা কাগজ পত্রিকার কর্তৃপক্ষ রম্য সাময়িকীর জন্য সপ্তাহে একটি পৃষ্ঠা বরাদ্দ করে এসেছেন এটিও উল্লেখযোগ্য ঘটনা। কারণ যেখানে বড় বড় পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী এবং শিশুদের জন্য বরাদ্দ শিশুসাহিত্য সাময়িকীর পূর্ণ পৃষ্ঠা থেকে অর্ধ পৃষ্ঠায় নেমে এসেছে সেক্ষেত্রে খোলা কাগজ রম্য সাময়িকী ১০০তম সংখ্যার মাইলফলক স্পর্শ করেছে। এ জন্য পত্রিকা কর্তৃপক্ষ ও সর্বোপরি পাঠককুল ধন্যবাদার্হ। আরেকটি বিষয়ও প্রণিধানযোগ্য, পাঠককুলের উল্লেখযোগ্য সাড়া না থাকলে এ ধরনের একটি পাতা চালিয়ে যাওয়া কষ্টকর বা অর্থহীনও হয়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রেও আশা করি খোলা কাগজ সফল হয়েছে।

অভিনন্দন ‘বাংলাওয়াশ’ রম্য সাময়িকীকে এবং খোলা কাগজ পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে।


ধোলাইয়ের আরেক নাম হোক ‘বাংলাওয়াশ’
ইমন চৌধুরী

‘বাংলাওয়াশ’ নামটির মধ্যে কী যেন একটা ব্যাপার আছে। শুনলেই মনে হয় একদল লোক চ্যালা কাঠ নিয়ে তেড়েফুঁড়ে আসছে! আর আরেক দল সেই চ্যালা কাঠের ধোলাই থেকে বাঁচতে যে যেদিকে পারছে ছুটে পালাচ্ছে। যদিও যাদের ছুটে পালানোর কথা, তাদের গায়ের চামড়া গণ্ডা রের মতো! মোটামুটি বেশ মোটা! দৈনিক পত্রিকার রম্য ও বিদ্রুপ সাময়িকীগুলো একসময় তেড়েফুঁড়েই আসত। যাকে ধরত তার অবস্থা কেরোসিন! এখন আর সেরকম তেড়েফুঁড়ে আসে না। হয়তো জলবায়ুর প্রভাব! বিশ্বজুড়ে জলবায়ুর নানা রকম প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। দৈনিক পত্রিকার রম্য ও বিদ্রুপ সাময়িকীগুলোইবা বাদ যাবে কেন!

দৈনিক খোলা কাগজ-এর রম্য ও বিদ্রুপ সাময়িকী ‘বাংলাওয়াশ’ এরমধ্যে দুই বছর পার করে দিয়েছে। পা রেখেছে শত সংখ্যায়। এটা একটা ভালো খবর। আশার খবরও। এ দুর্মূল্যের বাজারে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা চাট্টিখানি কথা না। সবাই ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ হজম করতে পারে না। অনেকের বদহজম হয়! তারা তাই যম হয়ে উঠতে চায়! এতকিছুর পরও ‘বাংলাওয়াশ’ সে কাজটি ভালোই চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ‘বাংলাওয়াশ’-এর বিভাগীয় সম্পাদক শফিক হাসান ভালো করেই জানেন, কীভাবে ধোলাই করতে হয়! তিনি নিজেও সামাজিক অসঙ্গতি নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ লিখে বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। সুতরাং ধোলাই দেওয়ার অভিজ্ঞতা তারও কম নেই। বাকি পথটুকুও তার হাত ধরে এগিয়ে যাক ‘বাংলাওয়াশ’। নীতিহীন, ঘুষখোর, টাউট-বাটপাড়, দখলবাজ, দুর্নীতিবাজ সবার বিরুদ্ধেই সমানতালে আক্রমণ অব্যাহত রাখুক ‘বাংলাওয়াশ’। হয়ে উঠুক আরও পাঠকপ্রিয়। ‘বাংলাওয়াশ’-এর শত সংখ্যায় পদার্পণে শুভেচ্ছা।

একটি অনুভূতির নাম
শিমুল শাহিন

বিজ্ঞানের মতে মানুষের পাঁচ ধরনের সেন্স থাকে। দৃষ্টি সেন্স, শ্রবণ সেন্স, স্পর্শ করে অনুভূতি লাভের সেন্স, স্বাদ গ্রহণের সেন্স আর ঘ্রাণ নিতে পারার সেন্স। এ পাঁচ ধরনের সেন্সের বাইরেও নাকি অন্য আরেকটি সেন্স আছে, অবশ্য লোকে বলে এটা খুবই অপ্রতুল— তা হলো সেন্স অব হিউমার। আমার একজন প্রিয় শিক্ষক যখনই আমার সঙ্গে দেখা হতো বলতেন, ‘যতই দিন গড়াচ্ছে ততই মানুষ সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে রে। সেন্স অব হিউমার বলে যে একটা জিনিস আছে সেটাও সবার থেকে বিলুপ্তির পথে! তোর ভিতরে এ জিনিসটা আছে, হারিয়ে যেতে দিসনে!’ প্রিয় শিক্ষকের কথাটার কোনো প্রভাব ছিল কিনা জানি না, তবে দৈনন্দিন জীবনের বাইরে সুযোগ পেলেই এই ‘সেন্স অব হিউমার’ অর্থাৎ বা সূক্ষ্ম রসবোধ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে দু’চার কলম লিখতেও লাগলাম।

হতাশার কথা এই— মানুষের আচরণ থেকে যেমন বিদায় নিচ্ছে রসবোধ, তেমনি দেশের প্রথম সারির পত্রিকাগুলো থেকেও বিদায় নিচ্ছে রম্য আর বিদ্রুপাত্মক পাতাগুলো। কথায় আছে হতাশার গাঢ় অন্ধকারেরও আধো আলো আছে। দৈনিক খোলা কাগজের রম্যপাতা ‘বাংলাওয়াশ’ যেন সেই হতাশার গাঢ় অন্ধকারে আশার একবিন্দু আলো হয়েই এলো আমাদের জীবনে।

‘বাংলাওয়াশ’ শুধুই নিখাদ হাস্যরস ভা-ার নয়। বরং হাস্যরসকে উপজীব্য করে সমাজের নানান অসঙ্গতি তুলে ধরার অনন্য প্লাটফর্মের নাম। বাংলাওয়াশ পাঠকদের যেমন হাস্যরসের খোরাক মেটায়, তেমনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ, কোনটা ক্ষতিকর বা কোনটা অপ্রীতিকর।

বাংলাওয়াশে লেখা শুরু করেছি এ পাতার পথচলার শুরুর দিক থেকেই, এখন অবধি লিখছি। এ যাত্রায় বাংলাওয়াশে দেখেছি অনেক স্বনামধন্য লেখকদের লিখা। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাওয়াশ নতুন লেখকদের সুযোগ দিয়ে তাদের উৎসাহিত করার চেষ্টাটাও চোখ এড়ায়নি। দেখতে দেখতে বাংলাওয়াশ সেঞ্চুরি পূর্ণ করতে যাচ্ছে। বাংলাওয়াশ দীর্ঘদিন তার পাঠকদের অনাবিল আনন্দ দেবে, সবার মাঝে রসবোধ জাগ্রত করবে এটাই চাওয়া। বিভাগীয় সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অফুরান ধন্যবাদ এবং শুভেচ্ছা।

‘ওয়াশ’ চলতে থাকুক
সাইফুল ইসলাম জুয়েল

বাংলাওয়াশ সেঞ্চুরি করেছে! বাংলাদেশের ফান ম্যাগাজিনের জগতে সে সর্বশেষ সেঞ্চুরিয়ান।

আজ থেকে ১০-১৫ বছর আগে বাংলাদেশের ফান পাতাগুলোর রমরমা অবস্থা ছিল। কিন্তু এখন...! মনে আশঙ্কা জাগে, বাংলাওয়াশের পরে কি আর কেউ সেঞ্চুরির মাইলফলক স্পর্শ করতে পারবে? আশঙ্কার কারণ হলোÑ সেঞ্চুরির এই দৌড়ে বাংলাওয়াশের আশপাশে তো বটেই, খোদ ময়দানেই যে কেউ নেই!

উল্টো, এখন বরং সেই গল্পের মতো করেই গুনতে হয়— ‘হারাধনের নয়টি গেল, রইল বাকি...?’ কেননা, আজকের কাগজের ফাটাফাটি, ইনকিলাবের উপহার, সিগন্যাল, প্রথম আলোর আলপিন, রস+আলো, সমকালের দূরবীন, প্যাঁচআল, কালের কণ্ঠের ঘোড়ার ডিম, সংবাদের বাঁশ, আমার দেশের ভিমরুল, সকালের খবরের ঃড়ড়-ফান, আমাদের সময়ের অ্যান্টিভাইরাস, মানবকণ্ঠের ফানটুশ ইত্যাদি তো গেল...।

এখন যুগান্তরের বিচ্ছু, ইত্তেফাকের ঠাট্টা (করোনার কারণে ‘ঠাট্টা’ আপাতত প্রকাশ হচ্ছে না। উল্লেখ্য, ইত্তেফাকে এক সময় রসগোল্লা নামে একটি ফান পাতা ছিল, সেটি পরে বন্ধ হয়ে যায়), বাংলাদেশ প্রতিদিনের রকমারি রম্য, নয়া দিগন্তের থেরাপি পাতাগুলো হারাধনের অবশিষ্ট ছেলে হিসেবে টিকে আছে বটে, কিন্তু কোন সময় যে ‘প্রদীপ নিভিয়া গেল’ বাণী ছাড়তে হয়, কে জানে! কয়েক বছর আগেও বাজারে একটি নতুন পত্রিকার আগমন ঘটলে তাতে ফান পাতার অস্তিত্ব সগৌরবেই দেখা যেত।

বড় বাজেটের পত্রিকাগুলো বের করত ১৬ পৃষ্ঠার ফান ম্যাগাজিন (পরবর্তী সময়ে তার কয়েকটি ৮ পৃষ্ঠার ট্যাবলয়েডে রূপান্তরিত হয়)। অন্যরাও যথাসাধ্য ফান পাতা রাখার চেষ্টা করত। পাঠক বৃদ্ধিতে, অনেক তরুণ লেখকের উঠে আসার পেছনে এ বিভাগের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু ইদানীং সেই ধারা থেকে পত্রিকাগুলো বেরিয়ে আসছে। কেন? এর অবশ্য কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ নেই। তবে ফানপ্রিয় বাঙালি জাতি নিজেকে নিয়ে ফান নিতে পারে না, এটাই হয়তো বড় কারণ! তাছাড়া ফেসবুকও এখন নুডলসের মতো ২ মিনিটের ‘ইন্সট্যান্ট’ ফানক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এসবের মাঝেও বাংলাওয়াশ নতুন মাইলস্টোনে পৌঁছাল। বাংলাওয়াশকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

শত গল্প
মুহা. তাজুল ইসলাম

নিজেকে অত্যন্ত মেধাবী ভাবতাম। এমনটি অনেকবারই হয়েছে যে, গণিতে ১ নম্বরের জন্য ১০০ পাওয়া হয়নি। অবশ্য ১০০ হবেইবা কী করে, স্যাররা আমাকে বরাবরই ০০ (শূন্য) দিতেন। কৃপণতা না করে আর ১ দিলেই-না ১০০ পাওয়া হতো! এজন্য আমার আফসোস হলেও সেটা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। স্কুলের গ-ি ঠিকই পার করেছিলাম ১০০ পেয়েই। তবে শূন্যের সঙ্গে বাঁয়ে বসিয়ে না; গণিতে ৩৩, ইংরেজিতে ৩৩ আর বিজ্ঞানে ৩৪, এ তিনটির প্রাপ্ত নম্বর যোগ করে ১০০ পেয়ে।

১০০-এর গল্প আরও আছে। ছোটবেলা থেকে ১০০টি প্রেম করার ইচ্ছে নিয়ে বড় হয়েও অগণিতবার প্রেমে পড়ে, অবশেষে ব্যর্থ হয়ে ১০টা প্রেমও করা সম্ভব হয়নি সুন্দরী রমণী আর পাশের বাড়ির ভাবিদের পাত্তা না পেয়ে। দুঃখে-কষ্টে তাই যখন কবিতা লেখা শুরু করলাম, মানুষ তা পড়ে অসুস্থ হয়ে যেতে থাকলে বাদ দিলাম তা-ও। এবারও পার হলো না ১০০!

দুই.
সমাজের অসঙ্গতি রম্য লেখার মাধ্যমে তুলে ধরা আলপিন-এর পর, একে একে বন্ধ হয়েছে রস+আলো, প্যাঁচআল। ছোট হয়ে এসেছে বিচ্ছুর পরিসর; কবে শুরু হবে ঠাট্টা আমরা কেউ জানি না। জীবনের গল্পের মতো করে যখন ছোট হয়ে এসেছে আমাদের রম্য লেখার পরিসর। তখন শেষে এসে অবশেষে বাংলাওয়াশ আমাদের মতো রম্য লেখকদের জন্য এক টুকরো প্রশান্তি।

করোনা মহামারীর সময়েও যা চলেছে বীরদর্পে, বিভাগীয় সম্পাদক মহোদয় যেখানে নিজের লেখা বাদ দিয়ে সুযোগ করে দিয়েছেন অন্য সবাইকে। এ বাংলাওয়াশ পৌঁছে গেছে আজ ১০০-তে। অসংখ্য ধন্যবাদ খোলা কাগজ কর্তৃপক্ষকে। প্রতিনিয়ত সহায়তা করার জন্য। কখনো সে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরার ক্ষেত্রে। কাটা-ছেঁড়া করেনি কোনো সত্য প্রকাশের লেখা। বাংলাওয়াশের পথচলা ১০০ থেকে হোক ১০০০-এ। সেখান থেকে আরও দূরে... বহু দূরে...।


১াই ১০০
শফিক হাসান

দিনগুলো সোনার খাঁটায় দূর অস্ত, মাটির খাঁচায়ও থাকে না! নইলে এত দ্রুত কেনইবা বাংলাওয়াশকে ১০০ হাঁকাতে হবে! মনে হচ্ছে এই তো সেদিন (মানে কিনা গত শনিবার!) সম্পাদক ড. কাজল রশীদ ডাকলেন। সিদ্ধান্ত জানালেন, এখন থেকে খোলা কাগজ সাপ্তাহিক আয়োজন হিসেবে রম্যপাতা বের করবে। অন্য ফিচার পাতাগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এটা প্রকাশিত হবে মঙ্গলবার থেকে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে আমাকেই!

বিভিন্ন ফান ম্যাগাজিনে লেখা এবং রম্যের নামে ছ্যাবলামি করার অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে পুরনো। সেটাই যেন কীভাবে জেনে ফেলেছেন সম্পাদক। সুতরাং আমাকেই তার মনে ধরল! বুঝতে পারলাম না, এমন সংবাদে খুশি হব নাকি বেজার হব! ভাবাভাবির সুযোগ পেলাম না। সম্পাদক জানতে চাইলেন নাম কী হবে? অফিসে ভোটাভুটি হলো। নির্বাচিত হল শিমুল জাবালির নামকরণ— বাংলাওয়াশ। কিন্তু কী দিয়ে বের করব পাতা, লেখা কই, আঁকা কই! ঢাল-তলোয়ার কিছু একটা তো অবশ্যই লাগবে।

ঠাকুরগাঁও থেকে আঁকা দিয়ে এগিয়ে এলেন মানিক বর্মন, লেখা দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে রুবেল কান্তি নাথ এবং আরও কেউ কেউ। বেরিয়ে গেল প্রথম সংখ্যা। এই করতে করতে এলো ১০০-র দিন। একাই ১০০ বলে না, বাংলাওয়াশ আজ সেটাই! কী করতে পেরেছি? অনেক কিছুই আসলে করতে পারিনি নানা সীমাবদ্ধতার কারণে। ঘরের কথা ‘পর’কে জানাতে নেই। তাই ওই পথে গেলাম না। তবে শেষপর্যন্ত আত্মতৃপ্তি একটাই মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে না পারলেও অকাজে ব্যস্ত রাখার উপকরণ দিতে পেরেছি। আর এতে হাত মকশো করার সুযোগ পেয়েছেন কতিপয় নবীন লেখক। এরা নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে রম্য সাহিত্যে দ্যুতি ছড়াবেন। (ইয়ে... এই সুযোগে নিজেকে বড় বানিয়ে বিজ্ঞাপনটা করে নিলাম আর কি)!

শত সংখ্যা
আবু সাইদ

পর্বটা ঠিক শত,
চলবে আরও কত?
সপ্তাহ মাস বছর বছর
চাইবে পাঠক যত।

অপেক্ষাতে থাকি,
যেমন চাতক পাখি,
বাংলাওয়াশের পাতা পেলে
ভাবি নিজে লাকি।

রম্যগল্পে ভরা,
মাঝে মাঝে ছড়া,
কার্টুন থাকে মনের মতো
ভালো লাগে পড়া।

আহা কী গেটআপ!
দক্ষ হাতের ছাপ,
এই পাতাটি ছড়িয়ে চলুক
আনন্দ উত্তাপ!

শত শত
হামীম রায়হান

মেহরাব হোসেন অপির বাংলাদেশের হয়ে ক্রিকেটে একদিনের খেলায় প্রথম শতক করার মুহূর্তটা আমার এখনো মনে আছে। মনে আছে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের প্রথম টেস্ট শতকের কথাও। চোখের সামনে জ¦লজ¦ল করছে আশরাফুলের সেই ইতিহাস গড়া শতকের কথা। এত সব শতকের কথা বলছি কেন ভাবছেন? বলছি কারণ আজ ‘বাংলাওয়াশ’-এর শতসংখ্যা বেরোচ্ছে। শতক করাটা সহজ নয়। বাংলাওয়াশ শব্দটা যেহেতু ক্রিকেট থেকে আসা। তাই কিছু কথা তো ক্রিকেট নিয়ে বলতেই হয়। দেখেছি ‘গড অব ক্রিকেট’ খ্যাত শচীন টেন্ডুলকার কতবার যে নব্বইয়ের ঘরে নার্ভাসের কারণে আউট হয়েছিলেন তার কোনো হিসাব নাই। আবার তিনি যখন শতক করেন তখন তার দলকে হারতে হয়, এমন অপবাদও তার শতকের সঙ্গে জড়িত!

শতকের সঙ্গে আমার শৈশবের ঈদের স্মৃতিও জড়িত। চেষ্টা করতাম যাতে ঈদ সেলামি একশ’ টাকা হয়। একশ’ হলেই তারপর যা পেতাম তা ছোট ভাইকে দিয়ে দিতাম।

সে যাই হোক, দেশের অনেক বড় বড় জাতীয় দৈনিক রম্যপাতা/ ম্যাগাজিন বের করত। কিন্তু দেখা গেল প্রথম সারির দৈনিকগুলো এক অজানা কারণে সেই প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। অনেকের রম্য ম্যাগাজিন ছোট হতে হতে আজকাল রম্য কলাম হিসেবে মাঝে মাঝে বের হয়। এর কারণ অজানা, আগেই বলেছি। তবে একটি কারণ হয়তো এটাই, গুণগতমান সম্পন্ন লেখক বা লেখা না পাওয়া। রম্য লেখা সহজ বিষয় নয়। আহসান হাবীবরা তো হুট করে দ্বিতীয়টা জন্মান না। অনেক মাজা-ঘষা করে বের করতে হয়! শত প্রতিকূলতার পরও কয়েকটা জাতীয় দৈনিক এখনো রম্যপাতা বের করছে। তাদের মধ্যে অন্যতম খোলা কাগজের ‘বাংলাওয়াশ’। এর মূল প্রাপ্তিটা হয়তো এটাই, তার প্রকাশনা শুরু হয় যখন অন্য দৈনিকের রম্যপাতা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, তখনই যাত্রা শুরু করে ‘বাংলাওয়াশ’।

বাংলাওয়াশ মানে খাঁটি বাংলা ধোলাই। ধোপি ঘাটে গেলেই দেখা যাবে বাংলাওয়াশ কাকে বলে। সেখানে মন্ত্রীর কাপড় হোক আর কামলার কাপড়। সবগুলোকে একইভাবে পেঁদানো হয়। এ যাত্রায় কেউ সাফ হয়, আর কারও হায়াত ফুরিয়ে আসে। বাংলাওয়াশ-ও একই কাজটি করে যাবে বলে আশা করি।