অস্ত্র পাচার

ঢাকা, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১০ আশ্বিন ১৪২৭

অস্ত্র পাচার

বিশ্বজিৎ দাস ১০:০৪ পূর্বাহ্ণ, জুন ৩০, ২০২০

print
অস্ত্র পাচার

রাত ১২.৫৯। বিশেষ শাখা। সেন্ট্রাল আইসিটি সার্ভার সেন্টার। আগারগাঁও, ঢাকা।
মনিটরের স্ক্রিনের দিকে ঢুলুঢুলু চোখে চেয়েছিল মারুফ। রাত দশটায় তার ডিউটি শুরু হয়েছে।
সারা দেশের টিভি, রেডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অহরহই প্রচারিত হচ্ছে ফেক নিউজ। চলছে নানারকম প্রপাগান্ডা। এসব মনিটর করার জন্য বিশেষ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সৃষ্টি করা হয়েছে এই শাখা। চব্বিশ ঘণ্টা শাখাটির চারশত কর্মী পালাক্রমে মনিটরিংয়ের কাজটি করে যাচ্ছে।

গণমাধ্যমের সবকিছুই তো আর লোক রেখে মনিটর করা সম্ভব নয়। তাই বসানো হয়েছে ট্রান্সলেটর মেশিন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীবর্গ, সচিব, বিভিন্ন সামরিক বাহিনীর প্রধানদের নামসহ বিশেষ কিছু শব্দ এই ট্রান্সলেটর মেশিনে ফিল্টারিংয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়া আছে। যে কোনো গণ ও সামাজিক মাধ্যমে এসব শব্দ ব্যবহৃত হলেই ট্রান্সলেটর মেশিন সঙ্গে সঙ্গে বিপ বিপ করে সংকেত দেয়। অমনি দায়িত্বে থাকা অফিসার সেটি চেক করে দেখেন। আপত্তিকর শব্দগুচ্ছ টিভির হলে সেটা চলে যায়, টিভি মনিটর যারা করে তাদের কাছে। এভাবেই একদল করে অনলাইন রেডিওর সংবাদ বিশ্লেষণ। একদল করে টুইটার মনিটর। ফেসবুক মনিটরিংয়ের জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটা দল। রাতে অবশ্য দলের বেশিরভাগ সদস্যই বাসায় চলে যায়। তখন ট্রান্সলেটর মেশিনের দায়িত্বে থাকা অফিসারই সব দেখভাল করে। গভীর রাতে ট্রান্সলেটর মেশিন ততটা বিপ বিপ করে না, যতটা করে দিনে।
এই যেমন এখন দায়িত্বে আছে মারুফ। সদ্যই বিমান বাহিনী থেকে এই স্পেশাল ফোর্সে যোগ দিয়েছে সে। ট্রান্সলেটর মেশিন বিপ বিপ করে উঠল। ঢুলুঢুলু চোখে লাল রঙের সুইচে চাপ দিল। একটা টিভি চ্যানেলের খবরে আপত্তিকর শব্দ উচ্চারিত হয়েছে। বিরক্ত মুখে শব্দগুলো দেখার জন্য সুইচ টিপল মারুফ। সঙ্গে সঙ্গে আঁতকে উঠল। সর্বনাশ! খবরটা দ্রুতই স্যারকে দেওয়া দরকার। টেবিল থেকে মোবাইল ফোন নিল সে।
দুই.
বিছানায় যাওয়ার আগে ঘড়ি দেখলেন ইউনিট প্রধান সুলতানুল আরেফিন।
সর্বনাশ! রাত একটা। কাল সকাল নয়টায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জরুরি মিটিং আছে তার। এত রাতে বিছানায় গেলে সকালে ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হবে। মাত্র চোখে ঘুম নেমে আসতে শুরু করেছে, এমন সময় মোবাইল ফোন বেজে উঠল। মারুফ। উফ্! শান্তি নেই জীবনে।
‘কী খবর মারুফ?’
‘স্যার...।’ হড়বড় করে রিপোর্ট দিল সে।
শুনে ভেতরটা শুকিয়ে গেল সুলতানের। কাল সকালের মিটিংয়ে এই প্রসঙ্গ উঠলে কী জবাব দেবেন তিনি।
‘কোন টিভি চ্যানেলের খবর?’
‘স্যার, চ্যানেল এক্স।’
‘বাস্টার্ড।’ নাম শুনেই দাঁতে দাঁত চাপলেন সুলতান।
‘জ্বি স্যার।’ বিস্মিত হয়ে বলল মারুফ।
‘তোমাকে বলিনি। বলেছি ঐ টিভি সেন্টারের নিউজ সেকশনের প্রধান খবির চৌধুরীকে। ব্যাটা ছাত্রজীবন থেকেই আমার পেছনে লেগে আছে।’ মনে মনে প্রাক্তন প্রেমিকা সুমার মুখটা কল্পনা করার চেষ্টা করলেন তিনি। সে এখন খবিরের ঘরণী।
‘কী করব স্যার?’
‘ওই খবরের পাঠক আর প্রযোজককে তুলে আনো। এক্ষুনি।’
‘স্যার?’
‘এটা কোনো ষড়যন্ত্রমূলক নিউজ কিনা জানার জন্য ওদের জেরা করার ব্যবস্থা করবে, বুঝেছ?’
‘জি স্যার।’
তিন.
শিষ বাজাতে বাজাতে ঘরে ঢুকে কাপড় চেঞ্জ করতে শুরু করল জীবন। চ্যানেল এক্স-এর নিউজ প্রেজেন্টার। রাতের শিফট শেষ করে মাত্র বাসায় ফিরেছে ও। এখন হালকা গরম পানিতে স্নান সেরে তারপর বিছানায় উঠে সটান ঘুম দেবে ঠিক করেছে। কলিং বেল বেজে উঠল। এত রাতে আবার কে এল!
‘কে?’
‘দরজা খুলুন। আমরা পুলিশের লোক।’
একমুহূর্ত ইতস্তত করল জীবন। দরজা না খুললে চেঁচামেচি করবে না তো ওরা। অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকরা নিশ্চয়ই বিরক্ত হবে। শেষমেষ দরজা খুলতে বাধ্য হল। অমনি তার ওপর যেন নরক ভেঙে পড়ল।
চার.
নিউজ প্রযোজক সোহানের ঠোঁটের কোনায় রক্ত। চুল এলোমেলো। গাল দুটো লাল হয়ে আছে। চোখে পানি শুকানোর দাগ। মুখ চোখ শুকিয়ে গেছে। প্রায় একই অবস্থা নিউজ প্রেজেন্টার জীবনেরও।
‘স্যার, আমাদের অপরাধটা কী? কেন আমাদের ওপর এই নির্যাতন চালানো হচ্ছে।’
‘তোমরা জানো না, কেন তোমাদের তুলে আনা হয়েছে?’ পায়চারি করতে করতে বললেন সুলতান। খুব সকালেই অফিসে এসেছেন তিনি।
‘সত্যিই জানি না।’ কেঁদেই ফেলল জীবন।
‘আগে বলো, এই নিউজ কি খবির তোমাদের প্রচার করতে বলেছে?’ ব্যাটা খবিরের নামটা বলো স্বীকারোক্তিতে! তারপর দেখ, আমি ওর কী হাল করি, মনে মনে বললেন সুলতান।
‘খ... খবির স্যার। তিনি তো সাসপেন্ড হয়ে আছেন মাসখানেক হল। তিনি কীভাবে বলবেন?’ সোহান বললেন।
সুলতান চমকে গেলেন। খবরটা তার জানা ছিল না।
‘তাহলে গতকাল রাত বারোটার পর যে নিউজ প্রচারিত হয়েছে, তার তত্ত্বাবধানে কে ছিল?’
‘প্রযোজক হিসেবে আমারই তো থাকার কথা। আমিই ছিলাম।’ সোহান বললেন।
‘তাহলে তুই-ই বল, এমপির মানব পাচার, মুদ্রা পাচারের খবর প্রচার করিস ঠিক আছে, তাই বলে মন্ত্রী অস্ত্র পাচার করছেনÑ এমন সংবাদ তৈরি করলি কীভাবে?’ উত্তেজনায়, রাগে তুই-তোকারি সম্বোধন করতে শুরু করলেন সুলতান।
‘আমরা আবার কোন মন্ত্রীর অস্ত্র পাচারের কথা প্রচার করলাম?’ সোহান প্রতিবাদ করলেন।
ঠাস করে তার গালে চড় বসিয়ে দিলেন সুলতান।
‘কোন মন্ত্রী জানিস না। যিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে আছেন। একজন সাবেক মন্ত্রী। তাকে তোরা অস্ত্র পাচারকারী বলছিস। ছিঃ ছিঃ।’
তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়লেন সুলতান।
‘আমরা উনার অস্ত্র পাচারের কথা প্রচার করিনি স্যার। উনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে, সেটা জানি। তার মতো লোককে অস্ত্র পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে খবর প্রচারের প্রশ্নই আসে না। আমরা কি সাংবাদিকতার এথিকস জানি না?’
‘প্রচার না হলে কী আর আমাদের কাছে রিপোর্ট আসে? এই নে দেখ।’ টেবিল থেকে প্রিন্ট করা কাগজ নিয়ে সোহানের মুখের কাছে ধরলেন তিনি।
‘এটা স্যার অস্ত্র পাচার নয়। আমি বলেছিলামÑ মন্ত্রীর অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। অস্ত্রোপচারের ইংরেজি হল অপারেশন।’ বিড়বিড় করে বললেন সোহান।
‘দোষটা আমার স্যার।’ ধীরে ধীরে বলল জীবন।
দু’জোড়া চোখ ঘুরে গেল তার দিকে।
‘মানে।’
‘অপারেশনের বাংলা প্রতিশব্দ যে অস্ত্রোপচার, জানতাম না স্যার। মনে করেছিলাম, সোহান স্যার ভুল লিখেছেন। তাই আমিই খবরটি পড়ার সময় মন্ত্রীর অস্ত্রোপচারের পরিবর্তে মন্ত্রীর অস্ত্র পাচার এইভাবে পড়েছি। পাচার না হয়ে পচার যে হবে সেটাই আজ এতদিন পরে জানতে পারলাম।’
খবর পাচার তো নয়, যেন খবর পাঠকদের মানসম্মানটাই পাংচার করে দিল জীবন!