বিড়ম্বনা

ঢাকা, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২০ | ১০ কার্তিক ১৪২৭

বিড়ম্বনা

হাফিজ উদ্দীন আহমদ ১:৪৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৫, ২০২০

print
বিড়ম্বনা

পাছাটা চুলবুল করে ওঠে আজমতের। প্যান্ট পরলে আরও বেড়ে যায়। ডিউটি ছাড়া তাই লুঙ্গি পরে থাকে। বাধ্য হয়ে ডাক্তার দেখাতে গেল হাসপাতালে।
: আপনার সমস্যা কী?
: আমার টাকার সমস্যা। হাতে কোনো টাকা নাই।
: আরে সেটা না। কী কারণে ডাক্তার দেখাতে আসছেন বলেন।
: স্যার, চুলকানি।
ডা. সাবরিনা নতুন পাস করে এখানে জয়েন করেছেন। মেয়েরা সবাই আজকাল নারীবাদী। তারা নায়িকা না হয়ে হয় নায়ক, লেখিকা না হয়ে হয় লেখক, অধ্যাপিকা না হয়ে হয় অধ্যাপক। ব্যাকরণ বই থেকে এখন লিঙ্গান্তর বিভাগটা তুলে দেওয়া যেতে পারে। স্যার ডাকায় তাই তিনি খুশি হলেন। লোকটা হয়তো ম্যাডাম শব্দটা জানেই না। জনসমক্ষে লুঙ্গি তুলে চুলকানো যায় না। লুঙ্গির ওপর দিয়ে চুলকালে আরাম নেই। কী করবে বুঝতে না পেরে আজমত পাছা না চুলকিয়ে মাথা চুলকাতে লাগল। সাবরিনা টর্চ জ্বেলে মাথাটা ভালো করে দেখলেন। তেমন কিছু পেলেন না।

: আসলে স্যার এইখানে না।
: তবে কোথায়?
: পায়খানার রাস্তায় স্যার। রোজই কিট কিট কইরা কামড়ায়। রাইতে ঘুমাইতে পারি না।
: কী কাজ করেন?
: আমি একটা বাড়ির নাইট গার্ড। দিনে বস্তিতে থাকি।
: কীসের পানি খান?
: টিপ কলের পানি স্যার।
: ডেকচি, থালাবাটি কীসে ধোন?
: বস্তির পাশে একটা খাল আছে। হেই পানিতে।
: এটা করবেন না। থালাবাটিও কলের পানিতে ধোবেন।
এরপর গটগট করে কৃমির বড়ি লিখে দেন তাকে। কয়েকদিন পর আবার এলো সে।
: কী ব্যাপার, আপনার চুলকানো সারেনি?
: পাছার চুলকানি আর নাই। কিন্তু আমার পাও দিয়া একটা গরম বাতাস ঢুইক্যা মাথা দিয়া বাইর হইয়া যায়। আর আসলে চুলকানি আমার বুকে। ওইদিন শরমে কইতে পারি নাই।
: বাহ! পাছার চুলকানি কইতে পারলেন কিন্তু বুকের চুলকানি কইতে শরম লাগল? দেখি শার্টটা খোলেন।
শার্টটা খুলে দাঁড়াল লোকটা।
: চুলকানি তো ভেতরে। দেখতে পাইবেন না। বুকের ভেতরে চুলকায়।
: আমি তো এটার ট্রিটমেন্ট দিতে পারব না। পাশের রুমে চর্মের ডাক্তার বসেন। তার কাছে যান।
স্কিন স্পেশালিস্ট তার কথা শুনে আকাশ থেকে পড়লেন। তবে তিনি অভিজ্ঞ। ব্যাপার কিছুটা আন্দাজ করতে পারলেন। মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করে দিলেন তাকে। সাইকিয়াট্রিস্ট হাবিব ধৈর্য ধরে তার ইতিহাস নিলেন।
: আপনারে কেমনে কমু...
আজমত কাচুমাচু করে।
: বলুন, বলুন। কোনো লজ্জা নেই।
: স্যার, আমি যে বাড়িতে ডিউটি করি সেই বাড়িআলার একটা মাইয়া আছে। কলেজে পড়ে। দেখতে পরীর লাখান। ওরে দেখলেই আমার কেমন জানি চুলকায়। চুলকানিটা বুকের ভেতরে। হাত দিয়া ধরতে পারি না। যদি বুকের বাইরে থাকত তয় আরামসে চুলকাইতাম।
: ঠিক আছে মাথায় একটা টুপি ও পায়ে মোজা পরবেন। তাহলে পা দিয়ে বাতাস ঢুকতে পারবে না। মাথা দিয়ে বের হতেও পারবে না। আর চুলকানিটা বুকের বাইরে এনে দেব। কালকে এসে মলম নিয়ে যাবেন।
পরদিন ঠিকই লোকটা এলো। তার হাতে একটা খালি ভিটামিন ট্যাবলেটের ছোট কৌটাতে ভ্যাসলিন সহযোগে বিশেষভাবে বানানো মলম তুলে দিলেন।
: এটা রাতে বুকে লাগাবেন।
: কয়দিন লাগামু স্যার।
: এক রাত লাগালেই হবে।
পরদিন হাসপাতালে গিয়ে কাজ শুরু করতে না করতেই সেই লোকটা হাজির।
: স্যার, চুলকানির চোটে থাকতে পারি না। আমারে বাঁচান।
বলেই পাগলের মতো বুক চুলকাতে চুলকাতে লাফাতে লাগল।
: আপনিই তো চেয়েছিলেন চুলকানি বুকের বাইরে এনে দিতে। যাতে ইচ্ছামতো চুলকানো যায়।
: হ স্যার। কিন্তু এত বেশি চাই নাই।
বলে জামা খুলে ফেলল সে। ডা. হাবিব দেখলেন লাল আঝিতে তা পূর্ণ। নখের আঁচড়ে কোথাও রক্ত বের হয়েছে।
: হ্যাঁ, এখনই আমি চিকিৎসা দিচ্ছি। সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কথা দিন, যে মালিক আপনাকে বিশ্বস্ত ভেবে তার বাড়ির গার্ড মানে রক্ষাকর্তা বানিয়েছে তারই মেয়ের প্রতি কুদৃষ্টি দেবেন না। এটা কি ঠিক হয়েছে?
: না স্যার। আর এমুন অইব না। জলদি কিছু করেন স্যার।
সঙ্গে সঙ্গে নার্সকে ডেকে হাবিব সাহেব রোগীর শিরায় এন্টি হিস্টামিন ইনজেকশন দেওয়ালেন। শরীরে লাগাবার জন্য ক্যালামিন লোশন ও মুখে কিছু খাবার বড়ি দিলেন সঙ্গে। পাঁচ মিনিট পর আজমত শান্ত হয়ে চলে গেল।
দুপুর দুইটার পর খুশিমনেই বাসায় ফিরলেন ডা. হাবিব। কিন্তু খেতে বসেই বিপত্তি। প্রথম গ্রাস মুখে দিয়েই খাবার টেবিল ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন। গলার ভেতর অসম্ভব চুলকাচ্ছে। মনে হচ্ছে জ্যান্ত শুঁয়ো পোকা ঢুকে গেছে। মফস্বলের ছোট এ হাসপাতালের কম্পাউন্ডেই তার বাসা। বাসার পাশেই কিছু ঝোপঝাড় আছে। কাল হাসপাতাল থেকে ফিরে সেখান থেকে কয়েকটি বিছুটি পাতা ছিঁড়ে এনে তাকে কষ্ট করে হামান দিস্তায় ছেঁচতে দেখে বুয়া ‘আমি কইরা দেই’ বলে রান্নাঘরে নিয়ে গিয়েছিল। তার অজান্তে সে তা শিলপাটায় বেটেছিল, সেই শিলপাটায় বাটা মসলার তরকারি খেয়েই তার এ দশা। প্রতিজ্ঞা করলেন জীবনেও কোনো রোগীকে এভাবে মলম বানিয়ে শিক্ষা দেবেন না। তাড়াতাড়ি নিজেই নিজের মাংসপেশিতে একটা এন্টি হিস্টামিন ইনজেকশন দিলেন।