ভেজালবিরোধী অভিযান

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০ | ৫ কার্তিক ১৪২৭

ভেজালবিরোধী অভিযান

শিমুল শাহিন ২:০১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৬, ২০২০

print
ভেজালবিরোধী অভিযান

ভাবি তার চাকরির স্বার্থে মফস্বলের এক শহরে থাকেন বলে সুমন ভাইকে নিতান্ত বাধ্য হয়ে ঢাকায় একাই থাকতে হয়। সুযোগটা আমরা বেশ কাজে লাগাই, সময় পেলেই সদলবলে ভাইয়ের ফাঁকা ফ্ল্যাটে এসে জম্পেশ আড্ডা দিই। শুক্রবারে প্রায় সবার অফিস ছুটি থাকে, দেখা যায় প্রায় প্রতিটা শুক্রবারই আমাদের এখানে আড্ডা দেওয়া হয়। গোটা দিনটাই এখানে বেশ মজা করে কাটে আমাদের।

অন্যান্য বারের মতো আজকেও আড্ডা দিতে আমি আর রতন চলে এসেছি সুমন ভাইয়ের এখানে। অন্যরা এখনো এসে পৌঁছায়নি। বাসায় ঢুকতেই দেখতে পেলাম ভাই রীতিমতো হুলস্থুল কাণ্ড ঘটিয়ে রেখেছেন। ঘরের জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে একাকার অবস্থা। আমাদের বসতে বলে তিনি আবারও এক মনে নিজের কাজে লেগে গেলেন! ঘরের আনাচেকানাচে থেকে একেকটা জিনিস তিনি বের করছেন আর এক সাইডে রাখছেন। বেশ অবাক হলাম ব্যাপারটায়, কারণ ভাবি থাকেন না এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভাইকে সবসময়ই দেখেছি অগোছালো জীবন কাটাতে! ছুটিতে যখন ভাবি আসেন তখন সবকিছু গুছিয়ে দিয়ে যান। আবার ঘরের অবস্থা পূর্বের মতোই হয়ে যায়। ভাইকে আজ হঠাৎ ঘর পরিষ্কারে উঠে পড়ে লাগতে দেখে আমরা বেশ আশ্চর্যই হলাম। খেয়াল করে দেখলাম তিনি বেশকিছু বোতল আর বিভিন্ন জিনিসপত্রের প্যাকেট আলাদা করে রাখছেন! কৌতূহল নিবারণেই ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই, কী হয়েছে? হঠাৎ এমন ঘর পরিষ্কারে উঠেপড়ে লাগলেন যে?’
কাজ করতে করতেই তিনি উত্তর দিলেন, ‘পরিষ্কার করছি না রে, কিছু পুরনো জিনিস খুঁজে খুঁজে আলাদা করছি!’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন, ফেলে দেবেন তাই? হঠাৎ আজকে আপনার এমন সুবুদ্ধি হল যে? নিশ্চয়ই কোনো ঘটনা আছে!’
আমার কথার জবাব না দিয়ে ভাই আবার কাজে মনোনিবেশ করলেন! কার্নিশ থেকে একটা কার্টুন নামিয়ে সেটা বোঝাই করতে লাগলেন সাইড করে রাখা জিনিসগুলো দিয়ে! কী নেই তাতে? গলা বাড়িয়ে দেখলাম, হরলিক্সের বোয়াম থেকে শুরু করে চা পাতা, চিনি, বিস্কুটের প্যাকেট, স্যালাইন, নানানরকম ওষুধ, ছোলা, মুড়ি, চিড়া, শুকিয়ে যাওয়া নিমকি...। কার্টুনটা বোঝাই হলে দুজন মিলে সেটা ধরে বাইরে রেখে এলাম।
সুমন ভাই কিছুটা স্থির হতেই আবারও জিজ্ঞেস করলাম, ‘ঘটনাটা কী খোলাসা করেন তো!’
আমার কথায় এবার তিনি কান দিলেন! বললেন, ‘আমার এক বন্ধু অফিসের কাজে ঢাকায় আসছে! এখানেই আজ উঠবে বলল!’
‘তাতে কী? ঘরটায় একটু ঝাড়ু দিলেই হতো! কিন্তু আপনার এমন যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে ঘরের আনাচেকানাচে হানা দেওয়ার কারণ কী?’
‘আমার ওই বন্ধু নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট!’
কপাল কুঁচকে বললাম, ‘তাতে কী?’
‘আরে বোকা আমি যেসব জিনিস ফেললাম দেখলিই তো!’
ভাইয়ের কথা শেষ না হতেই বললাম, ‘দেখলাম! কিন্তু কিছু তো বুঝলাম না!’
বড়ভাই ভ্রƒ কুঁচকে বলল, ‘যেসব জিনিস দেখলি সেগুলো অনেক দিন আগের! এসব মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যদ্রব্য যদি ম্যাজিস্ট্রেট দেখে ফেলে তবে কী হবে বুঝতে পারছিস?’
সুমন ভাইয়ের একেকটা কথা মাথার ওপর দিয়ে গেল, কিছুই বুঝলাম না! একটু উঁচু স্বরেই বললাম, ‘একটু খোলাসা করে বলবেন?’
মাথা চুলকে উত্তর দিলেন, ‘আরে গাধা, আমার ম্যাজিস্ট্রেট বন্ধু এসে যদি আমার বাসায় হঠাৎ ভেজাল খাদ্য বিরোধী অভিযান চালিয়ে ফেলে তখন দেখা যাবে রুমে ওসব খাবার রাখার দায়ে আমার ১ বছর কারাদণ্ড আর ১ লক্ষ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৬ মাস জেল দিয়ে ফেলেছে!’
শুনে হাসতে হাসতে বললাম, ‘ভাই যে কী বলেন! উনি তো আপনার বন্ধু! আপনার বাসায় তো উনি বেড়াতে আসছেন, অভিযান চালাতে নয় নিশ্চয়ই!’
স্বর নামিয়ে ভাই বললেন, ‘বোকার মতো কী যা তা বলিস! জানিস না ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে!’