দজ্জাল....

ঢাকা, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২০ | ১০ কার্তিক ১৪২৭

দজ্জাল....

জামসেদুর রহমান সজীব ১:৩৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৫, ২০২০

print
দজ্জাল....

চেহারাটা বাংলা পাঁচ বানিয়ে রেখেছেন সবুজ ভাই। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোনো সমস্যা?’ খানেক বাদেই বুঝতে পারলাম জিজ্ঞেস করাটা মস্ত ভুল হয়েছে। সবুজ ভাই রীতিমতো চিল্লাপাল্লা শুরু করে দিয়েছেন। জানালেন তার রাজ্যের অশান্তির কথা। কিছুদিন হলো পাঠাও সার্ভিসে কাজ শুরু করেছেন। কিন্তু যখনই বাইক নিয়ে বের হন, বাসা থেকে বউয়ের একটার পর একটা কল আসতেই থাকে। বাজার থেকে লবণ পাঠাও, পেঁয়াজ পাঠাও, তেল পাঠাও... দুনিয়ার এটা-সেটা। কাস্টমারকে সার্ভিস দেবে কী, বউয়ের সার্ভিস দিয়েই কূল-কিনারা করে উঠতে পারেন না সবুজ ভাই। আবার বউকে যে উঁচু গলায় কিছু বলবে সে সুযোগও নেই। মেরে হাড়গুড্ডি এক করে ফেলবে। মানুষ সুন্দরী দেখে মেয়েকে বিয়ে করে, সবুজ ভাই নাকি বিয়ে করেছেন একটা সন্ত্রাসীকে!

সবুজ ভাইকে সান্ত¡না দেওয়ার ভাষা খুঁজে পেলাম না। তার পিঠে একটু হাত বুলিয়ে দিতেই আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিলেন। পরনে সাদা শার্ট ছিল আমার। তার চোখের জলে পুরো ট্রান্সপারেন্ট হয়ে গেল শার্টটা। ফোঁপাতে ফোঁপাতে জানালেন গত তিন দিনে একটা কাস্টমারও পাননি। যখনই কাস্টমার অ্যাপসে কনফার্মেশন পাঠায়, কল দেয়, তখনই বউ কল দিয়ে অন্য কাজে পাঠিয়ে দেয়। ভাইয়ের দুঃখ ভারাক্রান্ত কাহিনী শুনে আমার কলিজাটা মোমের মতোন গলে যায়।

ভাইকে বললাম, আমারেই কাস্টমার বানান, শাহবাগে নিয়ে চলেন। সবুজ ভাইয়ের চোখ চকচক করে ওঠে। আমাকে রীতিমতো পাঁজাকোলা করে তার বাইকে নিয়ে বসান। আবেগের বশে দুটো হেলমেটই আমাকে পরার জন্য দিয়ে দিলেন। একটা ফেরতও দিলাম। মোহাম্মদপুর থেকে শ্যামলী হয়ে কেবল কলেজ গেট পার হয়েছি আমরা, সবুজ ভাইয়ের কল আসা শুরু হলো। প্রথম দুবার পাত্তা দিলেন না। তৃতীয়বারের বেলায় আর ঠিক থাকতে পারলেন না। রাস্তার সাইডে বাইক চাপালেন। রিসিভ করলেন কল। দু’মিনিটের আলাপে তাকে খালি বলতেই শুনলাম, ‘জি জি। হ্যাঁ। আচ্ছা আচ্ছা। সমস্যা নেই। আর কিছু? জি জি। আচ্ছা।’

সবুজ ভাইয়ের এবারকার চেহারাটা দাঁড়ালো বাংলার পাঁচ পাঁচং পঁচিশ! জানালেন চাল-ডাল শেষ হয়ে গেছে। পাঠাতে হবে। ইমার্জেন্সি সেগুলো কিনে বাসায় নিয়ে যেতে হবে। একটা লোক মহাবিপদে পড়েছে, তাকে কীভাবে মাঝপথে ছেড়ে দিই। বললাম, ‘চলেন, আমিও সঙ্গে যাচ্ছি।’ বাজার থেকে দুই কেজি মসুর ডাল আর কাজললতা চালের ২৫ কেজির এক বস্তা পাঁজাকোলা করে বাইকের পেছনে বসলাম আমি। সবুজ ভাই সুদূর উত্তরা চললেন নিজের বাসায়। গিয়ে যখন পৌঁছালাম, আমার হাত আর কোমর অবশ হয়ে গেছে। জিনিসপত্র দুজন মিলে ধরাধরি করে বিল্ডিংয়ের সাত তলায় উঠতে হলো সিঁড়ি ভেঙে। অবস্থা একেবারেই তেজপাতা আমার। ভাবিকে সালাম জানিয়ে গেস্টরুমে বসলাম। কিছুক্ষণ পর পুরো বাড়ি চিল্লিয়ে মাথায় তুললেন ভাবি। সবুজ ভাই দু’হাতে গাল চেপে ধরে গেস্টরুমে এলেন। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে ভাই?’

কাঁদো কাঁদো স্বরে ভাই জানালেন, ‘মসুর ডাল নয়, মুগডাল আনতে বলেছিল। বাসায় নাকি মিনিকেট চাল খাওয়া হয়। কাজললতা কোনোদিন খাওয়া হয় না।’
এবার আমাদের দুজনের চোখেই জল। চাল-ডাল নিয়ে বাইকে দুজন ছুটে চলেছি জিনিসপত্রগুলো পাল্টাতে। আমার মনে হলো পাঠাও সার্ভিসের পাশাপাশি যদি উঠাও সার্ভিস থাকত, অন্তত এ ঝামেলা থেকে আমাকে কেউ যদি এসে উঠিয়ে নিয়ে যেত! মাঝপথ গিয়েছি এমন সময় আবার কল আসতে লাগল সবুজ ভাইয়ের। রাস্তার সাইডে আবার বাইক দাঁড় করালেন। রিসিভ করলেন কল। বলতে লাগলেন, ‘জি জি। হ্যাঁ। আচ্ছা আচ্ছা। সমস্যা নেই। আর কিছু? জি জি। আচ্ছা।’ কলটা কেটে আমার দিকে তাকালেন সবুজ ভাই। তার চেহারায় যেন মেঘ জমে গেছে। আমি কিছু ভাবতে পারলাম না। ঠাস হয়ে পড়ে গেলাম। অন্ধকার হয়ে গেল চারপাশ। যখন চোখ খুললাম, নিজেকে হাসপাতালের বেডে পেয়েছি। তারপর দীর্ঘদিন আর সবুজ ভাইয়ের দেখা পাইনি!