মানুষ এখন গর্তজীবী

ঢাকা, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২০ | ২৩ আষাঢ় ১৪২৭

মানুষ এখন গর্তজীবী

আলম তালুকদার ৮:৩৪ পূর্বাহ্ণ, জুন ০২, ২০২০

print
মানুষ এখন গর্তজীবী

প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ নিজেকে গর্তজীবী ভাবতেন। এই দাবির স্বপক্ষে তার লেখা ‘রাক্ষস খোক্কস এবং ভোক্কস’ শিরোনামে একটি বাচ্চাদের বইয়ের পাতায় সাক্ষী রেখে গেছেন।

‘নিষাদকে নিতে তার বাবা আসেন না, কারণ তার বাবা কোথাও যান না। আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে না, বন্ধুবান্ধবের বাড়িতে না, বিয়ে বাড়িতে না, জন্মদিনের দাওয়াতে না। তাকে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে আপনি কোথাও যান না কেন? তিনি বলেন, আমি গর্তজীবী মানুষ। গর্তে বাস করতেই আমার ভালো লাগে। 

তিনি তার বাসাটার নাম দিয়েছেন গর্ত। তিনি এই নিয়ে একটি ছড়াও বানিয়েছেনÑ
বাইরে যাব মরতে
থাকব আমি গর্তে।’
প্রিয় পাঠক, এবার বিষয়টা নিয়ে আমরা চিন্তা করলে কী বুঝতে পারি। লেখক, কবিরা তাদের লেখার মাধ্যমে কি ভবিষ্যৎ দেখতে পায়? হুমায়ূন আহমেদ নিজের বাসাকে একটি গর্ত মনে করে নিজের লেখালেখির কাজে ব্যস্ত থাকতেন। গৃহবন্দি বা ঘরেন্টাইন যাকে বলা যায়। তো আজকের এই করোনাময় সময়ে গোটা বিশ্ব গর্তজীবী হয়ে গেল?
এরকম যে হবে তা কি তিনি বুঝতে পেরেছিলেন? নাকি তাকে দিয়ে কেউ লিখিয়েছেন?
এবার এই ফেলাসিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায়। তিনি বলেছেন- ‘জীবন রে তুহু মম শ্যাম সমান’। তিনি আশি বছর বেঁচেছিলেন। অন্যদিকে কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘নিশ্চল নিশ্চুপ/ আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধ বিধুর ধূপ’।
একবার চিন্তা করেন, কীভাবে কবিতার কথা দুজনের জীবনে ঘটে গেল!
এই সমীকরণে আমি বলতে চাই, প্রিয় কবি, লেখক, ছড়াকার, বুদ্ধিমান মানুষরা আগামীকাল নিয়ে আগাম বাণী নিয়ে সাবধানে লেখালেখি করবেন। যা বলবেন তা নিজের বেলায় ঘটতে পারে! সাধু সাবধান।
আমার লেখায় সমস্যা হল, আমি সিরিয়াস থাকতে পারি না। সিরিয়াস বিষয় আমাকে পছন্দ করে না। এই ‘আগাম’ শব্দটা একটা জোকসের কথা মনে করালো যে! লিখবো? যাদের পছন্দ হবে না, তারা পড়বেন না। সম্পাদক ড. মাসুদুজ্জামান আমার কাছে রমরমা রম্য কামনা করেছেন।
গুরু আর চেলার গল্প। গুরুর বয়স তিরিশ। চেলার বয়স আঠারো। অনিন্দ্য সুন্দর। মাইয়া মাইয়া চেহারা। তো গুরুর প্রতিভার স্ফুরণে চেলা মহামুগ্ধ। গুরু যা বলে তা উড়ে উড়ে করে থাকে। একদিন শাহবাগের উড়ালসেতুর ওপরে আড্ডা দিচ্ছে। গুরু চেলাকে বলছে, ঐ দেখ, রিকশাটা যাচ্ছে, ঐটা ডান মোড় নিলেই চাক্কা পাংচার হয়ে যাবে। আসলেই তাই হল। চেলা তো মুগ্ধ। তারপর আবার বলছে, এই ঐ যে মোটরসাইকেলে তিনজন যাচ্ছে, এটা বারডেমের সামনে গেলেই এ্যাকসিডেন্ট করবে। ঘটনা আসলেই ঘটল। চেলাটি তো হতবাক আর মহামুগ্ধ। সে খুব বিস্মিত হয়ে একসময় বিনীতভাবে বলে, গুরু, আমি আপনার মতো আগাম বলতে পারব না? আমাকে কৌশল জানাবেন? গুরুদক্ষিণা যা লাগে দেব।
তো গুরু চেলার গুরুতর ব্যাপক আগ্রহ দেখে বলল, হ্যাঁ, তুমিও পারবে, এটা কোনো বিষয় না।
তাহলে আমাকে কবে আগাম বলা শেখাবেন?
তুমি আসলেই শিখতে চাও?
জি গুরু, আসলেই।
তাহলে তুমি কাল বেলা ডোবার পরে আমার বাসায় আসো। এই কার্ড নাও। তারপর কীভাবে যেতে হবে এসব বলে দিলেন। গুরুর প্রতিভায় আর উদারতায় স্নাত হয়ে চেলা একসময় চলে গেল।
তারপরের দিন যথাসময়ে চেলা গুরুর বাসায় হাজির। কলিংবেল টিপলে গুরু নিজেই দরজা খুলে দিয়ে তাকে তার বেডরুমের বিছানায় নরম নরম কথা বলে বসতে বলেন। সে বসে বাসার পরিবেশ দেখে বলল, গুরু একাই থাকেন?
হ্যাঁ, আপাতত একা। পরিবার গ্রামের বাড়িতে। তো তুমি আগাম যদি জানতে চাও তাহলে যাও, জানালার পর্দাগুলো টেনে আসো, আর ঐ পাশে রুম লাইটের সুইচটা অফ করে দাও।
এসব কথা শুনে চেলাটির মনে আর জানে কেমন করে ছ্যাঁৎ করে শব্দ হল। সে গুরুর চোখ মুখ দেখে আরো নিশ্চিত হলো, এক লহমায় সে অনুধাবন করতে পারল যে আজইকা আমার খবর হবে! নিজেকে একটু সামলিয়ে বললÑ গুরু, আপনি আমাকে ইয়ে মারতে চান?
Ñএই তো আমার মহাযোগ্য চেলা। আমি তোমাকে গতকালই শাহবাগে বলেছি না, আগাম বলা বা জানাটা কোনো বড় ব্যাপার না। তুমি পারবে। এই তো পারছ না?
তো কথা হল আমরা কিন্তু হরহামেশাই আগাম বলে যাচ্ছি। এক মন্ত্রী বচন আছে। তিনি বলেছেন, ‘আমরা করোনার চেয়ে শক্তিশালী’! আমরা কিন্তু নরনারী সবাই এই ‘শালী’ শব্দের ভক্ত। আমরা কেউ শক্তিশালী লেখক হতে চাই, কেউ শক্তিশালী নেতা হতে চাই, বক্তা হতে চাই। কি ঠিক না বেঠিক?
করোনা এদেশে অনুপ্রবেশ করার পর ফেসবুকে দেখলাম এক বিদেশি লেখক এমন একটা শক্তিশালী ভাইরাসের কথা উল্লেখ করে গেছেন। মূলকথা পৃথিবীর মানুষ খতম হবে।
আমি আরো একটি উপন্যাসে এমন একটা কথা পেয়েছি। নাম হল, ‘দি লাস্ট ম্যান’ লেখক হলেন কবি শেলির আপন বউ এবং ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’-এর লেখক, মেরি শেলি। মূলত এটি একটি আত্মজৈবনিক উপন্যাস। লেখক এক পর্যায়ে উল্লেখ করেন, ২০৭৩-২০৯৩ সালের মধ্যে এক ভয়ংকর প্লেগে সমস্ত মানবজাতির বিলুপ্ত হবে। এখন আমার কথা হচ্ছে এসব জ্ঞানীগুণীরা, বুদ্ধিজীবীরা এমন আগাম কথা বলে বলে পৃথিবীর মানবজাতির ধ্বংসের দিকে ওকালতি কেন করে যাচ্ছেন? এদের কি গুড়াকৃমি ছিল! নাকি আমি যেহেতু থাকব না, সেহেতু গ্রাম্য মোড়লের মতো একটা ভজঘট, অকটবিকট করে যাই? এবার একটু হালকার ওপর ভরসা করে শেষ করি। লকডাউন নাকি ঠকডাউন? ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনার পরের জোকস।
শিক্ষক বলছে ছাত্রকেÑ একটা সিংহের সামনে পড়লে কীভাবে বাঁচতে পারবি?
ছাত্র অনেক অনেক চিন্তা করে বলল, স্যার, বাঁচার জন্য একটাই পথ। সেটা হল আমাকে এক বোতল খাঁটি বিষ এনে দিন, আমি বিষ খেয়ে সিংহের সামনে শুয়ে থাকব, আমাকে সিংহ খাবে, খেলেই স্যার বুঝলেন না স্যার, সিংহটা মারা যাবেই যাবে!