গাছ

ঢাকা, শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

গাছ

আবদুল হামিদ মাহবুব ৩:১০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৩, ২০২০

print
গাছ

গ্রামে খুব ভালো স্কুল নেই। তাই এই ছোট বয়সেই তাকে শহরের হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করতে হচ্ছে। বাড়িতেই মায়ের কাছে ক্লাস টু পর্যন্ত বইগুলো পড়ে একটি মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে শহরের একটি রেসিডেনসিয়াল স্কুলে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হয়ে যাই। সেই থেকে সে শহরবাসী। শহরে তার নানা, নানি, খালা, মামারা থাকেন। তারা মাঝে-মধ্যে তার হোস্টেলে গিয়ে খোঁজখবর নেন। বছরের নির্দিষ্ট কয়েকবার স্কুল যখন ছুটি হয়, তখনই কেবল সে গ্রামে আসে।

স্কুল ছুটিতে গ্রামে এলে দিনের বেশিরভাগ সময়ই বই হাতে নিয়ে বিছানায় গড়াগড়ি করে কাটে তার। কারণ তার মা গ্রামের ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশা খুব একটা ভালো পান না। তার মা শহরের মেয়ে ছিলেন। বাবার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কারণে এখন গ্রামে থাকেন। শহরের স্কুল হোস্টেলেও বন্দিদশা। আবার গ্রামে এসে এ এমন বন্দিদশা তার মোটেই ভালো লাগে না। তাই বিকালে খেতের আল ধরে এদিক ওদিক একটু হাঁটাহাঁটি করে। এতে মা অবশ্য বাধা দেন না। তবে সে যতক্ষণ বাইরে থাকে মা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তাকে চোখে চোখে রাখেন।

এই করোনা মহামারীতে স্কুলের লম্বা ছুটি। কবে স্কুল খুলবে কেউই জানেন না। বাড়িতে তার অলস সময় যেন কাটতেই চায় না। তার কেবলই অস্থিরতা লাগে। সেটাও সে কাউকে বলতে পারছে না। বাড়িতে এলে সে যে বিছানায় শুয়ে গড়াগড়ি করে, কিংবা ঘুমায়, সেই বিছানায় গেলেই গাছটি চোখে পড়ে। বাড়ির উঠানের এক কোণে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা ছোট এ গাছ। ঠিক জানালাটার সোজাসুজি গাছটির অবস্থান। গাছের অর্ধেক অংশ শুকিয়ে গেছে। মরা ডালগুলোতে কোনো পাতা হয় না। আর অর্ধেক অংশে কোনো রকম টিকে থাকা ডালগুলোতে পাতা হয়।

সেই পিচ্চি বয়স থেকে দেখছে কচি পাতাগুলো পোক্ত হওয়ার আগেই ছিঁড়ে ছিঁড়ে উঠিয়ে ফেলা হয়। ওইসব পাতা পাটায় পিষে নকশা করে বাড়ির মেয়েরা হাতে লাগায়। তার মাও লাগান। পাতার রসে হাতে লাল দাগ ফুটে ওঠে। মেয়েদের রঙিন হাত অপূর্ব সুন্দর লাগে। হাতের দাগগুলো মিলিয়ে যেতে যেতে গাছের ওই ডালগুলোতে আবার নতুন পাতা জেগে উঠে। আবারও মেয়েরা ছিঁড়ে আনে, হাতে মাখে।

বয়স্ক যাদের মাথার চুলে পাক ধরেছে, তারা সেই চুলেও মাখে। চুল লাল হয়। বিশাল বাড়ির এই বড় উঠানের চারদিকেই অনেকগুলো ঘর। প্রতি ঘরেই মানুষ আছেন। সকল ঘরের মানুষই অবাধে এ গাছের পাতা ছিঁড়ে নেয়।

এ গাছের বয়স কত হয়েছে; বাড়ির কারোই এই বিষয়ে কোনো আগ্রহ নেই। বাড়ির সবচে বয়স্ক মানুষ ইফাতের দাদা কী এক কথা প্রসঙ্গে একদিন বলেছিলেনÑ এটা আমার মার হাতের লাগানো। বেশ ক’বছর আগে বলা কথাটি ইফাতের মনে আছে। কিন্তু গাছটা দেখে মনে হয় না, এ গাছের খুব বেশি বয়স হবে! কারণ এ গাছ উচ্চতায় বারো তেরো ফুটের মতো হবে। গাছের গোড়াও খুব বড় না। ইফাত দুই হাত দিয়ে মুঠি করে ধরতে পারবে। ইফাতের দাদা বলেছেন— তার বয়স যখন বিশ, তখন তার মা এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন।

ইফাত এখন ক্লাস নাইনের ছাত্র। আজ দুপুরে খেতে বসেই মাথার মধ্যে বিষয়টি এলো।

খাওয়া শেষ করে উঠে, বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে, ইফাত গাছটির দিকে তাকায়। সে এ গাছের বয়স মেলাবার চেষ্টা করে। ইফাত মনে মনে হিসাব কষে। তার বয়স পনের হলে তার বাবার বয়স একচল্লিশ। বাবার যখন ছাব্বিশ, তখন ইফাতের জন্ম। আচ্ছা দাদার যখন ছাব্বিশ তখন যদি বাবার জন্ম হয়, তা হলে দাদার বয়স সাতষট্টি। তা হলে গাছের বয়স কত হতে পারে?

না গাছের বয়সটা ইফাত কিছুতেই মিলাতে পারে না! বারবার এভাবে হিসাব করে। আবার এলোমেলো হয়ে যায়।

এবার ইফাত লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে পাশের ঘরে দাদার কাছে যায়। ইফাত দাদাকে জিজ্ঞেস করে— আচ্ছা দাদা, তোমার বয়স যখন বিশ, তখন তোমার মা মারা গেছেন?
—অয় দাদুভাই। কেনে?
—তাহলে গাছটি তোমার কত বছর বয়সে তোমার মা লাগান?
—কোন গাছ, দাদুভাই?
—ওই যে তুমি বলেছিলে, গাছটা তোমার মায়ের হাতের লাগানো।
—আমার মা তো এই বাড়ির কত গাছ লাগাইছইন, তুমি কোন গাছের কথা করায়?
ইফাত দাদাকে হাত ধরে টেনে টেনে গাছের কাছে নিয়ে যায়। উঠানে কোনার গাছটি দেখিয়ে ইফাত বলে— এ গাছ, দাদা।
—দাদুভাই, এটা তো আমার ছোট বয়সেও এ রকমই দেখছি। আমার জন্মেরও আগে মায়ে এটা লাগাইছলা। মা মারা যাওয়ার পড়ে আমার বাবায় কইছলা, এই গাছটা তোর মার হাতে লাগানো। বাবা প্রতিদিন গাছের গোড়াত পানি দিতা। বাবার কাছতনেই জানছি এটা মার হাতে লাগানো। তুমি আইজ এই গাছ লইয়া গবেষণাত লাগলায় কেনে, দাদুভাই?
—দাদা, গবেষণা টবেষণা না। তুমি ছোটবেলা যে রকম দেখছ, আমিও ছোটবেলা থেকে এই গাছটাকে এক রকম দেখছি। গাছটি কত বছর আগে জন্ম নিয়েছিল সেটা জানার চেষ্টা করছি। আর কিছু না।

এবার দাদা বলেন, তোমার বাবা যখন ছোট আছিল সেও একবার আমার বাবার কাছে, মানে ওর দাদার কাছে জানতে চাইছিল গাছটা কত বছর আগে লাগানো হয়েছে। ওর দাদাকে বলতে শুনছিলাম মা যখন এই বাড়িত আসল, তখন হাতে দেওয়ার কোনো মেহেদি গাছ আছিল না। মায়ের লাগি তান বাপের বাড়ি থাকি এই গাছ আনিয়া লাগাইছলা। মার বাপের বাড়ির দুজন কাজের মানুষ শিকড়সহ আস্তা গাছটা আনছিল। ওউ যত বড় আনিয়া লাগাইছলা ওউ অত বড়ই আছে। গাছটা লাগানোর পর একদিকের ডাল মরি গেছিল। এখনো ওউ রকমই আছে। একদিকে পাতা ধরে, আর একদিকে ধরে না। আমার মার বাপের বাড়ি এই গাছ কত বছর আছিল ওটা না জানলে তো এই গাছের বয়স বার করা যাইত নায়! দাদার মুখে গাছটির এই বৃত্তান্ত শুনে ইফাত বলে, বেশ জটিল, দাদা। তোমার নানার বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিতে হবে, ওই বাড়িতে গাছটি কত বছর ছিল। গাছের বয়স বের করতে হলে বেশ কষ্ট করতে হবে।

দাদা ইফাতের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, গাছের বয়স বার করার লাগি অত কষ্ট করার দরকার নাই। আর গাছর বয়স বার করি কিতা লাভ অইব? এখন বর্ষার সময়, দাদুভাই। তুমি বাড়ির খালি জায়গায় যত পারো গাছ লাগাও দেখি তো। আমার মা নাই, কিন্তু তার লাগানো গাছ আছে। এ গাছের পাতা দিয়া কত কত বছর ধরি এই বাড়ির সবে তারার হাত, চুল রঙিন করছে, এখনও কররা। তুমি গাছ লাগাইলে যখন আমি থাকতাম নায়, তুমি থাকতায় নায়, তখনও এই বাড়ির মানুষে উপকার পাইব।

দাদার কথা শুনে ইফাত কী যেন একটু ভাবল। এবার সে লাফিয়ে বলে, গাছটির নাম যে মেহেদি সেটাই আমার জানা ছিল না। আর তুমি খুব ভালো একটা আইডিয়া দিলে, দাদা। এ মহামারী না থামা পর্যন্ত স্কুল বন্ধই থাকবে। আমাকেও বাড়িতে থাকতে হবে। এই লম্বা অবসরে গাছ লাগাব! মেহেদি গাছ কেবল হাত রঙিন করেই তার দায়িত্ব শেষ করেনি। এ গাছ এত বছর ধরে এ বাড়ির মানুষকে অক্সিজেন দিয়েছে। আমরা নিঃশ্বাসের সঙ্গে যে বিষাক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড ছেড়েছি সেটা শোষণ করে পরিবেশকে ভালো রেখেছে। সেটা কেবল এই মেহেদি গাছ করেছে তা নয়। এ বাড়িতে যত গাছ আছে, সকল গাছই সেটা করেছে এবং করছে। আমরা আরও গাছ লাগাব। দাদা তুমিও আমার সঙ্গে গাছ লাগানোতে থাকতে হবে। থাকবে তো? —থাকব দাদুভাই, থাকব।

পরের দিন থেকেই ইফাত বাড়ির খালি জায়গাগুলো বাছাই শুরু করে। সে তার দাদাকে নিয়ে জায়গাগুলো দেখায়। দাদাও সম্মতি দেন। ইফাত তার বাবাকে বলে গাছের চারা জোগাড় করে দিকে। ইফাতের বাবা শহরের এক নার্সারি থেকে একটি পিকআপ বোঝাই করে হরেক প্রজাতির গাছের চারা নিয়ে আসেন।

এবার ইফাত তার দাদাকে সঙ্গে নিয়ে গাছের চারা রোপণ শুরু করে। তার গাছ লাগানো দেখে গ্রামের ছেলেরাও আসে। তারও গাছ লাগায়। ইফাতের মা সবার জন্য নাস্তা তৈরি করেন। সবাইকে একসঙ্গে বসিয়ে নাস্তা খাওয়ান।

মা এখন আর গ্রামের ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশা করতে ইফাতকে বাধা দিচ্ছেন না। ইফাত নিজের বাড়িতে গাছ লাগানো শেষ করে, গ্রামের অন্যদের বাড়িতেও গাছ লাগায়। পতিত পড়ে থাকা জমিতে গাছ লাগানোতে কেউ আপত্তি করে না।