কাটাকুটি

ঢাকা, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২০ | ১৯ আষাঢ় ১৪২৭

কাটাকুটি

বিশ্বজিৎ দাস ৯:০৮ পূর্বাহ্ণ, জুন ০২, ২০২০

print
কাটাকুটি

জন্মপর্ব
‘নাড়ি কাটা হইছে?’ রমিজা জানতে চাইলেন।
‘হইছে।’ দাই বলল।
‘কী হইছে? নাতি না নাতনি?’
‘আপনার নাতি হইছে।’
‘আলহামদুলিল্লাহ।’
‘তয়? আপনার বউমারে বাঁচাইতে পারলাম না।’
এভাবেই রইসের পৃথিবীতে আগমন ঘটল। প্রথম দিনেই কাটা পড়ল মা ছেলের বন্ধন।

শিশু পর্ব
‘দাদি, ক্ষিদা লাগছে। খাওন দাও।’
‘দেখস না, আমি গরু লইয়া ব্যস্ত আছি। নিজে লইয়া খা।’
‘কী খামু?’
‘হাঁড়িতে ভাত আছে। একটা ডিম ভাইজা ল । যা।’
দুধ দোয়ানোর পর রমিজা রান্না ঘরে ঢুকলেন।
রইস বসে আছে। তার হাত পায়ে হলুদ কী যেন মাখামাখি হয়ে আছে।
‘কী রে, এগুলো কী?’
‘দাদি, ডিম।’
‘ডিম ভাইঙা ফালাইছস?’
‘না দাদি। ডিম কীভাবে ভাঙব, বুঝবার পারি নাই। তাই বটি দিয়ে ডিম কাটতে গেছিলাম।’

কৈশোর পর্ব
‘চল রে বাজান। তাড়াতাড়ি চল।’ রকিব উদ্দীন তাড়া দিলেন।
‘কই যামু বাবা?’ রইস জানতে চাইল।
‘আরে খাল কাটতে। তোরে কাল কইলাম না। উত্তরের পাড়ায় আমাগো যে খালটা আছে, ওইটা কাইট্টা ওইখানে মাছ চাষ করুম।’
‘আব্বা, আমি খাল কাটতে যামু না।’
‘ক্যান যাবি না বাজান?’
‘স্যারে কইছে, খাল কাটলে কুমির আইতে পারে। তাই আমি যামু না।’

যৌবন পর্ব
‘যাবি না কেন?’ সোহেল বলল।
‘এসব আমার ভালো লাগে না।’ বলল রইস।
‘কেন?’
‘এই যে মানুষের কাছ থেকে সাহায্য চাওয়া। মানুষ বিরক্ত হয়।’
‘বিরক্ত তো একটু হবেই। তাই বলে জনসেবা করব না। তুই ভেবে দ্যাখ, আমরা এই টাকা একজন ক্যান্সার আক্রান্ত ছেলের জন্য তুলছি।’
আমি তো তাকে চিনিই না। বলতে চেয়েও বলতে পারল না রইস।
শেষপর্যন্ত গেল ও সোহেলদের সঙ্গে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন দোকানে ঘুরে ঘুরে সাহায্যের জন্য টাকা তুলল।
রাতে সোহেল ওকে দুশ’ টাকা দিল।
‘এটা কীসের?’
‘তোর ভাগ।’
‘মানে?’
‘আরে বোকা! বুঝিস না। পাবলিক তো মহাটাউট। এমনিতে চাইলে দেয় না। সাহায্য চাইলে টাকা দেয়। তাই এভাবে টাকা উঠিয়ে নিলাম। তোর ভাগও তুই পেলি। বুঝলি, একেই বলে পাবলিকের পকেট কাটা।’

বিবাহ পর্ব
‘রইস ভাই, এ কী অবস্থা?’ পাশের বাসার কলিম ঢুকেই বললেন।
রইস ব্যস্ত ছিল। বলল, ‘কেন? কী হয়েছে?’
‘আগে ব্যাচেলর ছিলেন। সব কাজ নিজে করতেন। খারাপ দেখাত না। এখন বিয়ে করেছেন। বাসায় এইসব ছোটখাটো কাজ ভাবিকে দিয়ে করাবেন। তা না করে আপনি নিজেই শার্টের বোতাম সেলাই করছেন!’
‘প্রথম কথা এটা শার্ট নয়। এটা ব্লাউজ। আর এটা তোমার ভাবির। আমিই কাপড় কেটে বানিয়ে দিচ্ছি।’

বর্তমান পর্ব
‘কাটা শুরু হতেই তোমরা ছবি তুলবে; ক্যামন?’
চিৎকার করে বললেন রইস উদ্দিন। এলাকার ছোটখাটো একজন নেতা। তিনি এলাকায় থাকতে ধান কাটার মানুষের অভাব। নো প্রবলেম। চ্যালাদের সঙ্গে নিয়ে চলে এসেছেন। এখন হবে ফটোসেশন।
‘ভাই, আপনি রেডি তো?’ জানতে চাইল পারভেজ। তার ডান হাত।
‘আমার চুলের স্টাইল ঠিক আছে তো?’ জানতে চাইলেন রইস।
‘ভাই শুরু করেন। শুরু করেন।’ সবাই চিৎকার করে উঠল।
ক্যামেরা রেডি।
রইস ধান কাটতে শুরু করলেন।
‘ভাই এদিকে তাকান।’ রইস তাকালেন।
‘রইস ভাই, ডানে।’
‘বামে, বামে একটু।’
‘একটু সোজা হন।’
‘একটু হাসেন।’
‘আরে কাটেন না কেন। ধান কাটতে এসেছেন, ভুলে গেছেন?’
‘আহ্!’ চিৎকার করে উঠল পারভেজ।
‘কী হয়েছে রে?’ রইস জানতে চাইলেন।
‘ভাই, ধান গাছ না কেটে আপনি আমার কোনা আঙ্গুল কেটে ফেলেছেন।’
‘তাই তো বলি। ধান গাছ কাটতে এত শক্তি লাগছে কেন!’