কারোনাময় সময়ে বই ভাজা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২০ | ১৮ আষাঢ় ১৪২৭

কারোনাময় সময়ে বই ভাজা

আলম তালুকদার ১০:০৬ পূর্বাহ্ণ, জুন ৩০, ২০২০

print
কারোনাময় সময়ে বই ভাজা

নাই কাজ, খই ভাজ। কিন্তু আজ? নাই কাজ, ফেসবুক করো টাচ! কিন্তু অনেকের মতো আমি শুধু টাচ করে মজা পাই না। এদিকে আবার সবসময়ই ‘ব’ অক্ষরের শব্দের ভক্ত। এই যেমন, বই, বউ, বধূ, বিরহ, বেদনা, বন্ধন, বিবাহ, বিছানা, বালিশ, বালক-বালিকা, বলা, বাছুর, বলাকা, বাসা, বাড়ি, বক, বকলম, বসা, বস, বাতাস, বন্ধু-বান্ধবী, বাগান, ব্যবসা-বাণিজ্য, বাহ্য, বন্দুক, বাদাম, বাদশাহ, বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ইত্যাদি।

বই নিয়ে পৃথিবীতে অনেক কা- ঘটেছে এবং আগামীতে আরো ঘটবে। সে দিকে যাব না। তবে আমি যেহেতু সিরিয়াস বিষয় নিয়ে বেশি সিরিয়াস থাকতে পারি না, সেহেতু হালকার ওপর দিয়ে চালাইয়া দেওয়ার মতলবে আছি। করোনাময় মহাদুর্যোগের মধ্যেও অনেক কাজ সঙ্গত কারণেই চলছে এবং চলবে। মূলে যাওয়ার আগে একটু হালকা মজা পেশ করি।

হঠাৎ বড় লোক হয়ে একজন চিন্তা করল জনসেবামূলক কাজ একটা করতে হবে। খোঁজখবর নিয়ে দেখলেন, সব ধরনের জনসেবার দায়িত্বে আছেন জনপ্রতিনিধিরা। কোনো ফাঁকা জায়গা নাই। অনেক গবেষণা করে দেখা গেল পাঠাগার স্থাপনের জায়গাটা একটু ফাঁকা আছে। ব্যস কাজ শুরু হয়া গেল। তার নিজ গ্রামে স্কুলের কাছেই একটু সুন্দর জায়গায় বিরাট দালানকোঠা হয়া গেল। কমিটি হয়া গেল। গঠনতন্ত্রও হয়া গেল। সদস্য অনেক হয়া গেল। তিনি নিজে প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তারপরেও স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালীদের তোয়াজ-টোয়াজ করতে হয়েছে। যাক, কী কী বই সংগ্রহ করা হবে তার একটা তালিকা চাই। উনি সবার সামনে ঘোষণা দিলেন, যেহেতু টাকাকড়ি সব আমার সেহেতু বই সংগ্রহ করার ক্ষমতা আমার। সবাই বলল তথাস্তু তথাস্তু।

তো উনি কী করলেন? দু’একটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিলেন। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলেন। তাতে তিনি লিখলেন, দেশের খারাপ বইয়ের একটি তালিকা চাই! যিনি ভালোভাবে একটি খারাপ বইয়ের তালিকা দিতে পারবেন তাকে পুরস্কৃৃত করা হবে। এবং এই খারাপ বইয়ের নির্বাচন তিনি এককভাবে করবেন। নো কমিটি-টমিটি।

এক সপ্তাহের মধ্যে দেখা গেল খারাপ বইয়ের তালিকার স্তূপ। কয়েক বস্তা তালিকা! ফেসবুক ফুলিয়া ফাঁপিয়া উঠিল। ফেসবুকের পাতা সংগ্রহে সাময়িক সংকট দেখা দিল! যাহা হউক, তিনি প্রায় সব তালিকা কয়দিন ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। জীবনে নাম শোনে নাই এমন লেখক আর বইয়ের তালিকা দেখে তার মাথাই খারাপ হয়া গেল। তিনদিন তিনরাত তার ঘুম হারাম হয়া কাকলাস হয়া গেল!

তারপর তিনি হঠাৎ উধাও। সাতদিন পর আবার হাজির। একজন মন্ত্রী আসবেন পাঠাগার উদ্বোধনের জন্য। চারদিকে সাজসাজ রব। এলাকায় এর আগে কোনো মন্ত্রীর আগমন ঘটেনি। ওই দিন মন্ত্রীর সামনে খারাপ বইয়ের তালিকা ঘোষণা করা হবে।

আমি ওই দিন কী জন্য যে ঐ এলাকায় গিয়েছিলাম। রাস্তার পাশে স্কুলের মাঠে সভা হচ্ছে। বক্তৃতা চলছে। এমন সময় বইয়ের তালিকা ঘোষণা হচ্ছে। বক্তা বলছে, আমি বিজ্ঞাপন দিয়ে খারাপ বইয়ের একটি তালিকা চেয়েছিলাম। সেই খারাপ বইয়ের নাম এবং লেখকের নাম ঘোষণা করছি। ঘোষণাটি শুনে আমি কান খাড়া করলাম। একশটি বইয়ের নাম ঘোষিত হল। সব বইয়ের নাম ও লেখকের নাম মনে নাই।

তবে এইটুকু মনে আছে- মধুসূদন, ঈশ্বরচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ থেকে আনিসুজ্জামান, শামসুর রাহমান, সৈয়দ হক, হুমায়ূন আহমেদ, হুমায়ুন আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, বিপ্রদাশ বড়ুয়া, রফিক আজাদ, কামাল চৌধুরী, জাহিদুল হক, মাকিদ হায়দার, মুহাম্মদ নূরুল হুদা, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, নাসির আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, আনিসুল হক, আবু হাসান শাহরিয়ার, মোহিত কামাল, সুকুমার বড়ুয়া, রফিকুল হক, লুৎফর রহমান রিটন, আমীরুল ইসলাম, আসলাম সানী, সুজন বড়ুয়া, রহীম শাহ, শফিক হাসান, রণজিৎ সরকার, মামুন সারওয়ারসহ আরও নামীদামি কবি-লেখকদের খারাপ বলে চিহ্নিত করে তাদের বইয়ের নাম ঘোষিত হল। বিপুল করতালির মাধ্যমে খারাপ বইয়ের তালিকা গৃহীত হইল।

খারাপ বইয়ের লেখকদের নাম শুনিয়া আমার একটুও খারাপ লাগিল না। তবে পাঠাগারের জন্য বইয়ের তালিকা করার অভিনব কৌশল শুনিয়া বেশ পুলকিত বোধ করিয়াছিলাম।

সত্যি বলি, আমার নামটা তালিকায় না থাকিবার জন্য একটু কষ্ট অনুভব করিয়াছি। কিন্তু সান্ত¡না এই যে আমার বই খারাপ বইয়ের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় নাই!