সাহস

ঢাকা, শনিবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২১ | ২ মাঘ ১৪২৭

সাহস

বিশ্বজিৎ দাস ২:৫০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৭, ২০২০

print
সাহস

‘স্যার!’ ফোনের ওপাশে ফুঁপিয়ে উঠল মেয়েটি।
‘কে তুমি?’ বিরক্ত মুখে জানতে চাইল আহসান। করোনাকাল চলছে। প্রাইভেট পড়ানো বন্ধ। তাই দুপুরে খাওয়ার পর ভাতঘুমটা একেবারে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে ওর। সেই ঘুম ভাঙিয়ে পরিচয় না জানিয়ে কেউ যদি ফোনের ওপাশে ফোঁত ফোঁত করে কাঁদে- বিরক্ত লাগবেই।
‘স্যার!’ আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল মেয়েটি।
‘আরে, কী আশ্চর্য! বলবে তো তুমি কে; কী দরকার?’
‘স্যার, আমি জানা।’
‘জানলাম। এখন বলো কেন ফোন করেছ?’

‘স্যার, আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি জানা। এবছর এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলাম।’ মেয়েটির ফোঁপানো থেমেছে।
চুপ করে রইল আহসান। সত্যি সত্যিই মেয়েটির কথা মনে পড়ছে না। ব্যাচ করে প্রাইভেট পড়ায় ও। একেক ব্যাচে বিশ পঁচিশ জন ছাত্র-ছাত্রী থাকে। সবার নাম মনে রাখা মুশকিল। মনে থাকেও না। দেখা গেছে, ছাত্র-ছাত্রীরা পড়া শেষ করে চলে গেলেই পুরনো ছাত্র-ছাত্রীদের নাম আর মনে থাকে না। দু’একজনের কথা অবশ্য মনে থাকে। ব্যতিক্রম তো সব জায়গাতেই আছে।
‘বলো কী বলবে?’ স্মৃতি হাতড়ে জানা নামক ছাত্রীর কথা মনে করার চেষ্টা করল আহসান। মনে পড়ল না।
‘স্যার, আপনার মনে আছে, এবছর পরীক্ষা দিতে চাইনি বলে আপনি আমাকে সবার সামনে খুব বকেছিলেন। বলেছিলেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।’
এবার মনে পড়ল আহসানের। প্রতিবছর এইচএসসিতে অনেক ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হয়। তাদের মনে তখন অনেক স্বপ্ন থাকে।
ডাক্তার হব।
ইঞ্জিনিয়ার হব।
সবার চোখেমুখে থাকে আলোর ঝলকানি। এসএসসিতে পড়া কম, সময় বেশি। স্বাভাবিকভাবেই রেজাল্ট ভালো করা সহজ। কিন্তু এইচএসসিতে বিষয়টি সহজ নয়। এখানে সময় কম, পড়া অনেক অনেক বেশি। স্বাভাবিকভাবেই যারা ভর্তির পর সময়কে অবহেলা করে তাদের চোখ-মুখের উজ্জ্বলতা দিন দিন কমতে থাকে। অনেকে পড়ার চাপ সামলাতে না পেরে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। যেমন- জানা একদিন ব্যাচে পড়ানোর সময় হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়েছিল।
‘স্যার, একটা কথা বলব?’
‘বলো।’
‘স্যার, আমি যদি এবছর পরীক্ষা না দিয়ে সামনের বছর দিই, কোনো অসুবিধা হবে?’
স্বাভাবিকভাবেই রেগে গিয়েছিল আহসান। একবছর ড্রপ দিলে নানান অসুবিধা দেখা দেয়। প্রথমত ওই ছাত্র বা ছাত্রী অনিয়মিত হিসেবে গণ্য হয়। আর সিলেবাসও কিছুটা চেঞ্জ হয়। সবচেয়ে বড় কথা, ওরা পড়াশোনা করার নিয়মিত সঙ্গীকে হারিয়ে ফেলে। ফলে লেখাপড়া সংক্রান্ত যেকোনো পরামর্শ পেতে পদে পদে সমস্যা দেখা দেয়।
‘সবশেষে তোমাকে বলব, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত হবে চরম বোকামি। অবশ্যই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা উচিত।’
জানা শুনেছিল। মেনেছিল কিনা জানা নেই। কারণ, ওই দিনের পর মেয়েটি আর ওর কাছে পড়তেই আসেনি!
‘স্যার?’ জানা’র ডাকে বর্তমান সময়ে ফিরে এল আহসান।
‘বলো, শুনছি।’ বিরক্তি চেপে বলল ও।
‘স্যার, আমার জন্য দোয়া করবেন।’
‘অবশ্যই। তুমি তো পরীক্ষা দিতেই চাওনি। অথচ দেখ, এবার পরীক্ষা ছাড়াই অটোপাস করে ফেললে। এখন মেডিকেল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ভালো করে পড়াশোনা কর।’
‘স্যার!’ আবার ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল জানা।
‘আবার কী হলো?’
‘স্যার, আমার জন্য দোয়া করবেন।’
‘আরে সে তো করবই।’
‘আপনি ঠিকই বলেছিলেন স্যার।’
‘কী?’
‘বলেছিলেন, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া ঠিক না, অন্তত ফরম ফিলাপ করে পরীক্ষায় বসা উচিত।’ ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল জানা।
‘দেখলে তো। পরীক্ষাই শেষপর্যন্ত হলো না। অথচ তুমি...।’
‘স্যার, আমার জন্য দোয়া করবেন, প্লিজ।’ জোরে জোরে কাঁদতে শুরু করল জানা।
বিব্রত হলো আহসান।
‘আরে পাগলি মেয়ে! দোয়া তো করবই। এখন আর কান্নার কী আছে। দোয়া করি, তুমি যেন ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাও।’
‘না স্যার, দোয়া করেন একই ভুল যেন আমি আবার না করি।’
‘মানে?’
‘পরীক্ষা দেব না বলে গত বছর আমি ফরম ফিলাপই করিনি। অটোপাস হবে কীভাবে! দোয়া করবেন স্যার, এবার যেন আমি অন্তত ফরম ফিলাপ করার সাহসটুকু জোগাড় করতে পারি।’
হু হু করে কেঁদে ফেলল জানা।