করোনা ফাইল

ঢাকা, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২০ | ১০ কার্তিক ১৪২৭

করোনা ফাইল

বিশ্বজিৎ দাস ১:৫১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৮, ২০২০

print
করোনা ফাইল

দুপুর দুইটা। উত্তরা, ঢাকা। ধীরে ধীরে চোখ খুলল মির্জা য়াযাদ ওমর ওরফে মিয়াও। বলা চলে চোখ খুলতে বাধ্য হল। মোবাইল ফোন বেজেই চলেছে। বাজুক।
আবার চোখ বন্ধ করল মির্জা।

মির্জা য়াযাদ, বাংলাদেশ ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসেসের একজন আন্ডাররেটেড এজেন্ট। সরকারি টাকায় ঘুরে বেড়ায় দেশ থেকে দেশান্তরে। বিয়ে করেনি। কারণ কোনো মেয়ে ওকে বিয়ে করতে রাজিই হয়নি। নিজের বাড়ি নেই। তিন মাসের বাড়ি ভাড়া বকেয়া পড়েছে বলে শেষ পর্যন্ত রাতের আঁধারে ভাড়া বাসা ছেড়ে উত্তরায় এই সেফ হাউজে আশ্রয় নিয়েছে মির্জা।

ওর কোর্ড নেম রাখা হয়েছিল চিতা। ভাবা হয়েছিল চিতার মতোই ক্ষিপ্র হবে তার গতিবিধি। বেশ কয়েকটা মিশনে ডাহা ফ্লপ মারার পর সতীর্থরা এজেন্টরা ওকে ‘মিয়াও’ বলে ডাকতে শুরু করে।

আবার ফোন বেজে উঠল। বিরক্ত হল মির্জা। সারারাত ফেসবুকিং আর মেসেজিং করার পর সকালে ঘুমিয়েছে ও। এই ভরদুপুরে কেউ যদি ঘুম থেকে জাগিয়ে পুতুপুতু গলায় বলে, নাস্তা খেয়েছ সোনা! তখন কেমন লাগে!

ভরদুপুরে নাস্তা!

ঘুম ঘুম চোখে ফোন ধরল মির্জা। রাগ চেপে মিষ্টি গলায় বলল, ‘সোনা, এখন তো দুপুর। এই সময় কি কেউ সকালের নাস্তা খায়?’

‘মিয়াও!’ বসের এক ধমকে চোখ থেকে ঘুম উবে গেল মির্জার।

‘জি ম্যাম।’ তাড়াহুড়ো করে বিছানায় সোজা হয়ে বসতে গিয়ে মেঝেতে পড়েই গেল ও। হাঁটুতে ব্যথা পেল জোরে।

‘উফ!’

‘তুমি করছটা কী?’ ফোনের ওপাশে গর্জে উঠলেন মিস কাবেরী ম-ল। বিআইএস’র প্রধান।

‘কিছু না ম্যাম। আপনি বলুন।’ কোনোমতে বলল মির্জা।

‘এক ঘণ্টার মধ্যে স্কাইপ চ্যাটে এসো। মিশনে যেতে হবে।’ লাইন কেটে দিলেন বস।

‘মিশন! নতুন মিশন!’

তলপেট চেপে ধরল মির্জা। নতুন মিশনের কথা শুনলেই কেন জানি বাথরুম চাপে ওর।

দুই.
নতুন মিশন মানেই সরকারের টাকায় বিজনেস ক্লাসে বিদেশ ভ্রমণ। ফাইভ স্টার হোটেল। চারপাশে সুন্দরী ললনা। জুয়ার আসরে সরকারি টাকা ওড়ানো, উফ! ভাবলেই রক্ত চনমন করে উঠছে মির্জার। আচ্ছা, এখন তো করোনার জন্য বিমানের ফ্লাইট নেই বললেই চলে। তাহলে নিশ্চয়ই চার্টার্ড বিমানে করে বিদেশে যেতে হবে।

ঘণ্টাখানেক পর।

ল্যাপটপের সামনে সেজেগুজে বসেছে মির্জা। সেজেগুজে মানে শার্টের সঙ্গে একটা রেডি টাই বসিয়ে নিয়েছে। কোমরে লুঙ্গিই পরে আছে। ম্যাডাম তো আর নিচের অংশটা দেখবে না।

আজীবন কুমারী মিস কাবেরীর আর্মি ইন্টেলিজেন্সে চাকরি শেষ হয়েছে বছর দুয়েক আগে।

সরকার তাকে বিআইএস’র প্রধান হিসেবে বসিয়েছে। অভিজ্ঞতা তার চুলগুলোকে পাকিয়েছে। কিন্তু তিনি পাকা বুড়ির মতো চুলগুলোকে সামলেছেন। চুলে নিয়মিত মেহেদি দেন। করেছেন ববকাট।

তার বয়স কেউ বলে সত্তর। কেউ বলে পঁচাত্তর। সার্টিফিকেট বলে তার বয়স আশি। মির্জাদের চোখে তিনি চিরতরুণ। অফিসের ইয়াং লেডিদের চোখে তিনি যমের অরুচি।

‘মিশনে নামার জন্য তুমি রেডি, মিয়াও?’

সরাসরি কাজের কথা পাড়লেন বস।

‘জি ম্যাম।’

‘শোনো, বিষয় গুরুতর। বিল গেটসের নাম জানো তো?’

‘না ম্যাডাম। এই নামে মর্ডাক, কবির চৌধুরী, জোকার এই সব সুপার ভিলেনদের নাম জানি। বিল গেটস নামের নতুন কোনো ভিলেন আবির্ভাব হয়েছে নাকি দুনিয়ায়?’

‘আরে হাঁদারাম! এই বিল গেটস হলেন মাইক্রোসফটের প্রধান।’

দাঁত দিয়ে জিহবা কামড় দিল মির্জা।

‘উনার প্রতিষ্ঠানে কী হ্যাক হয়েছে ম্যাডাম?’

‘না। আগে শোন। একদল লোক তাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে, বিল গেটসই নাকি করোনাভাইরাস ছড়িয়েছেন।

এমনকি তার ফাউন্ডেশন যুক্তরাজ্যে যে প্রতিষ্ঠানে আর্থিক সাহায্য দেয়- পিরব্রাইট, তারাও নাকি পৃথিবীতে করোনাভাইরাস ছড়াচ্ছে।’

চুপ করে রইল মির্জা। কথা বলবে কী। কয়েকদিন আগে ও নিজেই তো এমন একটা পোস্ট শেয়ার করেছে।

না পড়েই। ‘এখন আমি চাই, তুমি এ রহস্য উদঘাটন করবে।’ ম্যাডাম বললেন।

‘আমাকে কেন ম্যাডাম? বিল গেটস অনেক বড় একটা নাম। তার জন্য...।’

‘শোনো মির্জা, এই মিয়াও মিয়াও করা বন্ধ কর। জেমস বন্ড চীনে গিয়েছিল করোনার উৎপত্তিস্থল জানতে। নিজেই করোনা আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। নিক কার্টারকে তার নিজ প্রতিষ্ঠানে হ্যাক করার জন্য দু’চোখে দেখতে পারে না গেটস। মাসুদ রানা নিজেই এখন দোটানায়।’

‘দোটানায়?’

‘হ্যাঁ। সোহানা আর রূপা নামের বিসিআইয়ের দুই এজেন্ট ওকে নিজের স্বামী বলে দাবি করছে।’

‘বলেন কী। দুই বধূ এক স্বামী!’

‘বেচারা! নিজের সমস্যাই মিটমাট করতে পারছে না। অন্যের সমস্যার কীভাবে সমাধান করবে।’

‘বিল গেটস কি স্পেসিফিক আমার নামই বলেছেন ম্যাম?’

‘নিজেকে অত বড় বলে মনে কর কেন? বিল গেটস আমার ছোটবেলার বন্ধু। তাই সে আমার সাহায্য চেয়েছে। আমি মনে করেছি, তুমি তো আন্ডাররেটেড।

তোমাকেই একটা সুযোগ দিই।’

‘ওকে ম্যাম। আমাকে কী করতে হবে? কোন দেশে যেতে হবে বলুন।’

‘কোনো দেশেই যেতে হবে না। ঐ সেফহাউসে বসেই কেস সলভ করতে হবে তোমাকে।’

ওর আগ্রহে ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিলেন কাবেরী।

‘মানে?’

‘তুমি তো সারাদিন ফেসবুক, টুইটার, মেসেজিং করেই সময় কাটাও। এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগাও। খুঁজে বের কর, করোনাভাইরাসের উৎপত্তিস্থল ঠিক কোথায়? তাহলেই বিল গেটসের ওপর আরোপিত অপবাদ মিথ্যা বলে প্রমাণিত হবে। দ্যাটস অল।’

লাইন কেটে দিলেন বস।

তিন.
বিটিটিবি’র নেট লাইন ঠিকমতো কাজ করছে না। তাই নেটে ঢুকতে প্রবলেম হল মির্জার। শেষে পাশের ফ্ল্যাটের ভাবির সঙ্গে খাতির জমিয়ে দুঃখী দুঃখী মুখ করে বলল, ‘ভাবি, একটা জিনিস ধার দেবেন, প্লিজ।’

‘ধার।’ আকাশ থেকে পড়লেন ভাবি।

‘আমি আবার পেলেই আপনাকে ফেরত দেব, ভাবি।’

‘করোনায় তোমার ভাইয়ের বেতন দু-মাস ধরে বন্ধ। আমরা নিজেরাই খুব কষ্টে আছি। টাকাপয়সা...।’

‘না না ভাবি। আমি আপনার কাছে টাকা ধার চাইছি না।’

‘তাহলে?’

‘আপনাদের ওয়াইফাই পাসওয়ার্ডটা ধার চাইছি।’

‘ও তাই বল। আমাদের তো নেট কানেকশন নেই। আমরাই পাশের ফ্ল্যাটের ওয়াইফাই হ্যাক করে নেট চালাই। তুমি চাইলে সেটা দিতে পারি।’

অগত্যা সেটাই নিতে হল মির্জাকে।

এক সপ্তাহ পর ই-মেইলে করোনাভাইরাস শীর্ষক ফাইল অফিসে পাঠাল মির্জা।

ফাইলের প্রথম পেজে লেখা থাকল, টপ সিক্রেট। শিরোনাম : করোনা ফাইল। ভেতরের রিপোর্ট খুব সংক্ষিপ্ত।

করোনার উৎপত্তি দিনাজপুর জেলা শহরের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে। প্রতিষ্ঠানের নাম করোনা ট্রেডার্স। ছবি সংযুক্ত।

করোনাভাইরাস ছড়ানোতে সহায়তাকারী মার্ক জাকারবার্গ। মে বি গেটসের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা আছে।

করোনাভাইরাসের ভীতি সর্বাধিক প্রচারকারীরা হল, বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারী।

প্রতিষেধক : টিকা বা ওষুধ নয়। করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক পাওয়া যাবে বাংলাদেশের ফেসবুকের ব্যবহারকারীর পোস্টে। একেকজন ডিগ্রিবিহীন ডাক্তার।

বিল গেটসের করণীয় : নাম এফিডেভিট করে চেঞ্জ করা। তাহলে কেউ তার নামে বদনাম করতে পারবে না!