পেঁয়াজ কত দামি!

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০ | ৫ কার্তিক ১৪২৭

পেঁয়াজ কত দামি!

বিশ্বজিৎ দাস ১:৫৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৬, ২০২০

print
পেঁয়াজ কত দামি!

হিক!
খুকখুক!!
খকখক!!!
সবরকম কাশির প্র্যাকটিসই করা হলো।

সুদেব, ইমন আর কাওসার একে একে কৃত্রিম কাশি কাশল। যার জন্য কাশল, তিনি মনে হয় শুনতে পেলেন না। একমনে মোবাইলে ফেসবুক দেখছেন তিনি।
বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। সবে সন্ধ্যে গড়িয়েছে। টিভিতে কোনো অনুষ্ঠান এখন নেই। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টুইটারও আর ভালো লাগছে না কারও। সবাই বসার ঘরে এসে হাজির হয়েছি। উদ্দেশ্য আড্ডা মারা। তার চেয়েও বড় উদ্দেশ্য হলো রোহিতের টিন থেকে মুড়ি সাবাড় করা। গ্রামের বাসা থেকে নিয়মিত মুড়ির বস্তা আসে ওর কাছে। আমরা মানে মেসের বাকি সদস্যরা হলাম সেই মুড়ির নিয়মিত সমঝদার।
‘এই বৃষ্টির দিনে মুড়ি চানাচুর না হলে আড্ডা কি জমে?’ কাওসার প্রায় আর্তনাদ করে উঠল।
‘মুড়ি চানাচুর আছে। পেঁয়াজ নেই। বাজারে দাম বেড়েছে।’ ইমন বলল।
‘ঠাট্টা করছিস?’ ক্ষুব্ধ স্বরে জানতে চাইল রোহিত।
‘ঠাট্টা কেন করব। পেঁয়াজ ছাড়াই আজ চানাচুর মুড়ি খেতে হবে সবাইকে।’ জোরে জোরে বলল ইমন। মোখলেস ভাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে।
‘পেঁয়াজ দেখছি, সত্যি সত্যি দামি হয়ে উঠেছে রে।’ বলতে বলতে আড়চোখে মোখলেস ভাইয়ের দিকে তাকালাম।
মোখলেস ভাই চাইলে এই সমস্যার ঠিকই সমাধান করে ফেলবে। এর আগে আমাদের ফ্রি ফ্রি দু’বস্তা পেঁয়াজ এনে দিয়েছিল। পেঁয়াজের আড়তদার মোখলেস ভাইকে ডিবি অফিসার মনে করে দু’বস্তা পেঁয়াজ ফ্রি ডেলিভারি দিয়েছিল।
এবার পেঁয়াজের দাম বাড়ল অথচ তার মধ্যে কোনো ভাবান্তর নেই।
‘বাড়বে না। সব জিনিসের দাম বেড়েছে। কাঁচা মরিচ থেকে শুরু করে সোনা সব জিনিসের দাম বেড়েছে।’ কাওসার অসহিষ্ণুভাবে বলল।
মুড়িতে তেল দিয়ে মাখাতে শুরু করেছে ইমন।
‘কোথায় সোনা আর কোথায় পেঁয়াজ। তুলনাটা কি ঠিক হলো। পেঁয়াজের দাম আজ বেড়েছে। কাল কমে যাবে। সোনার দাম একবার বাড়লে সহজে কমে না। আর সোনার দাম সবসময়ই পেঁয়াজের থেকে বেশি। বুঝলি?’
সবার দিকে চেয়ে বলল ইমন। হাসল। সবজান্তার হাসি।
‘ভুল।’ সপাং করে চাবুক পড়ল যেন ঘরে।
মুখের হাসি দপ করে মিলিয়ে গেল ইমনের।
‘কোনটা ভুল মোখলেস ভাই?’ জানতে চাইল কাওসার।
‘সোনার চেয়েও পেঁয়াজের দাম বেশি হতে পারে।’ আড়মোড়া ভাঙলেন মোখলেস ভাই।
‘কেমন করে?’ সমস্বরে জানতে চাইলাম সবাই।
জবাবে মুড়ির গামলার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন তিনি। বিনা প্রতিবাদে সেটা মোখলেস ভাইয়ের দিকে এগিয়ে দিল রোহিত।
চুপচাপ বেশ কিছুক্ষণ মুড়ি চানাচুর খেলেন তিনি। ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে গিয়েছি সবাই। সোনার চেয়ে দামি পেঁয়াজ বিশ^াস করতেও কষ্ট হচ্ছে আমাদের।
‘সত্যিই কি পেঁয়াজ সোনার চেয়েও দামি? বলুন না মোখলেস ভাই?’
মোখলেস ভাই মুড়ি খাওয়া থামালেন। শুরু করলেন ধীর লয়ে। নিচু কিন্তু স্পষ্ট গলায়। আমরা সবাই উৎসুক হয়ে শুনতে শুরু করলাম। মোখলেস ভাইয়ের গল্প মানেই ভিন্ন স্বাদ।
ভিন্ন কিছু।
‘আমি গল্পটি শুনেছি আমার বাবার কাছে। বাবা শুনেছেন তার বাবা মানে দাদুর কাছে। তোরা তো জানিস, আমি কেমন ভ্রমণপ্রিয়।’
খুকখুক করে কেশে উঠল সুদেব। গত মাসেই তার খরচে সিলেট ভ্রমণ করে এসেছেন মোখলেস ভাই।
মোখলেস ভাই অবশ্য দমলেন না।
তার গল্প শুরু হলো-
‘দাদু পেঁয়াজ খেতে বেশ পছন্দ করতেন। ভাতের পাতে পেঁয়াজ না হলে তার চলেই না। আস্ত আস্ত বেশ কয়েকটা পেঁয়াজ ভাতের সঙ্গে খেতে পারলে তবেই তার খাওয়ার তৃপ্তি মিটত। দাদু যেখানেই ভ্রমণ করতে যেতেন সঙ্গে থাকত পেঁয়াজ। সেবার দাদু কামরুপ কামাখ্যা ঘুরে কুচবিহারে এসে থিতু হয়েছেন। সেখানে ছিল তার এক বন্ধু হরিপ্রসাদের বাসা। ঠিক করলেন এবার শিলিগুড়ি হয়ে কলকাতায় চলে যাবেন। দাদুর বন্ধু বললেন, এত দূরে যখন এসেছো তখন ডুয়ার্সের জঙ্গলটা ঘুরেই যাও।
যে সময়ের কথা বলছি সে সময় বর্ডার বলে কিছু ছিল না। আর ডুয়ার্সের মতো জঙ্গলও ছিল আমাজনের মতো অন্ধকার আর নানারকম হিংস্র জন্তু জানোয়ারে ভর্তি। দাদুর বুকটা কেঁপে উঠেছিল।
বলেছিলেন, একা যাব?
একা কেন যাবে? বিখ্যাত ব্রিটিশ শিকারি জন এডওয়ার্ড এসেছেন কুচবিহারে। তিনি শিকারে যাবেন। তাই লোক খুঁজছেন।
অ্যাডভেঞ্চার আর নতুন কিছু দেখার লোভে দাদু রাজি হয়ে গেলেন।
দাদুর বন্ধু হরিপ্রসাদ তার পেঁয়াজ প্রীতির কথা জানতেন। বলেছিলেন, শুনেছি কলকাতায় পেঁয়াজের দাম খুব বেড়েছে। তুমি সঙ্গে বেশি করে পেঁয়াজ নিয়ে নাও।
তাই করেছিলেন দাদু।
যাত্রা শুরুর দিন কয়েকের মধ্যে কুলিদের কয়েকজন অসুস্থ হয়ে আর সঙ্গে যেতে চাইল না। রইল শুধু দাদু, এডওয়ার্ড আর দুজন কুলি। শিকারি এডওয়ার্ড এসেছেন সাদা বাঘের সন্ধানে। ঐ এলাকায় তখন একটা সাদা বাঘ ঘোরাফেরা করছিল। কাজেই শিকারিকে তার শিকারের নেশা পেয়ে বসেছিল। দাদুও তার পিছে পিছে রইলেন। এক রাতে তাবু খাটিয়ে ঘুমিয়েছেন দুজনে। দূরে কোথায় যেন পাখি ডেকে উঠল। দাদু বললেন, সাহেব, সাবধান। লক্ষ্মণ সুবিধার মনে হচ্ছে না।
সাহেব হেসেই উড়িয়ে দিলেন।
সকালে ঘুম ভেঙে দুজনেই নিজেদের বন্দি অবস্থায় পেয়েছিলেন। আশেপাশে অনেকগুলো নরমুণ্ডু পড়েছিল। বোঝাই যাচ্ছিল, জংলিরা নরখাদক। ওদের চারপাশে জংলিরা সবাই কিচিরমিচির করছিল। বোঝাই যাচ্ছিল নতুন খাবার পেয়ে সবাই বেশ খুশি।
জন এডওয়ার্ড বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। বলল, আবুল, যেভাবেই হোক আমাকে বাঁচাও। বিলেতে আমার পরিবার আছে।
দাদু অবশ্য মনে মনে পালানোর বুদ্ধিই আঁটছিলেন। চারপাশে জংলি। কোনো বুদ্ধিই যুৎসই মনে হচ্ছিল না।
জংলিদের সামনে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হলো। জংলি রাজাকে তখন দাদুদের কাছ থেকে জব্দ করা জিনিসগুলো দেখানো হচ্ছিল। একসময় পেঁয়াজ রাজার হাতে দেওয়া হলো। রাজা বেশ কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে দাঁত দিয়ে কামড় দিলেন পেঁয়াজে। অমনি পেয়াজের ঝাঁজে তার চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে এল।
জংলিরা তখন সঙ্গে সঙ্গে বল্লম উঁচিয়ে ধরল দাদুদের দিকে।
রাজা হাত উঁচু করে সবাইকে থামতে বললেন। ইশারা করে জানতে চাইল, জিনিসটা কী। দাদু তো লুফে নিলেন সুযোগটা। নিজের ঝোলা থেকে ছোট কড়াই বের করে আগুনে ঝটপট পেঁয়াজ মরিচ দিয়ে ভেজে দিলেন দুটো ডিম। খেয়ে তো রাজা আরও মুগ্ধ।
আরও বেশি বেশি ডিম ভেজে দিতে ইশারা করলেন রাজা।
জংলিরা খুঁজে খুঁজে ডিম এনে দিল জঙ্গল থেকে। দাদু ডিম ভেজে ভেজে সবাইকে খাওয়ালেন। রাজা খুশি হলেন। বাকি সব পেঁয়াজ রাজা নিজের কাছে রাখলেন।
মুক্তি দিলেন তাদের দুজনকে।
আসার সময় তাদের হাতে দিলেন দুটো করে সোনার বার।’
‘সোনার বার!’ চেঁচিয়ে বললাম আমরা।
‘পেঁয়াজের বদলে সোনার বার! অবিশ্বাস্য!’ রোহিত বলল।
‘কিন্তু পেঁয়াজের দাম তো সোনার চেয়ে বেশি হলো না। হলো সমান সমান।’ বিজয়ীর ভঙ্গিতে বলল ইমন।
‘গল্পটি এখনো শেষ হয়নি।’ ধীর গলায় বললেন মোখলেস ভাই।
‘শেষ হয়নি!’ প্রায় চিৎকার করে উঠলাম সবাই।
‘হ্যাঁ। আরও আছে।’
হরিপ্রসাদ, দাদুর বন্ধু এ কাহিনি শুনে একবস্তা রসুন নিয়ে সেই জঙ্গলে গিয়েছিলেন। ধরাও পড়েছিলেন। দাদুর কৌশল অবলম্বন করে জংলিদের রসুন দিয়ে মাংস রান্না করে খাইয়েছিলেন। তিনিও পুরস্কার হিসেবে অনেক কিছু পেয়েছিলেন, যা সোনার চেয়েও দামি।’
‘সোনার চেয়ে দামি!’ কী সেটা?’ রুদ্ধশ^াসে জানতে চাইলাম সবাই।
‘কী আবার- পেঁয়াজ! ওদের কাছে সোনার চেয়ে দামি তো সেটাই।’
ঝট করে রোহিতের পেছনে লুকিয়ে রাখা চানাচুরের আরেকটা প্যাকেট বের করে নিয়ে ধীরে ধীরে বের হয়ে গেলেন মোখলেস ভাই।
আস্ত চানাচুরের প্যাকেট হারানোর ঝাঁজ ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল।
ঠিক পেঁয়াজের মতোই!